ত্রিপুরায় বিজেপি-র বিজয়রথ থামালেন 'মহারাজা', প্রতিবেশী রাজ্যে নয়া সমীকরণ?

ত্রিপুরায় বিজেপি-র বিজয়রথ থামালেন 'মহারাজা', প্রতিবেশী রাজ্যে নয়া সমীকরণ?

ত্রিপুরার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করবেন প্রদ্য়োৎ কিশোর দেব বর্মা? Photo-ANI

ত্রিপুরার রাজ পরিবারের বংশোধর এবং প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি প্রদ্যোৎ কিশোর দেববর্মাই কয়েক মাস আগে এই নতুন দল তৈরি করেছেন৷

  • Share this:

    #আগরতলা: বাংলার নির্বাচনে বার বার আসছে প্রতিবেশী ত্রিপুরার প্রসঙ্গ৷ কারণ দু' বছর আগে সেখানে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি সরকার৷ রাজ্যে প্রচারেও এসেছেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব৷ অথচ সেই ত্রিপুরাতেই আদিবাসী এলাকা স্বশাসিত উন্নয়ন পর্ষদের বা এডিসি নির্বাচনে গত শনিবার জোর ধাক্কা খেয়েছে বিজেপি৷ তাও ত্রিপুরায় দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা বামফ্রন্ট বা কংগ্রেস নয়, ত্রিপুরায় বিজেপি-র বুকে কাঁপুনি ধরিয়েছে নতুন এক রাজনৈতিক দল৷ যার নাম দ্য় ইনডিজেনাস প্রোগ্রেসিভ রিজিওনাল অ্যালায়েন্স বা টিপরা (টিআইপিআরএ)৷

    ত্রিপুরার রাজ পরিবারের বংশোধর এবং প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি প্রদ্যোৎ কিশোর দেববর্মাই কয়েক মাস আগে এই নতুন দল তৈরি করেছেন৷ আর তার পর প্রথম নির্বাচনেই বিজেপি-র বিজয়রথ থামিয়ে রীতিমতো চর্চায় প্রাক্তন এই কংগ্রেস নেতা৷ রাজনৈতিক মহল বলছে, ২০২৩ সালে ত্রিপুরার বিধানসভা নির্বাচনে অনেক হিসেবই উল্টে দিতে পারে প্রদ্যোৎ কিশোর দেববর্মার এই নতুন দল৷

    গত শনিবার ত্রিপুরার এডিসি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হয়৷ ত্রিপুরায় রাজনৈতিক দিক থেকে এই ভোটের ফলাফল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ৷ কারণ ত্রিপুরার ৬৮ শতাংশ এলাকাই এই পর্ষদের অধীনে পড়ে৷ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবও এই নির্বাচনে জোরদার প্রচার করেছিলেন৷ তার পরেও গত শনিবার ফল বেরোলে দেখা যায়, মোট ২৮টি আসনের মধ্যে ১৮টিতেই জয়ী হয়েছে প্রদ্যোৎ কিশোর দেববর্মার নতুন দল টিপরা এবং তাদের জোট শরিক দল আইএনপিটি৷ আর বিজেপি জিতেছে ৯টি আসনে৷ বামফ্রন্ট, কংগ্রেস বা বিজেপি-র জোট শরিক আইপিএফটি একটিও আসন পায়নি৷

    কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে ২০১৯ সালে দল ছাড়েন প্রদ্যোৎ৷ এর পরেই নতুন দল গঠন করেন তিনি৷ আদিবাসী এলাকা স্বশাসিত উন্নয়ন পর্ষদের বা এডিসি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পরেই প্রদ্যোৎ কিশোর দেববর্মা বলেছেন, 'আমাদের জয় থেকে অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলি শিক্ষা নিতে পারে৷ আঞ্চলিক একতা এবং স্বচ্ছ নীতিই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ৷' তিনি আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, কয়েকদিনের মধ্যেই অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলির নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারেন তিনি৷ ত্রিপুরার আদিবাসী উন্নয়ন পর্ষদের শেষ দু'টি নির্বাচনেই একছত্র দাপট দেখিয়েছিল বামেরা৷ বিজেপি এবার রাজ্যে শাসন ক্ষমতায় থাকায় ফল তাদের পক্ষে যাবে, এমন সম্ভাবনাই প্রবল ছিল৷ কিন্তু সব হিসেব উল্টে দিয়েছে নতুন দল টিপরা৷

    গত শনিবারের ফলাফল প্রকাশের পরই ত্রিপুরার রাজনীতিতে প্রদ্যোৎ কিশোর দেববর্মার নতুন দল নিয়ে জোর আলোচনা৷ এমন কি, দু' বছর পর রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট- কংগ্রেসের বদলে প্রদ্যোতের নতুন দলই গেরুয়া শিবিরকে কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে, এমন সম্ভাবনাও দেখছেন অনেকে৷

    বিগত বাম সরকারের মতোই বিজেপি- আইপিএফটি জোটের বিপ্লব দেব সরকারের বিরুদ্ধে ত্রিপুরার আদিবাসী মানুষের মনে ক্ষোভ জমছিল৷ আর এই ক্ষোভকেই কাজে লাগিয়েছেন মহারাজা বলে খ্যাত প্রদ্যোৎ কিশোর দেববর্মা৷ ত্রিপুরার রাজ পরিবারের বংশোধর হওয়াতেই তাঁকে মহারাজা বলে সম্বোধন করেন অনেকে৷ নম্র স্বভাব এবং মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়েই বিজেপি-র বিরুদ্ধে আদিবাসীদের ক্ষোভকে নিজের পক্ষে ভোটবাক্সে টেনে আনতে পেরেছেন প্রদ্যোৎ৷

    নতুন এই দল টিপরার মূল রাজনৈতিক দাবি হল গ্রেটার টিপরাল্যান্ড গঠনের দাবি৷ প্রদ্যোতের প্রতিশ্রুতি ছিল, ত্রিপুরা আদিবাসী উন্নয়ন পর্ষদ দখল করতে পারলে তারা গ্রেটার টিপরাল্যান্ডের সমর্থনে প্রস্তাব পাস করবেন৷ প্রস্তাব অনুযায়ী, অসম, মিজোরাম এমন কি বাংলাদেশে বসবাসকারী ত্রিপুরার বাসিন্দারাও এই গ্রেটার টিপরাল্যান্ডের থেকে উপকৃত হবেন৷ যদিও এই প্রতিশ্রুতির জোরে খুব বেশি দিন রাজনৈতিক ভাবে ফায়দা তোলা যাবে না বলেই মনে করে ত্রিপুরার সিপিএম নেতা জীতেন চৌধুরী৷ তাঁর দাবি, অতীতে এই একই দাবিতে সরব হয়েছিল বর্তমানে বিজেপি-র জোট সরকারের শরিক আইপিএফটি৷

    তবে টিপরা-র এই উত্থান ত্রিপুরার রাজনৈতিক সমীকরণে সাময়িক কোনও নাড়া দেবে, নাকি স্থায়ী ভাবে ত্রিপুরার রাজনীতিতে জায়গা করে নেবে, তার উত্তর পেতে ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে৷ কিন্তু টিপরা-র প্রতি আদিবাসীদের সমর্থন, বিজেপি-র জোট শরিক আর এক আদিবাসী প্রভাবিত দল আইপিএফটি-র কাছে কঠিন চ্যালেঞ্জ৷ কারণ আদিবাসী উন্নয়ন পর্ষদের নির্বাচনে একটিও আসনে জিততে পারেন আইপিএফটি৷ ২৫টি আসনে তারা বিজেপি-র সঙ্গে জোট বেঁধে লড়েছিল৷ আর তিনটি আসনে বিজেপি-র সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই হয়৷ তার পরেও বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়েছে বিজেপি-র জোট শরিককে৷

    ইতিমধ্যেই নির্বাচনে খারাপ ফলের জন্য জোট শরিক আইপিএফটি-র দিকেই আঙুল তুলেছে বিজেপি নেতৃত্ব৷ বিজেপি-র মুখপাত্র সুব্রত চক্রবর্তী বলেন, আইপিএফটি নেতৃত্বের সঙ্গে বসে ভোটের ফালফাল নিয়ে আলোচনা করবেন তারা৷ আদিবাসী উন্নয়ন পর্ষদের ক্ষমতায় আসা নতুন দল টিপরা রাজ্য সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি৷ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৩ সালের নির্বাচনে আইপিএফটি-কে সরিয়ে টিপরা বিজেপি-র জোট সঙ্গীর জায়গা নিয়ে নিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না৷ কারণ প্রদ্যোৎ কিশোর দেববর্মার সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের সম্পর্ক যথেষ্ট ভাল৷

    তবে নির্বাচনের ফলের পর টিপরা-কে জোট সঙ্গী হিসেবে পেতে আগ্রহী কংগ্রেসও৷ ত্রিপুরার প্রদেশ কংগ্রেস নেতারা স্বীকার করছেন, আদিবাসী এলাকায় মহারাজা হিসেবে খ্যাত প্রদ্যোৎ যথেষ্ট জনপ্রিয়৷ ত্রিপুরার কংগ্রেস নেতা তাপস দে দ্য প্রিন্ট-কে জানিয়েছেন, 'টিপরা হয়তো ভবিষ্যতেও একাই লড়বে৷ কিন্তু আমরা তাদের সবথেকে ঘনিষ্ঠ সঙ্গী৷ আমরা আশা করি তারা আমাদের সঙ্গে জোট করবে৷ বিজেপি প্রদ্যোৎ কিশোর দেববর্মাকে অনেক প্রলোভন দেখিয়েছে, মন্ত্রিত্ব, রাজ্যসভার সাংসদ পদ দিতে চেয়েছে, কিন্তু উনি প্রত্যাখ্যান করেছেন৷ প্রদ্যোৎ নতুন একটি শক্তি হয়ে উঠে এসেছেন৷ উনি টিপরা-কে আরও শক্তিশালী করতে চাইবেন৷ ত্রিপুরায় এটাই বিজেপি-র শেষ, কংগ্রেস বেঁচে থাকবে৷ কংগ্রেসের বহু নেতা যোগ দিয়েছিলেন বলেই বিজেপি এখানে ক্ষমতায় আসতে পেরেছে৷ সিপিএম, বিজেপি, আইপিএফটি সবাই এখন কোণঠাসা৷'

    কংগ্রেসের সঙ্গে টিপরা-র জোট বাঁধার সম্ভাবনাও অবশ্য উড়িয়ে দিচ্ছেন না রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা৷ সবমিলিয়ে ত্রিপুরা জুড়ে এখন চর্চায় মহারাজা প্রদ্যোৎ এবং তাঁর নতুন দল৷ প্রদ্যোৎ কার হাত ধরেন, সেটাই হয়তো ত্রিপুরার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ঠিক করে দিতে পারে৷

    Published by:Debamoy Ghosh
    First published:

    লেটেস্ট খবর