রাস্তার রাজনীতি, মমতা বনাম বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস

Bangla Editor | News18 Bangla
Updated:Aug 21, 2019 04:08 PM IST
রাস্তার রাজনীতি, মমতা বনাম বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস
Bangla Editor | News18 Bangla
Updated:Aug 21, 2019 04:08 PM IST

প্রতিবেদন: শুভাশিস মৈত্র

#কলকাতা: ভারতে রাস্তায় নেমে রাজনীতি করার পথ প্রথম দেখিয়েছিলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। দু’দশকের বেশি সময় রাস্তায় নেমে রাজনীতি করেই কমিউনিস্ট পার্টি জ্যোতি বসুর হাত ধরে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছিল। অন্য মুখ্যমন্ত্রীদের মধ্যে প্রফুল্ল ঘোষ, বিধান রায়, অজয় মুখোপাধ্যায় (কিছুটা চেষ্টা করেছিলেন, সফল হননি), প্রফুল্ল সেন, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়  এমনকী দল পাশে থাকলেও, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যেরও রাস্তার রাজনীতির অভিজ্ঞতা ছিল না। ব্যতিক্রম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বামেদের দীর্ঘ, লৌহকঠিন শাসন এবং দলীয় ব্যবস্থা ভেঙে মমতা ক্ষমতায় এসেছেন রাস্তার রাজনীতি করেই। মূল্যও দিতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু সফল হয়েছেন।

২০১১ সালে, যেদিন বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশিত হল, বামেরা পরাজিত, ওই দিন আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে সিপিএমের রাজ্য পার্টি অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে একটি টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে সিপিএম নেতা  গৌতম দেব বলেছিলেন, ‘রাস্তার রাজনীতির জয় হল। আমরা এর জবাব রাস্তার রাজনীতি দিয়েই দেব’। গৌতম দেবের সেই বক্তব্য বেশ কয়েকবার সম্প্রাচারিতও হয়। তার পর আলিমুদ্দিন থেকে ফোন করে অনুরোধ করা হয়, ওই বক্তব্য সম্প্রচার না করতে। পরে আমি গৌতমবাবুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কেন তাঁর ওই বক্তব্য পার্টি প্রত্যাহার করে নিল? তিনি বলেছিলেন, ‘তখন ওটা বলা ভালো দেখাচ্ছিল না। মানুষ ভুল বুঝতে পারে, তাই ওই সিদ্ধান্ত’। আসলে সিপিএম দীর্ঘ কাল ক্ষমতায় থাকতে থাকতে ততদিনে তথাকথিত ‘ভদ্দরলোকের’ রাজনীতির তাঁবুতে ঢুকে পড়েছে। যেখান থেকে আজও বেরোতে পারেনি। সিপিএম যখন বছরের পর বছর নির্বাচন জিতে চলেছে, তখন বলতে শোনা যেত, এই রাজ্যের মানুষের রাজনৈতিক  সচেতনতা মান এতই উঁচুতে যে তারা ভাবনা-চিন্তা করেই বামপন্থীদের বার বার ভোট দেয়। গত ২ ফেব্রুয়ারি, বামেদের ব্রিগেডের আগের দিন, সিপিএম রাজ্যসম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্রকে টেলিভিশনে বলতে শোনা গেল, মানুষ ভুল করে, তারা ভুল করে তৃণমূলকে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছে।

315_051211040529

তাহলে তো প্রশ্ন ওঠে, কেরলের মানুষ কি পাঁচ বছরে এক বার করে ভুল করে, আর তার পরের পঞ্চম বছরে ভুল শোধরায়, এবং তার পরের পঞ্চম বছরে ফের ভুল করে? কারণ সে রাজ্যে দীর্ঘ দিন ধরেই একবার বামেরা, পরের বার কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছে। আসলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি যে সুরে (যদি এটাকে আদৌ সুর বলা যায়!) বাঁধা হয়ে আছে, যার পেছনে অবদান মূলত বামেদেরই, সেটা হল, এই রাজ্যে ক্ষমতাসীন কোনও দলকে সরাতে হলে রাস্তার রাজনীতিই পথ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতির ট্র্যাকটা লক্ষ্য করুন। আমরা মনে রাখি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৯৯০-এর ১৬ অগস্টের মাথায় লাঠি খাওয়া,  ১৯৯২-এর ব্রিগেড, ১৯৯৩-এর ২১ জুলাই, মহাকরণের করিডোরে অবস্থান, এই বড় ঘটনাগুলো। কিন্তু আমি সাংবাদিক হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বহু অ্যাসাইনমেন্টে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, একটা দীর্ঘ সময় ধরে, যেখানেই মানুষ রাজনৈতিক কারণে নিপীড়িত হয়েছে, এমন শত শত ঘটনা, খবর পাওয়া মাত্র ছুটে গিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মানুষ তো বিপাকে পড়লে একটা আশ্রয় খোঁজে, একটা সময়, সেই আশ্রয়ের নাম ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

Loading...

mamu

বেশির ভাগ সংবাদপত্র তাঁর বিরুদ্ধে ছিল, প্রশাসন বিরুদ্ধে, ক্ষমতায় এক মহা শক্তিশালী সংঘবদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টি, এই সব কিছুর বিরুদ্ধে কার্যত একা যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজকের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচকের তালিকায়, সন্দেহ নেই, এই প্রতিবেদকের নামটিই হয়তো এক নম্বরে। কিন্তু সত্যকে অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। রাজনীতিতে মমতার আর একটি বড় অস্ত্র হল, তিনি যে চাল দিচ্ছেন, তার পরিণতি আগাম আন্দাজ করতে পারছে না প্রতিপক্ষ, তা বার বার প্রমাণ হয়েছে। সেটা প্রমাণ হয়েছে সিঙ্গুরের অবস্থানে, সেটা প্রমাণ হয়েছে, ব্রিগেডের মৃত্যু ঘণ্টায়, প্রমাণ হয়েছে, বর্তমান ধর্নাতেও ।

nat1

সিঙ্গুর নিয়ে এখনও বামেরা বলে চলেছেন, কারখানার কথা। এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে সাঁওতালি ঔপন্যাসিক শ্যাম বেসরার কথা। এবার তিনি সাহিত্য অ্যাকাডেমি পেয়েছেন সাঁওতালি সাহিত্যে। তাঁর উপন্যাসের বিষয়, ৬০-এর দশকে চিত্তরঞ্জনে যখন রেল ইঞ্জিন কারখানার কাজ শুরু হয়, তখন সেখানে ছিল সাঁওতালদের গ্রাম, সেই গ্রামবাসীদের উচ্ছেদের কাহিনি। মোট ১২টি গ্রাম থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল। প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে ৬ জন সাঁওতাল মারা গিয়েছিলেন। এরপর ম্যাসাঞ্জর ড্যাম। এই ড্যাম নির্মাণ করতে গিয়েও বহু গ্রাম থেকে সাঁওতালদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল। এখানে গ্রামের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। শ্যামের উপন্যাসে এসেছে এই দুই উন্নয়ন প্রকল্প এবং তার জন্য আদিবাসীদের সংগ্রাম, দুঃখ, কান্না। ফলে কার জন্য শিল্প, কে উচ্ছেদ হচ্ছে, কোন দল কাদের পাশে থাকবে, এর ফলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কোন পথে এগোবে, এমন অনেক প্রশ্ন সত্যই রয়েছে। কিন্তু, মমতার উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলন কোনও বিচ্ছিন্নঘটনা ছিল না। বরং ধারাবাহিকতা। শ্যামের উপন্যাস সে কথাই বলে। এবং এই রাস্তার আন্দোলনে মমতা সফল। রাজীব কুমারকে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের যা রায়, তাতে মমতার খুশি না হওয়ার কোনও কারণ নেই। অন্য দিকে, এই ঘটনা ঘিরে যে বিরোধী ঐক্য প্রকাশ পেল, তাতে ভবিষ্যতে,  সিবিআইকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার যে অভিযোগ বিরোধীরা বহুদিন করে এসেছে, সেই বিরোধীদের কিছুটা স্বস্তি অবশ্যই মিলবে। মধ্যরাতে শীর্ষকর্তাকে বদলি সহ সিবিআইয়ের যে চেহারা সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতেও অনেকটা সময় লাগবে বলে মনে হয়।

কথা হচ্ছিল রাস্তার রাজনীতি নিয়ে। মমতার বিরুদ্ধে বিজেপি রথ-রাজনীতি, আসলে সেই রাস্তারই রাজনীতি। অতীতে রথ-রাজনীতি বিজেপিকে যে বহু নির্বাচন জিতিয়েছে, তথ্য সে কথাই বলে। কিন্তু বিজেপিকে সম্ভবত অতীতে কখনও মমতার মতো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়তে হয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোষণা, যেখানে বিজেপির যত সভা হবে, সেখানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তৃণমূলের ততটাই সভা হবে। বিজেপি প্রভাব বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটা সম্ভবত সব থেকে বড় প্রতিবন্ধকতা। কংগ্রেস সারা ভারতেই অনেকটা চাঙ্গা এখন। বামেদের ব্রিগেডে যথেষ্ট ভিড় দেখা গিয়েছে। ফলে, এই দুই সংগঠন থেকে গত বেশ কয়েকটি নির্বাচনে বিজেপির বাক্সে যে ভোট ঢুকেছিল, তার কিছুটা অবশ্যই ফিরে আসবে। অন্য দিকে যেহেতু মমতার ভোটে এখনও কোনও ভাঁটার টান স্পষ্ট হয়নি, ফলে এক বছর আগে বিজেপির কাছে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন যতটা কঠিন ছিল, আজ তা আজ তা অনেকটা বেড়ে গিয়েছে।

( এই প্রতিবেদনের সমস্ত বক্তব্যই লেখকের একান্ত নিজস্ব মতামত )

First published: 09:31:28 PM Apr 05, 2019
পুরো খবর পড়ুন
Loading...
अगली ख़बर