কংগ্রেসের ইশতাহারে বামপন্থী ঝোঁক !

কংগ্রেসের ইশতাহারে বামপন্থী ঝোঁক !
  • Share this:

কংগ্রেসের ইশতাহারে  কেন এই বামপন্থী ঝোঁক? তাহলে কি কংগ্রেসের অন্দরে ফিরে আসছে বামপন্থী চিন্তাধারা ? এর উৎস বা কোথায়? উত্তর খুঁজলেন শুভাশিস মৈত্র

#কলকাতা: আজ থেকে পাঁচ বছর আগে, কংগ্রেস ২০১৪ লোকসভা উপলক্ষে যে ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করেছিল, তার থেকে আকাশ পাতাল ফারাক রাহুল গান্ধির ২০১৯-এর ম্যানিফেস্টোর। গরিব কৃষকের অ্যাকাউন্টে বছরে ৭২ হাজার টাকা, সিটিজেনশিপ বিল প্রত্যাহার ইত্যাদি নানা প্রতিশ্রুতি সেখানে রয়েছে, যেমন ম্যানিফেস্টোতে থাকে। ২০১৪-র ইশতাহারেও কংগ্রেস, পরিকাঠামোয় হাজার বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ, সব ধরনের রফতানি কর প্রত্যাহার, এক কোটি চাকরি, ১০০ দিনের মধ্যে জিএসটি রূপায়ণ ইত্যাদি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ২০১৯-এর ম্যানিফেস্টোতে ঘোষণা করা হচ্ছে বিচারাধীন বন্দিদের মুক্তির কথা। যার সুফল পাবেন বহু রাজনৈতিক বন্দি। বহু জেল আটক মাওবাদীও এর ফলে উপকৃত হবেন। এই দাবি বিভিন্নসময়ে বামপন্থীরা্‌ জানিয়েছেন। জানিয়েছে এপিডিআরের মতো সংগঠনও। এবার কংগ্রেস জানালো। স্বাধীনতার আগে কংগ্রেস এই সব দাবি করত। তার পর এসব কথা কংগ্রেস ভুলে গিয়েছিল।

ইশতাহারে বলা হয়েছে, হাজার হাজার আইনে, বিধি-নিষেধের ধারায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভারতের গণতন্ত্র। সব আইনকে সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কার, পরিবর্তন বা প্রয়োজনে বাতিল করা হবে। দেশদ্রোহ বা সেডিশন আইন, যেটা ইংরেজরা তৈরি করেছিল, মূলত ভারতীয় লেখকদের ইংরেজ বিরোধী লেখা বন্ধ করতে, যে আইন এতদিন কংগ্রেস সব জেনেও লালন-পালন করেছে, সেই আইন বাতিলের স্পষ্ট ইঙ্গিত রাহুল গান্ধীর ম্যানিফেস্টোয়। এই আইনেই মামলা হয়েছিল কানহাইয়া কুমারের বিরুদ্ধ। এই আইনেই মহারাষ্ট্র সরকার মামলা রুজু করেছে ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলির প্রাক্তন সম্পাদক গৌতম নওলখা, বামপন্থী কবি ভারভারা রাও মানবাধিকার কর্মী শ্রমিক নেত্রী সুধা ভরদ্বাজদের বিরুদ্ধে।

আফসপা আইনে ‘উপদ্রুত’ এলাকায় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য বিশেষ আইনে এতদিন সেনাকে যে ছাড় দেওয়া হত, যার বিরুদ্ধ শর্মিলা চানু অনশন করে সারা পৃথিবীর কাছে ‘প্রতীক’ হয়ে আছেন, সেই আইন সংস্কারের কথা বলা হয়েছে এই ইশতাহারে । এছাড়াও মানবাধিকার আইনের কথা উল্লেখ করে, যে ভাবে বন্দির অধিকারের কথা বলা হয়েছে, বন্দির উপর পুলিশের নির্যাতন বন্ধের কথা বলা হয়েছে, তা কংগ্রেসের ইশতাহারে  অতীতে কেউ দেখেছে বলে মনে হয় না। মানহানি সংক্রান্ত আইনের ৪৯৯ ধারা বাতিলের প্রতিশ্রুতিও র‍য়েছে এই ইশতাহারে , এর ফলে মানহানির মামলায় কারও আর জেল হবে না। এক কথায় বলা যায়, বিচার ব্যবস্থায় বড় রকমের সংস্কারে কথা বলা হয়েছে কংগ্রেসের এই ইশতাহারে ।

কেন এই বাম ঝোঁক কংগ্রেসের ইশতাহারে  ? কারও মতে, রাহুলের আধুনিক শিক্ষা, তারুণ্য এর কারণ। ভিন্ন একটি মতও রয়েছে। সেটা হল, একদা সিপিআই এমএল-এর ছাত্র সংগঠন এআইএসএ বা আইসার নেতা, জেএনইউ ছাত্র সংসদের প্রাক্তন সভাপতি, যিনি বর্তমানে কার্যত রাহুলের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা, তাঁর প্রভাব কাজ করেছে এই ইশতাহার লেখায়। ২০০৭ সালে এই সন্দীপ সিং জেএনএউ-এর ছাত্র সংগঠনের সভাপতি ছিলেন।

Loading...

২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে মনমোহন সিংকে কালো পতাকাও দেখিয়েছিলেন সন্দীপ। যদিও তিনি এখন মনে করেন, কাজটা ভুল হয়েছিল। দর্শন নিয়ে পড়েছেন উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা এই সন্দীপ। আনুষ্ঠানিক ভাবে তাঁকে এখনও রাহুলে রাজনৈতিক পরামর্শদাতার পদ দেওয়া হয়নি, কিন্তু এখন এটা সর্বজনবিদিত যে ওই কাজটা এখন সন্দীপই করছেন। রাহুলের বক্তৃতাও লিখে দেন তিনি।

জেএনইউ থেকে পাস করে ধীরে ধীরে সন্দীপের দূরত্ব বাড়ে সিপিআইএমএল-এর ছাত্রশাখা আইসা বা অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোশিয়েশনের সঙ্গে। তিনি যোগ দেন অন্না হাজারে-কেজরিওয়ালদের লোকপাল আন্দোলনে। সেখানেও কোনও দিশা না পেয়ে সন্দীপ যোগ দেন কংগ্রেসে। ২০১৭ সাল থেকেই তিনি রাহুল গান্ধির স্ক্রিপ্ট রাইটার বা বক্তৃতা লেখক। ভাষার উপর তাঁর যেমন দখল, তেমনি শক্ত তাঁর মার্কসবাদ সহ বিভিন্ন দর্শনবোধের ভিত্তি।

কংগ্রেসের মধ্যে একটা বাম ঝোঁক বা লেফট অফ দ্য সেন্টার অবস্থান আগেও ছিল। যার নিদর্শন ইন্দিরা গান্ধির ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ, কয়লা খনি জাতীয়করণ বা রাজন্যভাতা বিলোপ। ব্যর্থ হলেও গরিবি হটাও স্লোগান বামপন্থী স্লোগানই ছিল। কংগ্রেসের মধ্যে একটা ধারণা আছে যে রাহুল গান্ধির বর্তমান যে গরিবমুখী ঝোঁক, কৃষকদের সম্পর্কে তাঁর যে অবস্থান, ন্যূনতম আয় নিশ্চিত করতে তাঁর যে ‘ন্যায়’ প্রকল্প, এসবের পিছনে একদা নকশাল সন্দীপের ভূমিকা রয়েছে। যেসব আইনকে বামপন্থীরা কালা কানুন বলে এসেছে, তার ব্যবহার বিভিন্ন রাজ্যে এবং কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকাই সব থেকে বেশি করেছে। মানবাধিকার ভঙ্গের অভিযোগ কংগ্রেসের বিরুদ্ধেই সব থেকে বেশি। রাহুল কি কংগ্রেসে নব যুগ আনতে চান? অরুণ জেটলি অবশ্য বলেছেন, এসব অর্থহীন কথা কারণ কংগ্রেস ক্ষমতায় আসছে না। ক্ষমতায় আসা না আসা তো আরও প্রায় দু’মাস পরের কথা, কিন্তু এই ইশতাহারে যে আধুনিক চিন্তার প্রকাশ রয়েছে, তা যদি আন্তরিক হয়, এর সুফল কংগ্রেস পাবে। ক্ষমতায় না থাকলেও।

এই প্রতিবেদনে যাবতীয় মত ও বক্তব্য লেখকের ব্যক্তিগত৷ 

First published: 08:51:17 PM Apr 02, 2019
পুরো খবর পড়ুন
Loading...
अगली ख़बर
Listen to the latest songs, only on JioSaavn.com