দেশ

corona virus btn
corona virus btn
Loading

কৃষক বিক্ষোভ- বড় শিল্প সংস্থা মানেই কি খারাপ নাকি তাদের নিশানা করা হচ্ছে?

কৃষক বিক্ষোভ- বড় শিল্প সংস্থা মানেই কি খারাপ নাকি তাদের নিশানা করা হচ্ছে?
প্রতীকী ছবি৷
  • Share this:

#দিল্লি: কৃষক বিক্ষোভের সারমর্ম করলে যা দাঁড়াচ্ছে তাতে ভারতীয় শিল্পক্ষেত্রের প্রধান মুখ যাঁরা, তাঁদেরকেই ভিলেন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে৷ তিনটি নতুন কৃষি আইনের বিরোধিতায় গত ২৫ সেপ্টেম্বর ভারত বনধের মাধ্যমে যে বিক্ষোভের সূত্রপাত, তার মধ্যে দিয়ে মূল শত্রু হিসেবে দুই শিল্প গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে ফেলা হয়েছে- আম্বানী এবং আদানি৷

বিরোধী দলের রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচনা, তাতে যা উঠে আসছে তার সারমর্ম একটাই- নয়া কৃষি আইন শুধু কৃষক বিরোধী তাই নয়, এই তিনটি আইন আম্বানী এবং আদানি শিল্পগোষ্ঠীর স্বার্থসিদ্ধি করতেই পাস করানো হয়েছে৷ একদিকে এই দুই শিল্প গোষ্ঠী ভাবমূর্তি যেমন জনসমক্ষে খারাপ করা হচ্ছে, সেরকমই বেশ কয়েকটি রাজ্যে কৃষক বিক্ষোভের সমর্থনের নামে সংস্থার বিভিন্ন পরিষেবা কেন্দ্র, আউটলেট, পরিকাঠামো ধ্বংস করতে তাণ্ডব চালানো হচ্ছে৷ লুধিয়ানায় রিলায়েন্সের সুপারস্টোর তছনছ করা হচ্ছে, তো কোথাও আবার তাদের পেট্রোল পাম্প দখল করে নেওয়া হচ্ছে৷ আবার মোগা জেলায় আদানির শস্য সংরক্ষণ কেন্দ্র দখল করার চেষ্টা করা হয়েছে৷

নতুন তিনটি কৃষি আইন বড় বড় সংস্থাগুলিকে কৃষকদের থেকে সরাসরি ফসল কেনার অধিকার দিচ্ছে বলে বিভিন্ন অংশে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে৷ আবার একই সঙ্গে দাবি করা হচ্ছে, এই আইনের বলে নিজেদের খুশি মতো যত ইচ্ছে শস্য মজুত করতে পারবে বড় বড় সংস্থাগুলি৷ সমাজের সম্পদশালীদের হাতে দুর্বলদের শোষিত হওয়ার চিরাচরিত ধারণাকে উস্কে দিতেই এই প্রচার চলছে৷ আরও দাবি করা হচ্ছে, বৃহৎ সংস্থাগুলি চুক্তি চাষের মাধ্যমে ছোট ছোট কৃষকদের নিয়ন্ত্রণ করবে৷ শুধু তাই নয়, বড় বড় এই সংস্থাগুলির লাভের অঙ্কের উপরে নির্ভর করবে সাধারণ মানুষ কী খাবেন৷ তার সঙ্গে এই যুক্তিও সাজানো হচ্ছে যে বড় বড় সংস্থাগুলিকে ব্যাঙ্কগুলি বিপুল পরিমাণ ঋণ দেয় শুধুমাত্র তা মকুব করে দেওয়ার জন্য৷

এর পাশাপাশি নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে খুব সহজেই আদানি গোষ্ঠীর অগ্রগতিকে মিলিয়ে দেওয়া হয়৷ কিন্তু কীভাবে কলেজে পড়া অসম্পূর্ণ রেখে ব্যবসা শুরু করা একজন কীভাবে আন্তর্জাতিক মানের শিল্প সংস্থা তৈরি করে ফেললেন, সেই অবিশ্বাস্য যাত্রাপথ হয়তো অনেকেরই জানা নেই৷ ১৯৯৮ সালে গুজরাতের কচ্ছ অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া এলাকায় মুন্দ্রা বন্দর তৈরির জন্য বিনিয়োগ করেছিল আদানি গোষ্ঠী৷ তখন সেই প্রস্তাবিত বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই আশাবাদী ছিলেন না৷ কারণ তার খুব কাছেই সরকারি কান্ডলা বন্দর ছিল৷ যা অত্যন্ত ব্যস্ত এবং জনপ্রিয় ছিল৷ কিন্তু সেই প্রতিকূলতাকে কাটিয়ে মুন্দ্রায় শিল্প এবং লজিস্টিকস পরিকাঠামো গড়ে তোলার যে সাফল্য, তা যেমন অস্বীকার করা যায় না, সেরকমই তা সহজে অনুকরণও করা সম্ভব নয়৷

একই ভাবে ২০১৬ সালে আত্মপ্রকাশ করার পর জিও-র উল্কাসম উত্থান ঘটেছে৷ একদিকে যখন জিও ৪০ কোটি গ্রাহককে যুক্ত করতে পেরেছে, সেই একই সময় ধীরে ধীরে মুখ থুবড়ে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিএসএনএল৷ এক্ষেত্রে বেসরকারি কর্পোরেট সংস্থাকে সুবিধা করে দিতে কেন্দ্রীয় নীতি বদলের অভিযোগ তোলা হয়৷ কিন্তু জিও-র কাহিনি অসামান্য দৃরদৃষ্টি, প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্খা, দ্রুত গতিতে পরিকাঠামো নির্মাণ এবং একই সঙ্গে ইন্টারনেট নির্ভর ব্যবসায়িক পরিমণ্ডল তৈরি করার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ৷

সব ধনকুবেরদের উদ্দেশ্য যে সৎ হয়, এমনটা নয়৷ কিন্তু সেই রকম মানুষ তো সমাজের সবক্ষেত্রেই থাকে৷ কিন্তু বড় বড় শিল্প সংস্থাগুলি যেভাবে তৈরি করা হয়, তাতে তারাই সমাজের প্রয়োজনগুলি যথাসম্ভব সঠিক ভাবে মেটাতে সক্ষম৷ ফলে ছোট ছোট সংস্থার তুলনায় বড় সংস্থাগুলিই ধারাবাহিক ভাবে কর্মসংস্থান তৈরিতে সক্ষম৷ বলা ভাল, বড় বড় সংস্থাগুলির উপরেই বহু ছোট সংস্থার সাফল্য এবং টিকে থাকা নির্ভর করে থাকে৷

বড় শিল্প গোষ্ঠীগুলির সবথেকে বড় সুবিধা হল, নিজ নিজ ক্ষেত্রে তারা যে কাজগুলি করতে পারে, তা অন্য কারও পক্ষে করা সম্ভব নয়৷ তা সে টিসিএস বা ইনফোসিস-এর তৈরি করা সফটওয়্যার হোক বা রিলায়ন্সের জামনগর প্ল্যান্টে তৈল পরিশোধন৷ একই কথা বলা চলে আদানি গোষ্ঠীর বিমান বন্দর বা বন্দর পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে, বা মহিন্দ্রা এবং টাটা গ্রুপের বিদ্যুৎ চালিত যানবাহন তৈরির উদ্যোগকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা যায়৷ অথবা যেভাবে রিলায়েন্স ভারতে খুচরো বাজারের আধুনীকিকরণ করেছে, তাই বা কম কী?

বৃহৎ সংস্থাগুলি অতিমারির মধ্যেও আরও ফুলে ফেঁপে উঠেছে৷ ধনীরা আরও সম্পদশালী হয়েছেন৷ কীভাবে তা সম্ভব হল, তা ভেবে আমাদের অনেকেই মাথার চুল ছিঁড়েছি৷ কিন্তু এ কথা কি অস্বীকার করা যায় যে বেসরকারি সংস্থাগুলিই উদ্ভাবন এবং নতুন উদ্যোগকে উৎসাহ জুগিয়েছে?

গুজরাত মডেলের উন্নয়নের সাফল্যের উপর ভর করেই ক্ষমতায় এসেছিলেন নরেন্দ্র মোদি৷ আর এই মডেল ছিল শিল্প বান্ধব৷ ফলে গুজরাতি ব্যবসায়ীরাও এই কারণে বিশেষ নজর টেনে নিয়েছেন৷ নরেন্দ্র মোদি সরকার শিল্প বান্ধব যে নীতিগুলি নিয়েছে, তাতে ভারতের কর্পোরেট জগৎ রাজনৈতিক অনুগ্রহ পুষ্ট হচ্ছে, এমন ধারণা সহজেই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হচছে৷

রাজনৈতিক ভাবে এমন হওয়াটা হয়তো সত্যিই কাম্য নয়৷ কিন্তু বর্তমান ভারতের এটাই প্রয়োজন৷ ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং উন্নতিতে গতি আনতে বেসরকারি ক্ষেত্র লাল ফিতের ফাঁস থেকে বের করে আনতেই হবে৷ উদ্যম এবং উদ্ভাবনী শক্তির সঙ্গে অর্থনীতির সংঘাত না ঘটলেই জাতীয় স্তরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হবে, একই সঙ্গে তৈরি হবে কর্মসংস্থান, বাড়বে মাথা পিছু আয়৷ সরকারি সাহায্যে পেয়ে একাধিপত্য কায়েম করা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির থেকে বেসরকারি সংস্থাগুলির এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারের পরিবেশ তৈরি হওয়া একটি প্রবাহমান প্রক্রিয়া, যেখানে খুব কম সংখ্যক সংস্থাই টিকে থাকতে পারবে৷ এটাই প্রকৃতি এবং ব্যবসার নিয়ম৷ ভারতীয় শিল্পক্ষেত্রের আসল পরীক্ষা গোটা বিশ্বকে জয় করা৷ ঠিক যেভাবে অ্যাপেল, স্যামসাং, তেসলা, অ্যামাজন, হুয়েই এবং অন্যান্য বিদেশি সংস্থাগুলি করেছে৷ ফলে এই প্রক্রিয়াকে যতটা খারাপ ভাবে দেখানো হচ্ছে, ততটাও নয়৷

Sanjeeva Shivesh

(লেখক The Entrepreneurship School- এর প্রতিষ্ঠাতা, মতামত ব্যক্তিগত)

Published by: Debamoy Ghosh
First published: January 5, 2021, 9:23 PM IST
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर