ভারতেই আছেন বিশ্বের একমাত্র ‘ডেড ডক্টর’

ভারতেই আছেন বিশ্বের একমাত্র ‘ডেড ডক্টর’

কাশ্মীরা জানান, " আমার ক্যান্টিনটা তো উঠে গেল ৷ তাই স্থির করলাম ডাক্তার হতে পারব না তাই ডেড ডক্টর হব।’’

  • Share this:

Shalini Datta

#কলকাতা: মানবিক ধর্ম পালনের জন্য তিনি কোনও সীমানার মধ্যে আটকে রাখতে পারেননি নিজেকে। কখনও তিনি তিস্তার খরস্রোতা নদীতে ঝাঁপ দিচ্ছেন ৷ আবার কখনও ফুলবাড়ি সীমান্ত পেরিয়ে মহানন্দা সাঁতরে বাংলাদেশ চলে যাচ্ছেন । উদ্দেশ্য একটাই মানবিকতার ধর্ম পালন ।

এই মানবিকতার খাতিরে কোথাও কোনও মানুষ নদীতে ডুবে গেলে বা কেউ নদীতে নেমে হারিয়ে গেলে তাকে খুঁজতে নদীতে ঝাঁপ দেন । এইভাবে অনেক জীবিত বা মৃত মানুষকে তিনি উদ্ধার করেছেন । কোনও জাতপাত নয়, মানবিকতাই তাঁর কাছে শ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং এর জন্য তিনি বারবার নদীতে ঝাঁপ দেন। তাঁর নাম গৌরাঙ্গ রায় । কিন্তু সবাই তাঁকে ‘কাশ্মীরা’ বলে চেনেন। এই নামটি তাঁকে মেডিকেল কলেজের এক ডাক্তার দিয়েছিলেন যখন তিনি জেলের ভিতর ছিলেন।

১৯৭৬ সালে তিনি উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল চত্বরে ক্যান্টিন চালাতেন। বিভিন্ন ডাক্তার ও ডাক্তারির ছাত্ররা তাঁর ক্যান্টিনে খাওয়া-দাওয়া করতেন ও আড্ডা মারতেন । সেখানে বসেই তারা নানান চিকিৎসা শাস্ত্রের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন এবং তিনি তা শুনে তাদের সঙ্গে নিজেকে মানসিকভাবে এক করে তুলেছিলেন। নিজের পড়াশোনা তেমন কিছু করেননি ৷ মাত্র তৃতীয় শ্রেণি পাস করেছিলেন । ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে যাতায়াত করে এবং ডাক্তারি ছাত্রদের সঙ্গে মিশে কিছু ইংরেজি শব্দ বলতে পারতেন।

১৯৭৬ সালে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ডাক্তারির ছাত্ররা ধর্মঘট ও আন্দোলন করে । গৌরাঙ্গও তাঁদের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে, আন্দোলনে মাইক ভাড়া করে দেওয়া ও অটো ঠিক করে দেওয়া ইত্যাদি নানান কাজে তিনি সাহায্য করতেন । সেই সময় পুলিশ আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করে জেলে পাঠালে গৌরাঙ্গ ও গ্রেফতার হন এবং জেলে যান ।সেই জেলের মধ্যে এক চিকিৎসক তার নাম দেন ‘কাশ্মীরা’ কারণ তার চেহারাটা নাকি অনেকটা কাশ্মীরিদের মতন। তার এই নামটা অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে ।

কাশ্মীরা জানান, " আমার ক্যান্টিনটা তো উঠে গেল ৷ তাই স্থির করলাম ডাক্তার হতে পারব না তাই ডেড ডক্টর হব।’’ ডেড ডক্টর মানে মৃত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে আত্মীয়-পরিজনদের হাতে তুলে দেওয়া ।পচা গলা মৃতদেহ হলেও যত্ন করে আত্মীয় পরিজনদের হাতে তুলে দেওয়া যায় তার জন্যই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়া।

শিলিগুড়ি এবং তার কাছাকাছি এলাকায় নদীতে ডুবে যাওয়া মানুষকে উদ্ধার করতে স্পিডবোট ব্যর্থ হলে কাশ্মীরার ডাক পড়ে । এর জন্য বাংলাদেশেও তাকে যেতে হয় । এখন তার বয়স ৬৬ বছর এই কাজটি তিনি করে চলেছেন ৩০ বছর ধরে এবং ১০ হাজারের বেশি মৃতদেহ উদ্ধার করেছেন। শুধু জলে ডুবে যাওয়া নয়, গাইসাল ট্রেন দুর্ঘটনা থেকে অন্যত্র পোকায় খাওয়া পচা-গলা মৃতদেহ ,কঙ্কাল উদ্ধারের দরকার হলে পুলিশ তারই খোঁজ করে।

যেসব দুর্গন্ধযুক্ত মৃতদেহ থেকে সবাই পালিয়ে যায় সেখানে এগিয়ে গিয়ে শবদেহ হাসপাতালের মর্গ বা মেডিকেল কলেজের ময়নাতদন্ত বিভাগে পৌঁছে দেয়। তার একটা টেম্পো আছে যার নাম কে ওয়ার্ল্ড । মানে কাশ্মীরা ওয়ার্ল্ড । আমেরিকা থেকে কোন পর্যটক বেড়াতে এসে মারা গেলে তার দেহ নিয়ে বিমানবন্দরে তার আত্মীয়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজও তিনি করেছেন । তাই তিনি নিজের নামের সাথে ওয়ার্ল্ড কথাটা যোগ করেছেন ।

পুলিশ সামান্য কিছু টাকা দেয় তাকে তাতে তার কোনওমতে সংসার চলে ।কিন্তু তাঁর আসল কাজ হল সেবা। নদীতে কেউ ডুবে গেলে উনি সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁর বাবা যতীন চন্দ্র রায় নৌকা করে বাংলাদেশ যাওয়ার সময় মারা যান নদীতে ডুবে। ভারতে তাদেরকে রেখে দিয়ে বাবা বাংলাদেশে বাড়ি দেখতে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি খুব ছোট ছিলেন ।তখন থেকে নদীর প্রতি তার অদ্ভুত টান । নদীতে ডুবে গিয়ে কারো মৃত্যু হলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি নদীতে ঝাঁপ দেন ।

শিলিগুড়ির পাশে ফুলবাড়ি সেবককের তিস্তার কাছে একটা স্পিড বোট ক্লাব করতে চেয়েছিলেন কাশ্মীরা । প্রশাসনিক কর্তাদের তিনি বহুবার এই কথা জানিয়েছেন, কিন্তু তিনি লেখাপড়া জানেন না বলে তার কথার কোনও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি ।যদিও এখন নানা মহল থেকে শিলিগুড়ি বাগডোগরা গোসাইপুরের বাসিন্দারা কাশ্মীরাকে স্বীকৃতি দেওয়া শুরু করেছেন।

First published: 10:27:57 PM Dec 26, 2019
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर