কলকাতা

?>
corona virus btn
corona virus btn
Loading

বাবা-ছেলে দু’জনে মিলেই ধর্ষণ করত! ভয়ঙ্কর সেই অতীত কাটিয়ে আলোয় ফিরছে ‘কাশী’

বাবা-ছেলে দু’জনে মিলেই ধর্ষণ করত! ভয়ঙ্কর সেই অতীত কাটিয়ে আলোয় ফিরছে ‘কাশী’
প্রতীকী চিত্র ।

পাকাপাকিভাবে কাশীকে নিয়ে আসা হল সোনাগাছিতে । রোজ রোজ কাস্টমারদের ‘খুশি’ করতে হত । কথা না শুনলেই অকথ্য নির্যাতন ।

  • Share this:

#কলকাতা: তখন তিন বছর বয়স । পাঁচ ছেলেমেয়ের মুখে খাবার তুলতে পারছিলেন না বাবা-মা । নামমাত্র কাটায় বেচে দিয়েছিলেন কাশীকে (নাম পরিবর্তিত) । একদিন নতুন জামা পরিয়ে দুই মহিলার সঙ্গে মা তাকে খেলতে পাঠিয়েছিলেন । সেই শেষ দেখা মায়ের মুখ । ওই দুই মহিলা (কাশী তাদের আগে থেকেই চিনত) তাকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় । বেশি বায়না করলে খাইয়ে দেয় মাদক মেশানো পানীয় । যখন চোখ খুলল কাশী, ওদের আর দেখতে পায়নি । তার বদলে সামনে দাঁড়িয়ে ছিল নিষ্ঠুর চেহারার নবীন (নাম পরিবর্তিত) নামের এক ব্যক্তি ।

তিন বছরের ছোট্ট কাশী, এই জীবন, পৃথিবী, ভালমন্দ সম্বন্ধে যার নূন্যতম জ্ঞানটুকুও হয়নি, সে এসে পড়ল অন্ধকার আচ্ছন্ন এক অন্য দুনিয়ায় । পাঁচ সন্তান ছিল নবীনের । তিন ছেলে আর দুই মেয়ে । ওই সংসারের দাসী হয়ে গেল তিন বছরের ছোট্ট মেয়েটা । হয় তালাবন্ধ করে ঘরে আটকে রাখা, না হলে সারাদিন সংসারের সমস্ত কাজ করা আর তা না হলে সবার কাছে মার খাওয়া । এই ছিল কাশীর দৈনন্দিন রুটিন ।

কাশীর কথায়, ‘‘আমার কোনও স্বাধীনতা ছিল না । যেখানে যেতাম, ওদের সঙ্গেই আমাকে যেতে হত। সবাই স্কুলে যেত । আমি বাড়ির কাজ করতাম । পান থেকে চুন খসলেই মার খেতে হত সবার কাছে ।’’ এই ভাবেই ১৫ বছরে পা দিল কাশী । নবীনের বোন আর শ্যালিকা কাশীকে নিয়ে কলকাতায় এল নবীনের স্ত্রী’র কাছে । সেই প্রথম, সোনাগাছিতে পা দিল কাশী । কিন্তু সে নাবালিকা হওয়ায় সবার ভয় ছিল, পুলিশের কানে খবর গেলে হাজতবাস হতে পারে । তাই সোনাগাছি থেকে কাশীর জায়গা হল অন্য এক ভাড়া বাড়িতে । কিন্তু সেখানেও পিছু ছাড়ছিল না পুলিশের ভয় । কাশী’কে তাই পাঠিয়ে দেওয়া হল নবীনের এক ছেলের কাছে, মুম্বইতে ।

এ বার শুরু হল ধর্ষণ । দিনরাত শারীরিক নির্যাতন করত নবীনের ছেলে । বাধা দিতে গেলে সব ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখানো হত । এর এক মাস পর ফের কলকাতায় নবীনের এক ভাইয়ের কাছে এনে রাখা হল কাশীকে । সেখানেও পরিস্থিতি বদলানো না । অকথ্য শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে হত কিশোরী মেয়েটাকে । সেখানে নবীনের আর এক ছেলেও তাকে ধর্ষণ করত। এরপর পাকাপাকিভাবে তাকে নিয়ে আসা হল সোনাগাছিতে । রোজ রোজ কাস্টমারদের ‘খুশি’ করতে হত । কথা না শুনলেই অকথ্য নির্যাতন ।

এক সময় খবর পৌঁছল IJM (International Justice Mission)-এর কানে । কলকাতা পুলিশ এবং IJM অনেক আঁটঘাট বেঁধে উদ্ধার করতে এল কাশীকে । কিন্তু আগে থেকেই কাশীকে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত পর্দার ফাঁকে কাশীর ছোট্ট হাত দু’টি দেখে তাকে খুঁজে পায় পুলিশ । ভীত, সন্ত্রস্ত কাশীকে উদ্ধার করে আনা হয় । সেটা ছিল ৫ এপ্রিল, ২০১৩ সাল । ধরা পড়ে নবীন ও তার সাঙ্গপাঙ্গরাও ।

ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল ছোট্ট মেয়েটা । পুলিশের কাছেও কোনও কথা বলতে চাইছিল না । নিজের বয়স ভুল বলছিল ইচ্ছা করে । অবশেষে জানা যায়, মাত্র ১৫ বছরের কাশী জীবনে প্রচুর চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এসেছে । এরপর শুরু হয় কাশীকে সাধারণ জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার লড়াই ।

হোমে পাঠানো হয় কাশীকে । সেখানে দীর্ঘ এক বছর ধরে চলে তার চিকিৎসা, থেরাপি । ধীরে ধীরে নিজেকে খুলতে শুরু করে সে । সব কথা খুলে বলে । পড়াশোনা করার বড় সাধ কাশীর মনে । সেও অন্য সবার মতো স্কুলের ড্রেস পরে স্কুলে যাবে । কিন্তু ১৫-১৬ বছরের মেয়ে কোন স্কুলে, কোন ক্লাসে ভর্তি হবে? এখানে এল আরও এক বাধা । শেষ পর্যন্ত সব বিপত্তি কাটিয়ে ২০১৪-র নভেম্বরে স্পেশ্যাল স্কুলে ভর্তি হল কাশী । যেন পূনর্জন্ম হল ।

ইংরাজি তার প্রিয় বিষয় । পড়াশোনার পাশাপাশি মেকআপ, টেলরিংয়ের কাজও শিখছে কাশী । শিখছে ভায়োলিন বাজাতে । কাবাডি খেলতে ভালবাসে, হিন্দি গানও দারুণ গায় । এখন IJM চ্যাম্পিয়ন প্রোগ্রামের সক্রিয় সদস্য কাশী। বহু রেডিও টক শো, ওয়ার্কশপ, ট্রেনিং করায় সে । সবাই এক বাক্যে বলে, এ যাবৎকালে উদ্ধার হওয়া মেয়েদের মধ্যে কাশী-ই সবচেয়ে সাহসী ।

কাশীকে তার অতীত নিয়ে জিজ্ঞাসা করলে হেসে উত্তর দেয়, ‘‘জীবনে কিছু পেতে চাইলে, তোমাকে তোমার অতীত জীবনকে ছাড়তেই হবে । আর আগামীর দিকে তাকাতে হবে । অতীতকে ভুলে যেতে চাই আমি, আর জীবনে অনেক কিছু করতে চাই ।’’

আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস । আজকের দিনটার গুরুত্ব সাম্প্রতিক সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের কাছে অপরিসীম । মানসিক অবসাদ যখন ঘিরে ধরছে গোটা বিশ্ব’কে তখন হয়তো আমাদের পথ দেখাবে কাশীর মতো মেয়েরাই । হারিয়ে গিয়েও আলোয় ফিরে আসে যাঁরা । ছোটবেলা থেকে নিগ্রহের শিকার কাশী নিজেও কিন্তু মারাত্মক মানসিক অবসাদে আক্রান্ত ছিল । কিন্তু মনের জোরকে সম্বল করেই নতুন জীবনের পথে এখন তার শুধুই আরোহণ।

Published by: Simli Raha
First published: October 10, 2020, 10:20 AM IST
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर