‘অনাথ আশ্রমের ভাই-বোনেরা না এলে বিয়ে করব না...’ বিয়েতে পাত্রীর ব্যতিক্রমী শর্ত ! 

‘অনাথ আশ্রমের ভাই-বোনেরা না এলে বিয়ে করব না...’ বিয়েতে পাত্রীর ব্যতিক্রমী শর্ত ! 

কলকাতায় নজিরবিহীন বিবাহ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অনাথরা ।

  • Share this:

#কলকাতা: অনাথ আশ্রমের মুসলিম ভাইয়েরা এই প্রথম নিমন্ত্রিত। না, শুধুমাত্র তারাই নয়, অনাথ আশ্রমের ভাই বোনেরা সবাই আজ রায়া  দিদির বাড়িতে যাবে। তাঁর বিয়ের অনুষ্ঠানে যদি ওদের আমন্ত্রণ জানানো না হয় তাহলে বিয়ের পিঁড়িতে বসবো না। বাবার কাছে এমনটাই শর্ত, আবদার করে বসে ছিলেন রায়া। রায়া রায়চৌধুরী । কলকাতার বাগবাজারের বাসিন্দা । শেষমেষ একমাত্র সন্তানের ইচ্ছে মেনে নেন বাবা রাজা রায়চৌধুরী ।

বিয়েই করবে না 'পাতানো দিদি' রায়া। শুধুমাত্র অনাথ আশ্রমের ভাই বোনদের আমন্ত্রণ জানানোর শর্তই নয় , সমাজের কথা ভেবে বিয়েতে 'পণ'  দেওয়া  কিংবা শ্বশুরবাড়ি থেকে কোনও রকম বিয়ের তত্ত্ব নেওয়া  অথবা নিজের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়িতে বিয়ের তত্ত্ব পাঠানোর  ক্ষেত্রেও  রায়া  শর্ত  দেন, বিয়ে উপলক্ষে পাওয়া যাবতীয় উপহার সে তুলে দেবে অনাথ আশ্রমের  আবাসিকদের হাতে। শেষমেষ তাঁর সব শর্ত পরিবার মেনে নেওয়ায় জয়পুরিয়া কলেজ থেকে  পাস করা বাণিজ্য বিভাগের  এই স্নাতক পাত্রী রায়া রায়চৌধুরী  সম্মতি দেন বিয়েতে।

বাগবাজার নিবাসী প্রেমিক যুগল রায়া এবং অনীশ। তিন বছর ধরে প্রথমে ভাল লাগা। পরবর্তীকালে ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন  রায়া রায়চৌধুরী - অনীশ সাহা। অনীশ পেশায়  ব্যবসায়ী । রায়া একদিন কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার  সময় একটি বল তাঁর গায়ে এসে লাগে । কানে ভেসে আসে, 'দিদি বলটা এনে দেবে'। তাকাতেই রায়া দেখেন , অসহায় চেহারা গুলি রাস্তায় চলে আসা বলটিকে কুড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি তাদের না থাকায় কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না।

রাস্তা থেকে বলটি কুড়িয়ে নিয়ে ওদের কাছে পৌঁছতেই সেদিন কলেজছাত্রী রায়া জানতে পারেন ষে ওরা সবাই অনাথ আশ্রমের আবাসিক। মনে দাগ কাটে। তারপর থেকেই নিয়মিত যাতায়াত অনাথ ভাই বোনেদের কাছে। ইচ্ছে ছিল সেদিন থেকেই অনাথ ভাই বোন গুলোর জন্য কিছু করার। ইচ্ছে থাকলেও সমাজে কার্যত অবহেলিত ,লাঞ্ছিত এই সমস্ত অনাথ শিশুদের জন্য সেভাবে কিছু করে হয়ে ওঠেনি ।  যদিও নিয়মিত যেতেন ভাইফোঁটা দিতে ।রাখি বাঁধতে। সাধ্যমত পাশে থাকতেন রায়া।  বিয়েতে রায়ার ব্যবসায়ী বাবা একমাত্র কন্যাকে জিজ্ঞাসা করেন কী নেবে ? বাবার কাছে রায়া ইচ্ছেপ্রকাশ করেন অনাথ ভাই বোন গুলোর মুখে হাসি ফোটাতে  কিছু করার। বলেন, পণ  দেওয়া তো অপরাধ , তাই না বাবা ? সেটা টাকাই হোক বা পণ্যদ্রব্য। শ্বশুরবাড়িতে  তত্ত্ব না পাঠিয়ে তা পাঠাবো অনাথ আশ্রমে।

বল ফেরত দিতে গিয়ে রায়া সেদিন দেখেছিল ওরা যে থালায় খায় সেই  বাসন-কোসনের কী করুন অবস্থা । বিয়েতে নতুন বেনারসি পরনের আগে ভাইদের পড়াতে চান নতুন পাঞ্জাবি। বোনেদেরও দিতে চান নতুন জামা-কাপড়।  বরের বাড়িতে তত্ত্ব না পাঠিয়ে বাসন পাঠাবে অনাথ আশ্রমে। মেয়ের সব ইচ্ছের কথা শুনে প্রথমে কিছুটা অবাকই হয়েছিলেন বাবা বাপি রায়চৌধুরী । মেয়ের শ্বশুরবাড়ি এবং হবু জামাইয়ের সঙ্গে কথা বলে শেষমেষ রায়ার ইচ্ছেপূরণের বিষয়ে  সম্মতি জানায় দুই পরিবারই । বিয়ে উপলক্ষে তাঁকে উপহার না দিতে বলেছেন আত্মীয়-স্বজনদের রায়া। অথচ রায়াকে যদি এরপরও কেউ অর্থ দেন আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে পাওয়া সব টাকা সে তুলে দেবে অনাথ আশ্রম কর্তৃপক্ষের হাতে ।

ভাই বোন গুলোর পড়াশোনার জন্য। পণ নেওয়া অপরাধ । তাই অনীশের পরিবারের দেওয়া তত্ত্বকেও প্রত্যাখ্যান করেছেন রায়া। আগামী সোমবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চলেছেন রায়া - অনীশ। নিমন্ত্রিতদের তালিকায় ১৭০ জন অনাথ ভাই - বোনও । কিন্তু আফশোস একটাই । তাদের  দিদির বিয়ের লগ্ন রাত ১টায় ।তাই অনুমতি নেই আশ্রম থেকে বের হওয়ার। অনাথ ভাই-বোনেদের আফসোসের কথা শুনে মন খারাপ হয়েছিল রায়ার। তাই আজ , শুক্রবার  সন্ধেবেলায় রায়ার আইবুড়ো ভাত উপলক্ষে  অনাথ ভাই বোনেদের জন্য করা হয়েছে বিশাল খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন । সঙ্গে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও। আজই  ওদের হাতে তুলে দেওয়া হবে উপহার। যে অনিশ্চয়তা নিয়ে গত বেশ কয়েকটা দিন কেটেছে। মনে হয়েছে যে কোনও দিন মুহূর্তে আলাদা হয়ে যেতে পারে জাপটে ধরা দু’টো হাত। ভালোবাসার মাঝে নির্দয় ভাবে এসে দাঁড়াতে পারে আপত্তির বেড়া। সব বাধা কাটিয়ে শেষমেষ জয় হল ভালোবাসারই। প্রত্যেকটি প্রেমই আসলে একটা রূপকথা। আর যে প্রেম শুধু ছুঁয়ে থাকে না, জীবনকে আমূল বদলে দেওয়ার শক্তি যে প্রেমে, সেই প্রেম শাশ্বত ! তেমনই একটি প্রেমের সত্যি গল্পের নায়ক নায়িকা  অনীশ আর রায়া। ঠিক কীভাবে প্রেম হয়? তার কোনও নির্দিষ্ট উত্তর হয় না। প্রেমের মনস্তাত্ত্বিক বা সমাজতাত্ত্বিক সংজ্ঞা যাই থাকুক না কেন, এই অনুভূতিকে কোনও শব্দগুচ্ছে সম্পূর্ণত ধরা অসম্ভব। বিশেষ করে সেই প্রেমকে যা শুধুই ছুঁয়ে থাকে না, শুধুই সর্বক্ষণ ঘিরে থাকে না, যে প্রেম জীবনটাকে সাজিয়ে দিয়ে যায়।মনের গভীরে সেই প্রেম সারা জীবন ধরে জেগে থাকে, যে প্রেম খুব নিঃশব্দেই হাত ধরে নিয়ে যায় সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে।

রায়া - অনীশের কথায় , " আমাদের আবাসনে তো এখন ফেস্টিভ মুড।  খাওয়া- দাওয়া। দূরদূরান্ত থেকে আসা আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবদের আড্ডা । যেন সব পেয়েছির আসর। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিই আমরা। প্রতিদিন আমাদের নতুন  দিন। সময়ের সঙ্গে নিজেদের বাজিয়ে নিই নতুন ছন্দে। অতিথিদের মন মিশে রয়েছে আমাদের ঘরের দেওয়ালে। হয়ত  তারা খুঁজে পায় অদৃশ্য রং-তুলি। বারবার রঙিন করতে চায় নিজেদের সাহসী স্বপ্নগুলো। হয়তো অনাথ আশ্রমের  ছোট্ট ভাই বোন গুলোকেও আজ থেকে নতুন স্বপ্ন দেখাবে। সমাজে ব্রাত্য হয়ে না থেকে বেঁচে থাকার স্বপ্ন "।বাগবাজারে  রায়ার আবাসনে সমস্ত আয়োজন শেষ।

শ্যামবাজারের অনাথ আশ্রমের  আবাসিক শুকুর আলী শেখ , রেশমা খাতুন, সৌরভ , সান্তনুর  মত  সব্বাই এখন রায়া দিদির  বিয়ের অনুষ্ঠানে  যাওয়ার আমন্ত্রণ পেয়ে খুবই খুশি। বুকের  ভেতর শিহরণ জেগেছে ওদের। ভালবাসার মানুষকে নিজের করে পাওয়ার স্বপ্নময় আবেশে ভরে আছে ওদের মন। যে মন  ভালোলাগার। ভালোবাসারও। যে অনাথ আশ্রমের আবাসিকদের কথা ভেবেছে রায়া সেই অনাথ আশ্রম পরিচালন কমিটির সদস্য অরূপ চট্টোপাধ্যায় বলেন, "সমাজে যারা নিপীড়িত তাদের কথা ভেবে  রায়ার  ভাবনা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বর্তমান সমাজে ওর মত  আরো অনেকেই আগামী দিনে  সমাজবন্ধু হিসেবে এগিয়ে এলে  সমাজ আরও সুন্দর হবে "। পাত্রীর বাবা রাজা  ও  মা  রশ্মী রায়চৌধুরী মেয়ের  ব্যতিক্রমী ভাবনায় রীতিমত গর্বিত। বললেন, ' বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই সমাজের কথা ভাবে না। কিন্তু ও  নতুন জীবনের পথ চলার মুহূর্তে যেভাবে অনাথ  ভাই বোনেদের  সঙ্গী করল তাতে সমাজকে  অন্ধকার থেকে আলোর দিশা দেখাবে'।

VENKATESWAR  LAHIRI 

First published: February 28, 2020, 3:19 PM IST
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर