কাব্যে উপেক্ষিত শোভন || তিন দশক পরে দক্ষিণ চব্বিশে ভোটের দিনে কোথাও নেই তাঁর নাম

কাব্যে উপেক্ষিত শোভন || তিন দশক পরে দক্ষিণ চব্বিশে ভোটের দিনে কোথাও নেই তাঁর নাম

সুখস্মৃতি: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্নেহ বাৎসল্যে শোভন চট্টোপাধ্যায়। ফাইল চিত্র

তিনি শোভন চট্টোপাধ্যায় যেন কাব্যে উপেক্ষিত হয়ে গেলেন। এটাই কি পাওনা ছিল তাঁর?

  • Share this:

#কলকাতা: দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ১৬ টি কেন্দ্রে একদিন ভোট হচ্ছে এই ভোটতৃতীয়ায়। দলমত নির্বিশেষে সকলেই মেনে নেবেন, এই ১৬টি আসনই তৃণমূলের দুর্ভেদ্য গড় অনেকদিন। লম্বা সময় এখানে একটা গাছের পাতাও পড়েনি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চোখ এড়িয়ে। অভিষেক যদি এই গড়ের অবিসংবাদিত সম্রাট হন, চাণক্য ছিলেন তবে শোভন চট্টোপাধ্যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একসময়ের আদরের কানন। কিন্তু নিয়তির খেল এমনই তৃণমূল থেকে বেরিয়ে বিজেপিতে যখন সদ্য জমাট বাঁধতে শুরু করেছে তাঁর অস্তিত্ব, তখনই তিনি ব্রাত্য হলেন। পছন্দমতো পদ না পেয়ে দল ছেড়ে অন্তরালে চলে গেলেন। গোটা বাংলা তাকিয়ে ছিল যুবরাজ আর চাণক্যের লড়াই দেখবে বলেই, অথচ অনুপস্থিতিতেই ভোটনাট্য মঞ্চস্থ হচ্ছে। তিনি শোভন চট্টোপাধ্যায় যেন কাব্যে উপেক্ষিত হয়ে গেলেন। এটাই কি পাওনা ছিল তাঁর?

২০১৯-এর লোকসভা ভোটের আগে থেকেই শোভনের সঙ্গে তাঁর পুরনো দলের সম্পর্কের সুতো ছিড়ে যায়। শোভন ক্রমেই বিজেপির দিকে পা বাড়ান, সঙ্গে ছিলেন বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি শোভনকে পেয়ে হাতে চাঁদ পেয়েছিল, কারণ দক্ষিণ চব্বিশ পরগণায় সিঁদ কাটতে তাঁর চেয়ে সুযোগ্য ব্যক্তি আর কে হতে পারত! কিন্তু দলের সঙ্গে তাঁদের (শোভন-বৈশাখী) সম্পর্কটা ছিল 'নাজুক', স্পর্শকাতর। তবে শোভন নিজেকে প্রমাণও করেছিলেন। ভোটের মুখে দলকে তিনি একরকম পাইয়ে দিয়েছিলেন ডায়মন্ড হারবারের বিদায়ী তৃণমূল প্রার্থী দীপক হালদারকে। তাঁর হাত ধরেই দক্ষিণ গমনের ঝোঁক বিজেপির। কিন্তু তালিকা সামনে আসতেই দেখা গেল শোভনের নাম নেই। শোনা যায় শোভন লড়তে চেয়েছিলেন রত্না চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে মুখোমুখি। কিন্তু দল তাঁকে না দাঁড় করিয়ে ‌বেহালা পূর্বে প্রার্থী করে রাজনীতিতে নবাগতা পায়েল সরকারকে। শোভন বিষয়টি ভালো ভাবে নেননি, অন্য কোথাও দাঁড়ানো তো দূরে থাক,দলের সঙ্গে সম্পর্কটাই ছিন্ন করেন। অতএব একমরকম ঠাঁইহারা হলেন তিনি। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, শোভন কী ব্যবহৃত হয়ে গেলেন? একা হয়ে যাওয়ার নিয়তিটা কেন এড়াতে পারলেন না তিনি!

১৯৮৫ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে কাউন্সিলার হন শোভন। তার পর থেকে কখনও পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হাত ধরে তাঁকে নিয়ে এসেছেন ক্ষমতার অলিন্দেয অনেকেই বলেন কলকাতা পুরসভার জুতোসেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ যতটা তাঁর আয়ত্ত্বে থেকেছে তেমনটা আর কেউ ভাবতেও পারবে না। কেউ দাবি করবে তিনি মারাত্মক বাগ্মী বক্তা, ঠিক তেমনই কেউ অস্বীকারও করতে পারবে না তিনি অন্তত দক্ষ সংগঠক। এই কারণেই তাঁর আত্মবিশ্বাস ছিল, নিজের কেন্দ্রে দাঁড়ালে তিনি ফুল ফোটাবেন। কিন্তু কোথায় কী, তাঁকে তো লড়াইয়ের আগেই মাঠ ছাড়তে হল!

এমনটা হোক তা চায়নি তাঁর শত্রু শিবিরও। ছেলে সপ্তর্ষি মায়ের হয়ে সর্বাত্মক প্রচার করেছেন। কিন্তু বারংবার সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, "বাবা রাজনীতির লোক, চাইব তিনি রাজনীতিতেই থাকুন, বিরোধী দলে থাকলেও আপত্তি নেই।" তাঁর প্রতি বিশ্বাস অটল বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়েরও। এই আপাত সন্ন্যাসকেই চিরকালীন ধরে নিতে রাজি নন তিনি। বারংবার বলছেন, "ওঁর ধর্মই রাজনীতি। অনেকেই যোগাযোগ রাখেন তাঁর সঙ্গে, যখন তখন ফিরতে পারেন রাজনীতির ময়দানে।" কিন্তু কোন ঘরে ফিরবেন! কালীঘাটের মায়াকাননে আজ কি আর তাঁর জায়গা হবে? বিজেপিও‌ কি ফিরে চাইবে তাঁকে? প্রশ্ন থাকেই রাজনীতির কারবাবারিরা যাই বলুন না কেন, এই ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত রাজনীতি প্রেমী বাঙালির না-পসন্দই। তাঁরাও চান শোভন থাকুন, যুদ্ধ থাক।

Published by:Arka Deb
First published:

লেটেস্ট খবর