মতুয়াগড় নয়, গন্তব্য শুভেন্দুর খাসমহল, কেন শাহের নজর ঘুরল পশ্চিম মেদিনীপুরে

আচমকা কর্মসূচির অভিমুখ পাল্টে শাহের কর্মতালিকায় পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রবেশ| এর পিছনে রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক কারণ ৷

আচমকা কর্মসূচির অভিমুখ পাল্টে শাহের কর্মতালিকায় পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রবেশ| এর পিছনে রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক কারণ ৷

  • Share this:

#কলকাতা: এতদিনের পরিকল্পনা বদলে গেল শেষ মুহূর্তে ৷ বনগাঁর বদলে অমিত শাহের গন্তব্য ফের জঙ্গলমহল ৷ ১৯ তারিখ ফের বাংলায় আসছেন বিজেপি সেনাপতি অমিত শাহ ৷বঙ্গে উনিশ ও বিশে ডিসেম্বর থাকবেন অমিত শাহ। ১৯ তারিখই যাবেন পশ্চিম মেদিনীপুর। ২০ তারিখ গন্তব্য বীরভূম ৷ এর আগে রাজনৈতিক মহল এই জল্পনায় সরগরম ছিল যে মতুয়া গড় বনগাঁয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাল্টা সভাই হচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কর্মসূচির অন্যতম ৷ কিন্তু আচমকা কর্মসূচির অভিমুখ পাল্টে শাহের কর্মতালিকায় পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রবেশ| এর পিছনে রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক কারণ ৷

দুই মেদিনীপুরই এই মূহূর্তে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের হটস্পট ৷ সৌজন্যে শুভেন্দু অধিকারী ৷ তাঁর রাজনৈতিক ভবিতব্য কোন পথে লেখা হবে সেই নিয়ে গত কয়েকমাস ধরে সরগরম বাংলার রাজনীতি ৷ সূত্রের খবর, অমিত শাহের বঙ্গ সফরের মাঝেই খোদ বিজেপি সেনাপতির হাত ধরেই পদ্মশিবিরে যোগদান করবেন শুভেন্দু অধিকারী ৷ নন্দীগ্রামের বিধায়কের মতো বাংলার রাজনীতির মূল্যবান জননেতাকে মেদিনীপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে স্বয়ং গেরুয়াশিবিরের সেনাপতি বরণ করলে পদ্মবাহিনীর ক্ষমতার যে বিজ্ঞাপন তৈরী হবে তা গোটা রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকে ঝাঁকুনি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ৷ শক্তি প্রদর্শনের দামামা মেদিনীপুর থেকে কালীঘাট হয়ে পৌঁছে যাবে সোজা রাজধানী ৷

তবে শুধু শুভেন্দু নয়, অমিত শাহের মেদিনীপুর সফরের পিছনে রয়েছে আরও গুঢ় কিছু রাজনৈতিক কারণ ৷ বরং বলা যায় সেটাই মূল ৷ যেদিন থেকে মোদি-শাহের পাখির চোখ বাংলা, ঠিক তবে থেকেই বাংলার কৃষ্টি সংস্কৃতির উপর বাড়তি আগ্রহ দেখা গিয়েছে গেরুয়া শিবিরের ৷ ‘মন কি বাত’ হোক বা আন্তর্জাতিক সম্মেলন বাঙালি কবি থেকে বাংলার মন্দির উঠে আসছে খোদ প্রধানমন্ত্রীর বার্তায় ৷ বাংলার সংস্কৃতি, বাঙালির ভাবাবেগকে স্পর্শ করে ভোট ময়দানে বাজিমাতের পাশাপাশি নিজেদের ইমেজ পরিবর্তনেও জোর দিতে চাইছে বিজেপি ৷ বাঙালি গায়কেরা উত্তর-পশ্চিম ভারতে সম্মানিত হলেও কেন্দ্রের কাছে বরাবরই অবহেলার আসনেই থেকেছেন বাঙালি বিপ্লবীরা ৷ অথচ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই বাংলার মানুষদের অবদান ছিল সিংহভাগ ৷ বরং দেশভাগের রাজনীতিতে যোগ না দিয়ে বরাবরই দেশমাতৃকাকে ভালবেসে হৃদয় দিয়েই ব্রিটিশদের সঙ্গে লড়াই করেছেন বাঙালি বিপ্লবীরা ৷ কিন্তু তাদের কপালে স্মৃতি-স্মারকের সম্মানের বদলে জুটেছে অবহেলা আর বিস্মৃতির ধুলো ৷ এবার সেই ভুলকেই খানিক সংশোধন করে নিজেদের বহিরাগত তকমার সঙ্গে বাঙালি-অবাঙালির প্রভেদও ঘোচাতে চাইছে বিজেপি ৷ সেই উদ্দেশেই বীরসা মুন্ডার পর এবার অমিত শাহের সফরে দেশের সর্বকনিষ্ঠ স্বাধীনতা সংগ্রামী ক্ষুদিরাম বসুর সম্মাননার পরিকল্পনা ৷

১৯ ডিসেম্বর সকাল ১১ টায় সরকারি হেলিপ্যাড গ্রাউন্ডে কপ্টারে নামবেন শাহ ৷ এরপর পশ্চিম মেদিনীপুরে গিয়ে ক্ষুদিরাম বসুর স্কুল, বাড়ি এবং তাঁর মাসির বাড়ি যাওয়ার কর্মসূচি রয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ৷ এরপর কোন্নগরে কালীমন্দিরে পুজো দেবেন ৷ সেখান থেকে যাবেন মেদিনীপুর শহরে বড়তলা মোড়ের কালীমন্দিরে ৷ এরপর ৭ ডিসেম্বর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের করে যাওয়া জনসভার মাঠেই সভা করবেন শাহ ৷ সেখানে থাকবে ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, কাঁথি, তমলুক, ঘাটাল এই ৫ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি ও মণ্ডল নেতৃত্ব এবং কর্মীরা ৷ এরপর কৃষক ও মৎস্যজীবীদের সঙ্গেও কথা বলবেন অমিত শাহ ৷ এই কর্মসূচিগুলির মাঝেই শুভেন্দু অধিকারীকে বিজেপিতে বরণ করে নেওয়ার প্রোগ্রাম রয়েছে বলে সূত্রের খবর ৷ রাজনৈতিক ময়দানে জল্পনা মেদিনীপুর কলেজ ময়দানের জনসভাতেই শুভেন্দুর যোগদানের গ্র্যান্ড শো ৷

বিধানসভা ভোটের দামামা বেজে ওঠার আগে থেকেই বাঙালি ভাবাবেগকে হাতিয়ার করেই বিজেপির ওপর তৃণমূল শিবির কড়া আক্রমণ চালিয়েছে ৷ বিদ্যাসাগরের মূর্তিভাঙা থেকে আরএসএস-এর ভাবমূর্তি নিয়ে তৃণমূল যে প্রচার চালিয়েছিল, সেই ক্ষতেই প্রলেপ দিতে বাঙালির অবহেলিত দেশনায়কদের আঁকড়ে ধরতে চাইছে বিজেপি ৷

পাশাপাশি সাংগঠনিক দিক থেকেও শাহের টার্গেট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাধের জঙ্গলমহল। পরিবর্তনের পর ক্ষমতায় এসে মমতা সরকারের বিজ্ঞাপনই ছিল ‘হাসছে জঙ্গলমহল, হাসছে পাহাড়’৷ লোকসভা ভোটে পাহাড়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জঙ্গলমহলের মহলে মাথাচাড়া দিয়েছে পদ্ম। বিধানসভা ভোটেও বিজেপির টার্গেট জঙ্গলমহল। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মত, লোকসভা ভোটে ভাল ফলের পর একুশেও জঙ্গলমহলে পদ্ম ফোটাতে ঝাঁপাচ্ছে গেরুয়াশিবির।

অন্যদিকে, শাহের এবারের সফরে উত্তর ২৪ পরগণা না থাকলেও জানুয়ারি মাসে বাংলায় এসে ঠাকুরনগরে ঝড় তুলতে পারেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৷ কৈলাস বিজয়বর্গীর মুখে এর আগেই শোনা গিয়েছে ২১ এর জানুয়ারিতেই নাকি কার্যকর হবে সিএএ। মতুয়া ভোটব্যাঙ্ককে টার্গেট করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কড়া বার্তা দিতে বিশেষ ঘোষণা করতে পারেন শাহ ৷ রাজনৈতিক ময়দানে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে মতুয়া মন পেতে মন্ত্রীসভায় স্থান দেওয়া হতে পারে শান্তনু ঠাকুরকে ৷ তবে আপাতত ১৯-২০ তারিখে অমিত শাহ কী বার্তা দেন শাসক শিবিরকে সেই দিকেই লক্ষ্য রাজ্য রাজনীতির ৷ সঙ্গে পয়সা উসুল শো বহু প্রতীক্ষিত এবং বহুল আলোচিত শুভেন্দুর বিজেপিতে যোগদান ৷

Published by:Elina Datta
First published: