স্বাস্থ্যকর্মীদের যাত্রায় বাধা! আরপিএফের দুর্ব্যবহার প্রশ্নের মুখে রেলের মানবিকতা  

স্বাস্থ্যকর্মীদের যাত্রায় বাধা! আরপিএফের দুর্ব্যবহার প্রশ্নের মুখে রেলের মানবিকতা   
ফাইল ছবি

যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল আগামী ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ ।

  • Share this:

#কলকাতাঃ ভোররাত থেকে বসে আছেন পিন্টু। ষাটোর্ধ বাবার যে আজ  কেমোথেরাপির দিন। বাবার যন্ত্রণা কমাতে হাসপাতালে ডাক্তার ম্যাডামের অপেক্ষা। এদিকে, সকালে উঠেই মেয়ের জন্য রান্না সেরে রেডি অন্নপূর্ণা। তাঁকে বাঁচাতে হবে যে!  না হয় ভাল রাখার আশায় একটু আগেই দৌড়নো যাক। হাজারো বাধা বিপত্তি সরিয়ে  দু-জন যখন দু'জনের অপেক্ষায়, তখন বাধ সাধছে নিয়ম। লড়াইয়ের ময়দানে নামা মুখগুলোর মধ্যে কে জিতল, তা জানা যায়নি। তবে হেরে গিয়েছে  যন্ত্রণাকাতর মুখগুলো। কিন্তু কেন এ কথা? কিসের লড়াই? কেন লড়াই? করোনার মত মারণ ভাইরাসের বিরুদ্ধে গোটা দেশ যখন লড়ছে তখন এ আবার কিসের লড়াই?

লড়াই শুরু শুক্রবার সকালে। করোনা মোকাবিলায় দেশ লক ডাউন। ফলে,  যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল আগামী ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত  বন্ধ। কিন্তু যারা রেলের ফ্রন্টলাইন স্টাফ, স্টেশন মাষ্টার, অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টেশনমাস্টার, তাঁদের- সহ অনেক কর্মীদের নিয়ে আসা নিয়ে যাওয়ার জন্য চলছে 'চেতনা' র জন্য ব্যবহার করা ট্রেনগুলি। আর তাতেই যাতায়াত করছেন রেলকর্মী এবং আধিকারিকরা। এদিন সেই ট্রেনেই উঠে পড়েন নৈহাটির রীণা মজুমদার, অন্নপূর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শ্যামনগরের শর্মিলী ভৌমিক।

আর তারপর.....নৈহাটি ট্রেন ছাড়ার পরেই শুরু হয় বাগবিতণ্ডা। আরপিএফের পাশাপাশি কামরায় উপস্থিত রেলের বাকি কর্মীরা শুরু করে দেন প্রবল চিৎকার-চেঁচামেচি। বারবার চাপ দেওয়া হয় ট্রেন থেকে নেমে যাওয়ার জন্য। তাতেও ক্ষান্ত হননি তাঁরা। শেষমেশ ব্যরাকপুর স্টেশনে ট্রেন ঢুকলে মহিলা আরপিএফ নিয়ে এসে তাঁদের ট্রেন থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়।


শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে অগ্রাহ্য করেই এদিন ট্রেনে চেপেছিলেন রীণা মজুমদার। এনআরএস হাসপাতালের ওপিডি'র সিস্টার ইনচার্জ রীণাদেবী এদিন বলেন, "গোটা দেশে সবাই যখন আমাদের মানবিক দৃষ্টি নিয়ে দেখতে বলছেন, তখন এই ধরণের অমানবিক আচরণ আমাদের সাথে কেন বলুন তো? আমরা তো কারও বাড়ির মা, বাবা বা প্রিয়জনকে সুস্থ করে তুলতেই কাজে যোগ দিচ্ছি। আমাদের যদি ওই ট্রেনে করে নিয়ে যেত তাহলে কি হত?" কি হত সেই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য অনেকের কাছেই অজানা। যেমন আরজি কর হাসপাতালের রেডিয়োথেরাপি বিভাগের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকা পিন্টু বা সন্দেশখালি থেকে আসা খালেদার। তাঁরা তো জানেই না নিয়মের বেড়াজালে আটকে রয়েছেন তাঁদের অন্নপূর্ণা ম্যাডাম।

এদিন নৈহাটি থেকে ট্রেনে উঠেই সমস্যায় পড়েন তিনি। খানিক দুঃখের সঙ্গেই বলেন, "যে রোগীগুলো বা তার পরিবারের সদস্যরা আমাদের মুখের দিকে চেয়ে বসেছিল তাদের কি হল বলুন তো। কত কষ্ট আর এদের সহ্য করতে হবে।" যদিও সেই কষ্টের ভাগীদার হতে চায়নি কোমরে হাত রেখে নিয়ম শেখানো আরপিএফ জওয়ানরা।  অন্নপূর্ণা বলেন, " আমরা নিজেদের স্বাস্থ্যকর্মী বলে পরিচয় দেওয়ার পরও স্টেশনে দাঁড়িয়ে বারবার আমাদের পরিচয়পত্র খুঁজে খুঁজে দেখা হয়। তবে ট্রেনে দু-একজন আমাদের সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে আমাদের নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাবার বয়সী যারা ছিলেন তাঁরা এমন ব্যবহার শুরু করলেন যেন আমরা অচ্ছুৎ।" যদিও গত দুদিন ধরে আমরা এই ট্রেনেই গন্তব্যে পৌঁছেছি। কিন্তু কেন এই সমস্যা? রেলের এক আধিকারিক অবশ্য সব শুনে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কথা বলেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকের সঙ্গে। কিন্তু এটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন, ওটা তো রেল কর্মীদের জন্য দেওয়া। সেখানে বাকিরা কেন? আর তাঁর এই কথাতেই ফের নিয়মের লড়াইয়ে পরাজিত হয়েছে মানবিকতা। জিতে গিয়েছে একরাশ যন্ত্রণা।

ABIR GHOSHAL

Published by:Shubhagata Dey
First published:

লেটেস্ট খবর