যৌনকর্মী জন্মায় না, বানানো হয় ! নতুন পথ দেখাবে নিষিদ্ধ পাড়ায় বড় হওয়া প্রিয়া মন্ডল !

যৌনকর্মী জন্মায় না, বানানো হয় ! নতুন পথ দেখাবে নিষিদ্ধ পাড়ায় বড় হওয়া প্রিয়া মন্ডল !

আত্মরক্ষার জন্য মেয়েদের ক্যারাটে, তাইকোন্ডো, বক্সিং শেখার পক্ষে সওয়াল করেন প্রিয়া।

আত্মরক্ষার জন্য মেয়েদের ক্যারাটে, তাইকোন্ডো, বক্সিং শেখার পক্ষে সওয়াল করেন প্রিয়া।

  • Share this:

#কলকাতা:  প্রিয়া মন্ডল,১৭ বছর বয়স, বউবাজার লালবাতি এলাকার বাসিন্দা,বাবা মা নেই। জন্ম থেকেই বউবাজার হাড়কাটা গলির নোংরা পরিবেশে মানুষ। তবুও সেই পরিবেশের মধ্যে থেকেই পড়াশুনো করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার একটা আলাদা তাগিদ ছিল। এখন আদি মহাকালী পাঠশালার একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী।

বৃহস্পতিবার প্রিয়ার জীবনে এক ব্যতিক্রমী ছোঁয়া। এক ঘণ্টার জন্য রাজ্য শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনের চেয়ারপারসনের চেয়ারে বসলেন প্রিয়া। বিধাননগর রেল স্টেশনের পাশে রাজ্য শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনের অফিসে এদিন অন্য পরিবেশ। বর্তমান চেয়ারপারসন অনন্যা চক্রবর্তী স্বয়ং প্রিয়াকে বরণ করে নিজের চেয়ারে শুধু বসাননি,এমনকি তার কি কি দাবি শিশু অধিকারের বিষয়ে , তা রীতিমতো চার্টার অফ ডিমান্ড আকারে লিপিবদ্ধ করে রাজ্যের শিশু সুরক্ষা মন্ত্রী শশী পাঁজার কাছে পাঠানো হবে বলে জানানো হয়।তবে শুধুই প্রতীকী পদ নয়,বরং এই কিশোরী আজ যে দাবি তুললো, তা চার্টার অফ ডিমান্ড হিসেবে তার সই সহ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

প্রিয়া এখনও রাতে ঘুমোতে পারে না,এতটাই খারাপ পরিবেশ। প্রতিদিন এক অসম্ভব হিংস্র পরিবেশ। চারপাশে নেকড়ের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবুও সেই পরিবেশ থেকেই দক্ষিণ কলকাতা হামারি মুশকান নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে স্কুলে পড়তে পড়তেই অন্য নানা কাজে লিপ্ত হয়। ক্যারাটেতে পার্পেল বেল্ট পেয়েছে প্রিয়া। আত্মরক্ষার জন্য মেয়েদের ক্যারাটে, তাইকোন্ডো, বক্সিং শেখার পক্ষে সওয়াল করেন প্রিয়া। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার দাদা দিদিদের সাহায্যে ফটোগ্রাফি শেখে প্রিয়া। বউবাজারের ঘিঞ্জি অন্ধকারময় গলি থেকে এক ছুটে বেরিয়ে গহীন জঙ্গলে বন্যপ্রাণীদের সঙ্গে মিশে যেতে চায় প্রিয়া। বন্য প্রাণী চিত্রগ্রাহক হতে চায় আগামী দিনে।

লাল বাতি এলাকায় মায়েরা সারা রাত কাজ করে,বাচ্চারা সারা রাত বাইরে ঘুরে বেড়ায়।একটা অদ্ভুত ভায়োলেন্সের মধ্যে সব সময় থাকতে হয় তাদেরকে। অশ্লীল কথাবার্তা,অশ্লীল ইঙ্গিত নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায় এই শিশুদের। সেই কারণেই এই শিশুদের একটা সুস্থ পরিবেশ, স্কুলে ভালোভাবে পড়ার ব্যবস্থা,লাইব্রেরী এর ব্যবস্থা,খেলাধুলা,সেলফ ডিফেন্স এর ব্যবস্থা করা উচিত বলে মনে করে প্রিয়া। বাস,ট্রাম,ট্রেন সহ সব পরিবহনের ভাড়ায় ছাড় দেওয়া উচিত বলেও মনে করে প্রিয়া। যে সমস্ত শিশুরা স্কুলে পড়তে যায়, তারাও বৈষম্যের শিকার। লালবাতি এলাকার শুনলেই বহু সময় তাদের আলাদা চোখে দেখা হয়। এখনকার ছেলেদের জন্য  কন্যাশ্রী এর  মতো প্রকল্প রাখা উচিত বলেও আওয়াজ তুলেছে প্রিয়া। বর্তমানেমিড ডে মিল অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত দেওয়া হয়,এটা দ্বাদশ শ্রেণী অব্দি দেওয়া হোক। এখানকার সমস্ত শিশুরাই সকালবেলায় কোন কিছু না খেয়ে স্কুলে যেতে বাধ্য হয়। প্রত্যেকের মানসিক স্বাস্থ্য অত্যন্ত খারাপ হলে এখানে যাতে মেন্টাল কাউন্সিলর এর ব্যবস্থা করা হয় সেই দাবি তোলেন প্রিয়া। ১৪ বছরের পর এখানকার সবার কাজের সুযোগ দেওয়া উচিত বলেও আবেদন তার।

মালালা ইউসুফজাই বা মিশেল ওবামার সাক্ষাৎকার নেওয়া প্রিয়া মন্ডল ভবিষ্যতে এই এলাকার বাইরে থাকতে চাইলেও তার সব মন জুড়ে থাকবে এই লালবাতি এলাকাই। এখানকার শিশুদের জীবন পাল্টে দেওয়া না অব্দি তার যে সত্যিই ঘুম নেই। তাই তার লড়াই চলবে। আর এই লড়াইতে পাশে দাঁড়িয়েছে রাজ্য শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশন।লালবাতি এলাকার শিশুদের যাতে সমাজের মূল স্রোতে নিয়ে এসে তাদেরকে প্রতিষ্ঠা করা যায় তার জন্য চেষ্টার কসুর করছেনা কমিশন। রাজ্য শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনের বর্তমান চেয়ারপার্সন অনন্যা চক্রবর্তী জানান, " প্রিয়া ব্যতিক্রম হলেও এরকম হাজারো হাজারো প্রিয়া প্রতিদিন অলক্ষ্যে খারাপ পথে পা বাড়াচ্ছে,এটা আটকানোর জন্য আমরা সবরকম চেষ্টা করবো। প্রিয়ার মতো প্রত্যেককে যাতে সমাজে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়,তার জন্য শিশু সুরক্ষা কমিশন বদ্ধপরিকর।"

ABHIJIT CHANDA

Published by:Piya Banerjee
First published: