অভিমান থেকে পথচলা, ‘মেলোডিয়ানা’ এখন স্বপ্নপূরণের কারিগর

অভিমান থেকে পথচলা, ‘মেলোডিয়ানা’ এখন স্বপ্নপূরণের কারিগর

বছর তিনেক আগে আসানসোলের বেশ কয়েকজন শিল্পী বন্ধু মিলে অভিমানেই এই ‘মেলোডিয়ানা’ তৈরি করেছিলেন।

  • Share this:

Venkateswar Lahiri

#কলকাতা: স্কুল জীবন থেকে সদ্য অবসর নিয়েছেন মৃদুলা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিয়ে করেননি। অবসরকালীন জীবনে তাই নিঃসঙ্গ। খুব একটা বন্ধুও নেই, যে আড্ডার আমেজে দিন কাটবে। শীতের পিকনিকটা খুব মিস করতেন। যাবেনই বা কার সঙ্গে।

অবসরপ্রাপ্ত খনি কর্মী রমেন ভট্টাচার্যের স্ত্রী-র পায়ে ব্যথা। ইচ্ছে থাকলেও বসন্ত উত্সবে আর শান্তিনিকেতন যাওয়া হবে না। কিন্তু আবার হোলি মানেই তো আতঙ্ক। ভালোমতো একটা দোল উৎসব হয় না কেন? সৃঞ্জয় গানটা ভালই গায়। সোশাল মিডিয়ায় অন্যের গানের ভিডিও অ্যালবাম দেখত। ভাবতো একদিন আমারও হবে, কিন্তু কলকাতায় গিয়ে অনেক খরচ। সবচেয়ে বড় কথা কোনও যোগাযোগই নেই।

টুকরো টুকরো এরকম বহু স্বপ্ন থাকে, যা অচিরেই হারিয়ে যায়, স্বপ্নের মৃত্যু হয় শুধুমাত্র পরিবেশ, স্থানের নিরিখে। আসানসোলে গত কয়েক যুগে এরকম কত স্বপ্ন হারিয়ে গেছে অতলে, বা ভেসে গেছে দামোদরের দীর্ঘশ্বাসে। কিন্তু গত তিনবছর ধরে আসানসোলে বহু মানুষের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিয়েছে মেলোডিয়ানা। মেলোডিয়ানার সঙ্গে মৃদুলা দেবী এখন আড্ডা দেন, বন্ধু পেয়েছেন অনেক, শীতে পিকনিকেও মজে ওঠেন। রমেন বাবু তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে শতাব্দী পার্কে মেলোডিয়ানার বসন্ত উৎসবে গিয়ে দুবছর ধরে আবির মেখেছেন, ঝুমুর গানের সাথে নেচেছেন। সৃঞ্জয়ের পুজোয় অ্যালবাম হয়েছে। অল্প ক’দিনেই মেলোডিয়ানার পেজ থেকে তা ভাইরাল হয়ে গেছে। এরকম অনেক ছোটছোট স্বপ্নপুরণ হয়েছে মেলোডিয়ানার হাত ধরে। কার্যত রুক্ষ খনি ও শিল্পাঞ্চলে নিঃসঙ্গ মানুষদের এখন বন্ধু হয়ে উঠেছে মেলোডিয়ানা। শিল্পীরা পেয়েছেন নিজেদের ছাতা। সম্মান। বছর তিনেক আগে আসানসোলের বেশ কয়েকজন শিল্পী বন্ধু মিলে অভিমানেই এই “মেলোডিয়ানা” তৈরি করেছিলেন।

“ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও প্রোগাম কোর্ডিনেটরের নামে একদল মানুষ যারা শিল্পীদের মঞ্চ দেওয়ার নামে মাতব্বরি করতেন। যারা নিজেরা কখনও ’সা’ বলেননি, অথচ গুনী শিল্পীকে যোগ্যহীন বলে শহরের গানের মেলা থেকে বাদ দিচ্ছেন ইচ্ছেমত, তাদের ধ্যাস্টামো ভেঙে দিতেই মেলোডিয়ানা তৈরি হয়েছিল” কথাগুলো বলার সময় চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে শিল্পাঞ্চলের তরুণ শিল্পী ও মেলোডিয়ানার ফাউন্ডার মেম্বার তারক চট্টোপাধ্যায়ের। নিউজ এইট্টিন বাংলার এই প্রতিবেদককে এক সাক্ষাৎকারে তারক জানান," মেলোডিয়ানা শিল্পীদের নিজস্ব প্লাটফর্ম। শিল্পীরা নিজেরাই ঠিক করেন, কি করবেন, কীভাবে করবেন।

মেলোডিয়ানা সারাবছর নানান ইভেন্ট করে। শীতে পিকনিক কার্ণিভাল, বসন্ত উৎসব, বর্ষায় প্রকৃতির কোলে নিশিযাপন, প্রতিমাসে অনাবিল আড্ডা। কিন্তু সবকিছুতেই গান, কবিতা, হারিয়ে যাওয়া যন্ত্রসঙ্গীতের মুর্ছনা বিশেষভাবে থাকে। শুরু হচ্ছে মেলোডিয়ানার নয়া ইনিংস। সাংস্কৃতিক হাট। একটা হাটে সবাই নিজের নিজের মত করে গান গাইবেন, নিজের বই, লিটল ম্যাগাজিন, গানের অ্যালবাম বিক্রি করবেন। আগামী বইমেলায় শহর আসানসোলকে নিয়ে প্রকাশ হচ্ছে মেলোডিয়ানার বই “আমার আসানসোল”। এই বইয়ে শহরের সমস্ত গুনীজন লিখছেন। কার্যত একটি দলিল তৈরি হচ্ছে। শহরের ইতিহাস, খনি ও শিল্পাঞ্চলের মানুষের আর্থ সামাজিক চালচিত্র, শিল্পাঞ্চলের থিয়েটার চর্চা, গান, রাজনীতি, আন্দোলন, গনসঙ্গীত থেকে শুরু করে সমাজসেবা কিমবা অন্ধকারময় জগত সবই উঠে আসবে এই বইয়ে। কার্যত এরকম কাজ আগে হয়নি বলে দাবি মেলোডিয়ানার সদস্যদের।

মেলোডিয়ানার নিজস্ব স্টুডিও আছে। কলকাতায় একটি গানের অডিও, ভিডিও অ্যালবাম করতে যেখানে ১৫ থকে ১৮ হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে মেলোডিয়ানা লভ্যাংশ না রেখেই সেই কাজ তার এক তৃতীয়াংশ খরচে করে দেয়। শহরের মিউজিশিয়ানরা কাজ পান, ভিডিওগ্রাফি করা ছেলে ক্রিয়েটিভ কাজ করার সুযোগ পান। ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকার সহ অন্যান্য বেশকিছু সংস্থার বেশ কয়েকটি ডকুমেন্টারি তৈরি করেও নাম কুড়িয়েছে মেলোডিয়ানা। যৌথভাবে অনেকে মিলে এই কাজ করে। সম্মানজনক সাম্মানিকও মিলছে। কার্যত আসানসোলের মত জায়গায় একটা আলাদা ইন্ডাস্ট্রি তৈরি করে ফেলেছে একদল দামাল ছেলে মেয়ে।শিল্পাঞ্চলের এক স্কুলের শিক্ষিকা অমৃতা মুখোপাধ্যায় জানালেন, আমরা নিজেদের লাভের কথা ভাবিনা। যারা গুনী অথচ কাজ নেই, তাদেরকে মেলোডিয়ানায় নিয়ে এসে তার গুনের সমাদর করা এবং তাকে কাজ দিয়ে অল্প হলেও উপার্জনের জায়গা করে দেওয়া আমাদের উদ্দেশ্য।

ভিডিও এডিটর তথা গ্রাফিক্স ডিজাইনার নীলাদ্রি শেখর পাল জানান, "একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করতাম। ফরমায়েসি কাজ করতে হত। টাকা থাকলেও আনন্দ ছিল না। মেলোডিয়ানায় যুক্ত হয়ে আনন্দ নিয়ে কাজ করছি। চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। রোজগার কম হোক, আনন্দে আছি। পেটের খিদের সঙ্গে মনের খিদেও মিটছে"। মেলোডিয়ানা অনেকের জন্য অক্সিজেন। সত্যি এ শহরে সুদিন নিয়ে আসার চেষ্টা করছে তারা। আর্ত অসহায় মানুষের চিকিৎসার জন্য তার পাশে থাকে মেলোডিয়ানা, বৃদ্ধাশ্রমের আবাসিকদের আনন্দ দিতে পৌঁছে যায় মেলোডিয়ানা। আগামী দিনে মেলোডিয়ানায় থেকেই একগুচ্ছ নতুন ছেলে মেয়ে ছোট সিনেমা করার কথা ভাবছে। সত্যি যদি সেই কাজ সফল হয়, তবে আগামী দিনে আসানসোল থেকে ব্যতিক্রমী এক অধ্যায় রচনা হবে। সেই দিনটারই এখন স্বপ্ন দেখছে শহরবাসী।

First published: 10:48:53 PM Dec 26, 2019
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर