ইনসুলিন থেকে জীবনদায়ী ওষুধ, রোগীদের মুশকিল আসান !গবেষণায় "পোর্টেবল ফ্রিজের" আবিষ্কার...

ইনসুলিন থেকে জীবনদায়ী ওষুধ, রোগীদের মুশকিল আসান !গবেষণায়

বাজারে আসছে নয়া ফ্রিজ।

  • Share this:

#কলকাতা: ডায়াবেটিসে আক্রান্তের  সংখ্যা আমাদের দেশে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কলকাতা কিম্বা এ রাজ্যের  আক্রান্তের সংখ্যাও কম নয়। এমনকী কঠোরভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো চলার পরও এই রোগকে ঠেকানো যাচ্ছে না। এই অবস্থায় ইনসুলিন কিম্বা ওষুধ আজ নিত্যসঙ্গী অনেকেরই । ডায়াবেটিস বা সুগার রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য দীর্ঘ গবেষণায় উঠে এল সুখবর ৷ বাজারে আসতে চলেছে পোর্টেবল ইনসুলিন কুলার ।

এ রাজ্যের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের দুই অধ্যাপক ও এক পড়ুয়া প্লাস্টিকের কন্টেনারে  তৈরি করে ফেলেছেন দীর্ঘ সফরকালে ব্যবহারযোগ্য ইনসুলিন বহনের ছোটো ফ্রিজ বা ইনসুলিন কুলার। সাধারণত ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী তথা তাঁদের পরিবার ঘোর  সংকটে পড়েন যখন ট্রেনে ,বাসে ,বিমানে কিম্বা গাড়িতে ঘন্টার পর ঘন্টা দীর্ঘ সফর করেন। সফরকালীন  ইনসুলিন বহন করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন । সফরকালে ইনসুলিনের প্রয়োজন পড়তেই পারে। কিন্তু কীভাবে এবং কোথায় ইনসুলিন রাখবেন তাঁরা তা ভেবে কূলকিনারা পান না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনেক সময়ই  ইনসুলিন নেওয়া থেকে নিরুপায় হয়ে বিরত থাকতে বাধ্য হন অনেকেই।  তাছাড়া এমন অনেক ওষুধ আছে যেগুলিকে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখতে হয় ৷ অনেকই এই ধরনের ওষুধ সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়েন । নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ওষুধ না রাখার কারণে অনেক সময় ওষুধ নষ্টও হয়ে যায় । সমস্যা সমাধানের সেই ভাবনা থেকেই গবেষণা শুরু । শেষমেষ সমস্যার সমাধানে গবেষণায় তাক লাগানো আবিষ্কার করে ফেললেন রাজ্যেরই দুজন অধ্যাপক এবং এক পড়ুয়া।

পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোলের বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের  অধ্যাপক ও ছাত্র মিলে তৈরি করে ফেলেছেন ইনসুলিন কুলার। যা নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। এবার সহজেই এই ছোটো বা পোর্টেবল ফ্রিজে ইনসুলিনসহ অন্যান্য ওষুধ বহন করতে পারবেন রোগীরা । কিন্তু কী এই ইনোভেটিভ পোর্টেবল কুলার? মূলত ডায়াবেটিক রোগীদের সমস্যার কথা ভেবে এই ফ্রিজে শুধুমাত্র যে ইনসুলিন বহন করা যাবে তা নয় , ইনসুলিন থেকে জরুরি জীবনদায়ী ওষুধ-- সবই সফর করাকালীন সঙ্গে বহন করা যাবে। বহন করাও সুবিধাজনক । এমনটাই বলছেন এই যন্ত্রের অন্যতম আবিষ্কর্তা অধ্যাপক বিকাশ মণ্ডল, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক রাজন সরকার, ঝাড়খণ্ডের ধানবাদের বাসিন্দা তরুণ পড়ুয়া গবেষক ইন্দ্রজ্যোতি রানো ।

এই মেশিন বা যন্ত্রটি দেখতে  অবিকল টিফিন বক্সের মতো । ব্যবহার করাও অত্যন্ত সহজ। গবেষকদের অন্যতম আসানসোল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের এপ্লায়েড ইলেকট্রনিক্স এন্ড ইন্সট্রুমেন্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক বিকাশ মণ্ডল বলেন, "মাইক্রো-কন্ট্রোলার সিস্টেমের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে এই ইনসুলিন কুলার যন্ত্রটি। আমাদের বিভাগের ছাত্র ইন্দ্রজ্যোতি রানোই  এই যন্ত্রের মূল কারিগর। লম্বায় ১০ ইঞ্চি, চওড়া এবং উচ্চতায়  যথাক্রমে ৬ এবং ৪ ইঞ্চির এই যন্ত্রটি ৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে। সঙ্গে রয়েছে আধুনিক ব্যাটারি । যা এই স্বয়ংক্রিয়  যন্ত্রটির প্রধান চালিকাশক্তি । ব্যাটারি এক ঘণ্টা চার্জ করলে ১০ থেকে  ১২ ঘণ্টা মেশিনের অন্দরমহলের  ৭ ইঞ্চি লম্বা এবং চওড়া ও উচ্চতা যথাক্রমে ৩ এবং ১ ইঞ্চি কুলিং এরিয়া সক্রিয় থাকবে ৷ অর্থাৎ ইনসুলিনসহ অন্যান্য ওষুধ নিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা সফর করতে পারবেন একজন রোগী । ওজনও বেশি নয়, মাত্র ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ৭০০ গ্রাম"।

কিন্তু বাজারে এলে মধ্যবিত্তের হাতের মধ্যে থাকবে তো যন্ত্রের মূল্য ?কলেজের অধ্যাপক বিকাশবাবু জানালেন, যন্ত্রটির দাম আমজনতার সাধ্যের মধ্যেই থাকবে ৷ ইনসুলিন কুলারের আরও এক বিশেষ কার্যকারিতার কথাও জানালেন তিনি ৷ বললেন , ডিভাইসটির মধ্যে এমন এক প্রযুক্তি রয়েছে  যার ফলে অ্যালার্ম দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে ৷যে অ্যালার্ম রোগী অথবা রোগীর পরিবারের সদস্যকে  মনে করিয়ে দেবে, ইনসুলিন নেওয়ার সময় হয়েছে এবার । অপর গবেষক ইন্দ্রজ্যোতি রানোর কথায়, আমার পরিবারে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সমস্যায় পড়ার ঘটনা খুব কাছ থেকে দেখেছি। এরপর থেকেই সমস্যা সমাধানে কিছু একটা করার  ইচ্ছে থেকেই  সমাজের পাশে থাকার ভাবনা নিয়ে গবেষণা শুরু করি। ইন্দ্রজ্যোতি বলেন, সকলের কথা ভেবে ১০৫০০ mah ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাটারিটি ৫ ভোল্ট অথবা ১২ ভোল্টের মোবাইল চার্জার , পাওয়ার ব্যাঙ্ক অথবা ইউএসবি কেবল মারফতও চার্জ দেওয়া যাবে। বর্তমান সময়ে যে সমস্ত ফ্রিজ়ার সিস্টেম রয়েছে সেগুলি অনেক ক্ষেত্রেই পরিবেশবান্ধব নয় ৷ কিন্তু এই  পোর্টেবল কুলারটি  সম্পূর্ণভাবে ইকোফ্রেন্ডলি বলে দাবি তাঁর । সেক্ষেত্রে যুগান্তকারী যন্ত্র হয়ে ওঠার সব গুণ রয়েছে ইনোভেটিভ পোর্টেবল এই ইনসুলিন কুলারের ৷

গত বছরের প্রথম দিকে কলকাতার ইনস্টিটিউশন অফ ইঞ্জিনিয়ার ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষের কাছে নিজেদের ভাবনার  প্রজেক্টটি প্রস্তাব আকারে পাঠানো হয়। অবশেষে সেখান থেকে অনুমোদন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভাবনার বাস্তব রূপ দিতে রাতদিন এক করে  কাজে লেগে পড়ার পর অবশেষে মিলল সাফল্য। ইতিমধ্যেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছে "কুলিং পোর্টেবল  ফ্রিজ" এর  কার্যকারিতা এবং উপকারিতা হাতেকলমে বুঝিয়ে চিকিৎসকদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন  ছাত্র -অধ্যাপকরা। চিকিৎসক মহল রীতিমত তাজ্জব হয়ে গিয়েছেন এই যন্ত্রের ব্যবহার সম্পর্কে জেনে। রোগী এবং তাঁদের পরিবারের মধ্যেও জন্মেছে আগ্রহ । তবে এখনও এর ব্যবহারিক প্রয়োগ শুরু হয়নি। প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পাওয়ার পরই বাণিজ্যিকভাবে এর ব্যবহার শুরু হলে  অনেকেই উপকৃত হবেন বলে মনে করছেন চিকিৎসক থেকে শুরু করে প্রত্যেকেই। তাই পেটেন্ট সহ  ব্যবসায়ীক দিকটি নিয়েও এখন চিন্তাভাবনা চলছে । আমরা চাই, ' যত তাড়াতাড়ি সম্ভব  মানুষ এই পোর্টেবল ফ্রিজের  সুফল  পাক।  তাহলেই আমাদের গবেষণা সার্থক হবে '। রোগীদের স্বার্থে চটজলদি সরকারি উদ্যোগেরও  আর্জি জানাচ্ছেন  পড়ুয়া থেকে  অধ্যাপকেরা। ইচ্ছে থাকলে যে ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলা যায় তার ব্যতিক্রমী উদাহরণ  এই পোর্টেবল কুলার।  যা নিঃসন্দেহে  আধুনিক চিকিৎসাক্ষেত্রে এক নতুন পথের দিশা  দেখাবে।

First published: March 4, 2020, 12:18 PM IST
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर