corona virus btn
corona virus btn
Loading

রাতের কলকাতায় তিনিই ‘শহেনশাহ’, বিপদে পড়লে মানুষের পাশে মধুসূদন

রাতের কলকাতায় তিনিই ‘শহেনশাহ’, বিপদে পড়লে মানুষের পাশে মধুসূদন

বিপদে পড়া মানুষকে উদ্ধার করতে সবসময় মুখে হাসি নিয়ে প্রশ্ন করেন ,"কোনও সমস্যা হলে বলুন, আমি পৌছে দেব। ভাড়া না দিলেও চলবে।"

  • Share this:

Shalini Datta

#কলকাতা: রাত পৌনে দুটোর সময় ফাঁকা রাস্তায় দুই মহিলা ভয় ভয় দাঁড়িয়ে আছেন । সঙ্গে রয়েছে কয়েকটি বাচ্চা। তারাও ভয় পেয়ে মায়েদের আঁচলের তলায় আশ্রয় নিয়েছে। তাদের মনে তখন একটাই জিজ্ঞাসা, আজ রাতে কিভাবে বাড়ি পৌঁছানো যাবে?

সেই সময় রাতের অন্ধকারের মধ্যে দেখা গেল এক জোড়া হেড লাইটের তীব্র আলো ।একটা গাড়ি আসছে, আবার ভয় কোনও বিপদ নেই তো ? সেই সময় একটা সাদা অ্যাম্বাসাডর তাদের সামনে দাঁড়াল। সেখান থেকে নেমে এসে চালক বললেন "ভয় নেই, আমি আছি চলুন আমার সঙ্গে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি । ভাড়া দিতে হবে না ।"প্রথমে একটু ভয় পেলেও তারা রাজি হলেন । সাদা অ্যাম্বাসেডরের এই চালককে এখনও চেনেনা কলকাতা । তিনি অবশ্য চেনাতে চান না । রাতের শহরে নিঃস্বার্থভাবে বিপদে পড়া মানুষজনকে উদ্ধার করে চলেছেন বছর চল্লিশের বয়সের এই মানুষটি। তিনি তিলোত্তমা কলকাতার বিপদের দিনে ‘মধুসূদন’ ৷ ঝড় বৃষ্টি মাথায় করে তিনি শহরের এমাথা-ওমাথা চষে বেড়ান।

বিপদে পড়া মানুষকে উদ্ধার করতে সবসময় মুখে হাসি নিয়ে প্রশ্ন করেন ,"কোনও সমস্যা হলে বলুন, আমি পৌছে দেব। ভাড়া না দিলেও চলবে।" বাঘাযতীন গাঙ্গুলিবাগান এলাকায় বাড়ি । নাম জয়দেব ঘোষ । নিজেরই গাড়ি চালান তিনি। সকালে কাজ করেন জলসম্পদ ভবনে। তিনি তার সর্বস্ব দিয়ে বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান । তাতে তার লাভের অঙ্ক কিছুই বাড়ে না, কিন্তু আতঙ্ক মাখা মুখগুলোতে যখন হাসি ফুটে ওঠে সেটাই তার কাছে বড় প্রাপ্তি । বাঘা যতীনের ভাড়া বাড়িতে তার টানাটানির সংসার।

ছেলে অভিজিৎ ক্লাস নাইনের মেধাবী ছাত্র বাঘাযতীন বয়েজ স্কুলের ।সংসার খরচ, ছেলের পড়াশোনার খরেচ তার হিমশিম খাওয়ার অবস্থা। সকাল দশটার সময় ডিউটি থাকে তারপর বাড়ি ফিরে কিছু খেয়ে গাড়ি নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়েন রাতের শহরে । রাত ১০টা থেকে ভোর চারটে পর্যন্ত সারা শহরের নানান জায়গায় ঘুরে বেড়ান বিপদে পড়া মানুষদের উদ্ধার করতে। নিরাপদে তাদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়াই তাঁর কর্তব্য। কেন এই কর্তব্য তিনি নিয়েছেন তার ঘাড়ে? তিনি নিজেও জানেন না ।বললেন, "আমি অত ভেবে কিছু করিনা, এখন যা দিনকাল এই সময় মানুষকে কিছুটা উপকার করতে পারলে আমি শান্তি পাই। কত দুর্ঘটনার কবলে পড়া বিপন্ন মানুষকে দেখেছি রাস্তায় কাতরাতে তাই যতটা পারবো মানুষের পাশে থাকবো ।"

২০১৫ সাল থেকে তিনি রাত দশটার পর গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছেন । তবে কখনও কখনও তার আগেও বেরোন । একটা ঘটনা তাকে খুব নাড়া দিয়েছিল। সময়টা ঠিক তার মনে নেই তবে বলেছেন ,"এক ঝড় বৃষ্টির রাতে একজন মহিলাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ফিরছি বেলঘড়িয়া এক্সপ্রেসওয়েতে। চোখের সামনে একটা বাইক কে জমা জলে ছিটকে পড়তে দেখলাম। সেটায় ছিলেন এক তরুণ দম্পতি ও তাদের ছেলে বাচ্চাটাকে নিয়ে জলে পড়ে গিয়েছিলেন তরুণী। বাইক টাও উল্টে গিয়েছিল । বড় বিপদ হতে পারত। ওই দম্পতিকে তাদের বাড়ি দমদম পার্কে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এই ঘটনা তাকে খুব ভাবায় ।

১৯৯৮ সাল থেকে উনি গাড়ি চালাচ্ছেন এবং আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অনেক সময় আইটি সেক্টরের তরুণীকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছেন, কখনো বা ক্যাটারিং এর ছেলেমেয়েদের বাড়ি পৌঁছে দিয়েছেন ,বা হাতে পয়সা না থাকা দুঃস্থ মানুষদের বাড়ি পৌঁছে দিয়েছেন বিনা পয়সায়। একবার মল্লিক বাজার এর কাছে একটি ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে রক্ত নিয়ে দুই যুবকের মাঝরাতে যাওয়ার কথা ছিল বারাসতের একটি হাসপাতালে। তাড়াতাড়ি পৌঁছতে না পারলে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হতো । রাত তখন প্রায় একটা । সেখানেও ত্রাতা হিসেবে পৌঁছেছিলেন জয়দেব বাবু । পৌঁছে দিয়েছিলেন দু'জনকেই ঠিক সময়। একবার ফ্রান্সের দুই যুবককে মধ্যরাত্রে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাদের চোখে যে কৃতজ্ঞতা দেখেছিলেন তা সারাজীবনেও ভোলার নয় । এমন ভাবেই ছুটে চলেছেন । তার ছুটি নেই । সারারাত তেলের খরচ রোজগারের থেকে বেশি।

ছেলেকে উচ্চ শিক্ষা দিতে চান তাই তাকে আরও পরিশ্রম করতে হবে কিন্তু রাতের এই জার্নিটা তার পেশা নয় বরং নেশা । তার কথায়, অভাব যদি মুখের খাবার কেড়ে নেয় তাহলে তিনি অন্য অন্য শহরে চলে যাবেন। কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছাড়বেন না । এমনই থাকুন জয়দেব বাবু, কলকাতা আপনাকে কুর্নিশ জানাচ্ছে।

Published by: Siddhartha Sarkar
First published: December 23, 2019, 5:40 PM IST
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर