ব্রিগেডে শক্তিপ্রদর্শনেই কি খেলা সাঙ্গ? বামেরা বামেদের ভোট দেবেন তো?

ব্রিগেডে শক্তিপ্রদর্শনেই কি খেলা সাঙ্গ? বামেরা বামেদের ভোট দেবেন তো?

বামেদের রবিবাসরীয় ব্রিগেডে জনজোয়ার।

বাম নেতাদের এই হাসিমুখটা ২ মে পর্যন্ত বহাল থাকবে তো?

  • Share this:

#কলকাতা: দূরবীন দিয়ে খুঁজলেও পাওয়া যাবে না, তাদের নিয়ে চালু এই প্রবাদ ভাঙল বামেদের ব্রিগেড। শক্তির পরীক্ষার ব্রিগেড আক্ষরিক অর্থেই ঐতিহাসিক হয়ে উঠল অযুত মানুষের যোগদানে। বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু, বা অধীর চৌধুরীর মতো বর্ষীয়ান নেতারাও বললেন, এ দৃশ্যটা আগে দেখেননি। রবিবার বেলাশেষে হা-ক্লান্ত মানুষের এই মহামেলাটা যখন ভাঙছে একটু একটু করে,প্রশ্নটা উঠল ঠিক তখনই। বাম নেতাদের এই হাসিমুখটা ২ মে পর্যন্ত বহাল থাকবে তো? সলতে তো পাকানো হল, আলো জ্বলবে তো? তাড়া করবে না তো ইতিহাসের ভূত?

ইতিহাসের প্রশ্নে খুব বেশিদূর যেতে হবে না। শেষ লোকসভা নির্বাচনের আগে, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ -এ ঠিক এইভাবেই ব্রিগেডে বামেদের স্বতঃস্ফূর্ত ভিড় বিরোধীদের কপালে ভাঁজ ফেলেছিল। লাখো মানুষের সেই সমাবেশ বাড়তি মাত্রা পায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কয়েক মিনিটের উপস্থিতিতে, দেবলীনা হেমব্রেমের ঝড়তোলা বক্তব্যে। উৎসাহ, উদ্দীপনার সেই জোয়ার দেখে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা নতুন করে হিসেব কষতে শুরু করেন, ঠিক কটি আসন পেতে চলেছে বামেরা। সাত দফার ভোটের শেষে ২৩ মে,২০১৯ দেখা যায়- বামেদের ঝুলি শূন্য। একটিও আসন পায়নি বামেরা। কাজেই ঘাতক স্মৃতি ভয়জাগানিয়া তো বটেই। মনে রাখতে হবে ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে সিপিএম যে দাগ কাটতে পারেনি তা-ই নয়, শেষ বিধানসভার ২৬ শতাংশ ভোটটা এসে ঠেকে ৭.৫২ শতাংশে। বাংলার রাজনৈতিক মঞ্চে প্রতিষ্ঠিত হয় নতুন তত্ত্ব- বামের ভোট রামে। কেন এমন হল, তার একাধিক ব্যখ্যা চালু আছে। কিন্তু একটা কথা ২০১৯-এ প্রমাণ হয়ে যায়, ব্রিগেড গর্জন আর ব্যালট বর্ষণে আকাশপাতাল ফারাক। ব্রিগেডমুখী জনতা বামেরা নিজেদের প্রতীকে ভোট দিলে ভোট সাত শতাংশে নামবে কেন! সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে 'ভিড়'এর তাৎপর্য নিয়ে, এই তুমুল উৎসাহী জনতা কি শেষমেষ নিজের দলকেই ভোট দেয় না?

মঞ্চে তখন বক্তা সীতারাম ইয়েচুরি। মঞ্চে তখন বক্তা সীতারাম ইয়েচুরি।

প্রশ্নটা শুনেই পঞ্চায়েত মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় বলেন, "ভোটের ভিড়টা দেখলেই বোঝা যায় পাঁচ জায়গায় মাঠ ঘুরে ঘুরে সভা করলে। সেখানে কথা হয় ভোটকে সামনে রেখে। ১৯৭৭- ইন্দিরা যখন ভোটপ্রচার করেন, তখন এর থেকেও বেশি ভিড় হয়েছিল। কিন্তু কংগ্রেস সেখানে সেবার গো হারা হেরেছিল।" সুব্রত মুখোপাধ্যায় অবশ্য এই ধরনের মিটিংয়ের ইমপ্যাক্টটা অস্বীকার করছেন না। তাঁর কথায়, "হ্যাঁ, এই ধরনের সমাবেশে জনগণের মধ্যে একটা ইমপ্যাক্ট তৈরি হয়। তবে আমজনতাকে নতুন করে টানতে পারে না এই ধরনের সমাবেশ।" পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ফিরহাদ হাকিম তুলনাটা টানলেন কংগ্রেসের ১৯৯৩-এর ব্রিগেডকে সামনে রেখে। তাঁর কথায়, "এমনই ভিড় হয়েছিল কংগ্রেসের ডাকা জনসমাবেশে। কিন্তু ভোটের ফল কংগ্রেসকে হতাশ করে।"

কিন্তু আমজনতার ভোট নতুন করে টানা যাবে কিনা তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, নিজেদের ভোটব্যাঙ্কটা ধরে রাখা। পরিসংখ্যান তো বলছে গত লোকসভায় বামেরাই বামেদের ভোট দেয়নি। এই ঘটনাকে অবশ্য ট্রেন্ড বলে মানতে নারাজ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক শুভময় মৈত্র। তাঁর মতে, ২০১৯ এ ব্রিগেডে ভোটটা ছিল কেন্দ্রের, জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে এর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল, বেশির ভাগ মানুষই ভোট দিয়েছিলেন বিজেপিকে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আনতে। কেউ কেউ আবার ভেবেছিলেন বিজেপি তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই দিতে পারবে। এবার প্রেক্ষিত আলাদা।

পায়ে পায়ে মঞ্চে উঠছেন বিমান বসু, সীতারাম ইয়েচুরি। পায়ে পায়ে মঞ্চে উঠছেন বিমান বসু, সীতারাম ইয়েচুরি।

২০১৯ লোকসভা ভোটের ফল নিয়ে একাধিক ব্যখ্যা রাজনৈতিক মহলে চালু আছে। পর্যবেক্ষকরা অঙ্ক কষে দেখান ২০১৯ পদ্মের পাপড়ি মেলার পিছনে আছেন বামেরাই। কারণ যে বিজেপি বছর তিনেক আগে পঞ্চায়েত নির্বাচনে মাত্র ১০.১৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, ২০১৯ সে তারাই পায় ৪০.২৩ শতাংশ ভোট। তাঁরা বলেন, তৃণমূলকে সরাতে বিজেপির হাত শক্ত করতে বামেরা পদ্মের দিকে ঝুঁকেছিল এটা যেমন ঠিক, তেমনই ভোট সংগঠিত করার ক্ষেত্রে , ভোটারদের ভোট দানে উজ্জীবীত করার ক্ষেত্রে অনেক আগে থেকেই পিছিয়ে পড়ছিলেন বাম নেতৃত্বরা। বরং ব্রিগেডের মতো শক্তিপ্রদর্শনের মঞ্চ বাম বিরোধীদের বুঝিয়ে দেয় কোথায় বামেদের কতটা শক্তি। সেটা বুঝেই ব্লু প্রিন্ট তৈরি করে তৃণমূল-বিজেপি। পাশাপাশি পুলওয়ামার ঘটনায় জাতীয়তাবাদী রবরবা বিজেপির হাত শক্ত করে।

প্রাক্তন সাংসদ তথা সিপিএম-এর জেলা সম্পাদক শমীক লাহিড়ীর ব্যখ্যায়, "মানুষকে ২০১৯-এ বালাকোট-পুলওয়ামা দেখিয়ে ভোট করা হয়েছে। পারফরম্যান্স দেখিয়ে ভোট করা হয়নি। লোকসভার পরের ভোটগুলি দেখুন, বিজেপি বাজে ফল করেছে। বিহারেরে জয়টাকে তো আর জয় বলে না। এবার তা হবে না।" হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারে বামেদের স্ট্র্যাটেজিটা তাহলে কী? শমীক বলছেন, "২০১৯-এ আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে লড়েছিলাম। ২০১৬ তে আমরা আর কংগ্রেস একসঙ্গে হয়েছিলাম, খুব তাড়াহুড়ো করে। লড়াই, আন্দোলনের মধ্যে দাবিদাওয়া অর্জন করার বোঝাপড়াটা তৈরি করতে পারিনি। এবার অনেক আগে থেকেই আমরা দাবিদাওয়া লড়াই আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে আমাদের সংযুক্ত মোর্চার আত্মপ্রকাশ। ওদের মানুষকে উত্তর দিতে হবে। ৫৭০ টাকার গ্যাস কেন ৮২৫ টাকা, এর উত্তর বিজেপির থেকে মানুষ চাইবে। তৃণমূলকে বলতে হবে রাজ্যে কেন একটা কলকারখানাও হল না। কেন শূন্যপদগুলি ভর্তি করা গেল না। এই জায়গা থেকেই এবারে আমরা আমাদের ভোট ঘরে তুলব।"

বার্ডস আই ভিউ-তে রবিবাসরীয় ব্রিগেড। বার্ডস আই ভিউ-তে রবিবাসরীয় ব্রিগেড।

সিপিএম বিরোধীরা ২০১৯ এ নতুন অস্ত্র পেয়ে বলতে শুরু করে বাম আর রাম, তফাত কেবল একটি ফুটকির। এবার তেমনটা নাও হতে পারে। অন্তত আজকের ব্রিগেডের পরে এমনটাই বলছেন শমীক লাহিড়ী। একই কথা বলছিলেন শুভময় মৈত্রও। তাঁর যুক্তিতে, বাড়তে পারে সিপিএম-এর ভোটের শতকরা হিসেবও। শুভময় আমাদের বলেন, "এক ধরনের মেরুকরণের পথে যাচ্ছে সিপিএমও, যাতে তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে হাত দেওয়া যায়। এক ভাবে ভাবলে এতে বিজেপির লাভ আছে। তবে, এই আইএসএফ-এর সঙ্গে জোট সিপিএম-কে জয়ের গন্ধ দিচ্ছে। কংগ্রেস কখনই জয়ের হাতছানিকে সিপিএম-এর সামনে তুলে ধরতে পারেনি। কয়েকটি জেলায় তাদের অসংগঠিত কিছু ভোট আছে। ফলে সিপিএম এবার বাজিটা ধরছে। এতে সিপিএম-এর ভোট বেড়ে ১০-১২ শতাংশ হতে পারে। এটা হবে ওই জয়ের গন্ধের কারণেই। আর ভোট শতাংশ তার থেকেও বেশি হলে সেটা হবে ম্যাজিক। সিপিএম-এ ভোট ফেরত আসা মানে কিন্তু বিজেপির ভোট কমাও।"

আগামী সপ্তাহের মধ্যেই হয়তো প্রার্থীতালিকা প্রকাশ করে দেবে সমস্ত দলগুলি। ব্রিগেড থেকে অক্সিজেন নিয়ে মানুষগুলিকে সদলবলে ভোট দিতে নিয়ে যাওয়াটা পাহাড় ভাঙা কাজ। সিপিএম তা পারলে রাজ্য রাজনীতির অনেক সমীকরণই বদলে যাবে।

Published by:Arka Deb
First published: