‘তুমি তো মেয়ে, তুমি পারবে?’ কান-এ পুরস্কার পেয়ে উত্তর দিলেন বাংলার মেয়ে মধুরা পালিত !

‘তুমি তো মেয়ে, তুমি পারবে?’ কান-এ পুরস্কার পেয়ে উত্তর দিলেন বাংলার মেয়ে মধুরা পালিত !
  • Share this:

#কলকাতা: কান চলচ্চিত্র উৎসব মানেই কী বলিউড নায়িকাদের পোশাকের বহর? রেড কার্পেটে ক্যামেরার ঝলকানি, তারপর সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে লাখে লাখে লাইক আর ফলোয়ার ! সংবাদ মাধ্যমে বড় বড় শিরোনাম ৷ সাধারণ মানুষের চোখে কান চলচ্চিত্র মানে এতদিন ছিল এসবই ৷ তবে বাংলার মেয়ের হাত ধরে যেন নতুন চেহারা পেল কান চলচ্চিত্র উৎসব ৷ বিশেষ করে ভারতীয়দের কাছে, আরও বিশেষ করে বাংলার মানুষের কাছে ৷

মধুরা পালিত ৷ ২০১৯ কান চলচ্চিত্র উত্সবে ‘পিয়ের অঁজেনিউ এক্সেলেন্স ইন সিনোমাটোগ্রাফি স্পেশ্যাল এনকারেজমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ জিতে নিলেন মেয়েটি। ভারত থেকে এই প্রথম কেউ জিতে নিলেন এই পুরস্কার ৷ মূলত, সিনেম্যাটোগ্রাফিতে অসাধারণ দক্ষতার জন্যই মধুরার হাতে উঠে এল এই পুরস্কার ৷ প্রথম কোনও ভারতীয় মেয়ের মুকুটে জুটল এই পালক ৷ তবে এই সম্মান পেয়ে, এত খুশির মাঝেও মধুরার একটিই খেদ ! তাঁর এই পুরস্কারকে এখনও কেন সবাই ‘জেন্ডার’-এ বেঁধে রেখেছে ! কেন তাঁর নামের পাশে বার বার আসছে ‘মহিলা সিনেম্যাটোগ্রাফার’ ? তবে এই প্রশ্নের মাঝেও, মধুরা ভুলতে পারছেন না কান চলচ্চিত্র উৎসবে কাটিয়ে আসা দিনগুলো ৷ মধুরার কাছে যা এক কথায় ‘আনরিয়েল, ড্রিম কাম ট্রু মোমেন্ট !’

6835a073-6a9f-44b4-8db0-3917c1f7b32a

কান-এ পৌঁছে কোন কোন মূহর্তকে মনের ক্যামেরার বন্দি করলেন?

মধুরা: বলে শেষ করা যাবে না ৷ একের পর এক মুহূর্ত ৷ আমি যেন রূপকথার রাজ্যে বাস করছিলাম ৷ যাঁদেরকে নিয়ে এতদিন পড়াশুনো করেছি ৷ যাঁদের ছবি দেখে সিনেমার প্রতি ভালোবাসা জেগেছিল, সেই সব মানুষকে একদম সামনে থেকে দেখেছি ৷ কথা বলেছি ৷ এর থেকে ভালো মুহূর্ত আর কী হতে পারে ৷ জন পিয়ের, ব্রুনো ডেলবোনেল, জেভিয়ের ডোলান, নাম বলে শেষ করা যাবে না ৷ টারান্টিনোর সঙ্গে দেখা হয়নি ৷ এটা বড় মিস !  তবে কান-এ গিয়ে যে মুহূর্তকে একেবারে ভুলতে পারব না, তা হল ছবির প্রিমিয়ারে, থিয়েটারে বসে ছবি দেখা ৷ আমি বং জন-হু-র ‘প্যারাসাইট’ ছবির প্রিমিয়ারে ছিলাম ৷ বলে বোঝাতে পারব না ৷ সে এক দারুণ এক্সপেরিয়েন্স ৷

2

মনের ক্যামেরাতে তো বন্দি হয়েছে সব, কিন্তু কবে থেকে ক্যামেরা যন্ত্রটির প্রতি প্রেম? কবে থেকে ঠিক করলেন সিনেম্যাটোগ্রাফারই হতে হবে?

মধুরা: বলতে গেলে ক্যামেরার প্রতি প্রেম বা সিনেম্যাটোগ্রাফার হওয়ার ইচ্ছেটা জাগে জেভিয়ার্সের ক্লাস থেকেই ৷ সেন্ট জেভিয়ার্সে আমাদের একটা ভিডিও প্রোডাকশনের রুম ছিল ৷ সেখানেই ভিডিও নিয়ে নানা কাজকর্ম হতো ৷ সেটা করতে গিয়েই আসলে প্রথম প্রেমে পড়ি ক্যামেরার ৷ মনে হল, এটাকে নিয়েই জীবনে এগোতে হবে ৷ ব্যস, সেদিন থেকেই স্বপ্ন দেখা শুরু ৷ তারপর সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট পরীক্ষা দেওয়া, পড়াশুনো ৷ তবে শুরুটা সেই সেন্ট জেভিয়ার্সের ক্লাসরুম থেকেই ! সত্যি কথা বলতে, এর আগে কখনও ক্যামেরা নিয়ে বা ভিডিও সক্রান্ত কোনও কিছুই করিনি আগে ৷ আমার বাবা আর্ট ফটোগ্রাফির সঙ্গে যুক্ত, বাড়িতে নানা ধরণের ক্যামেরা, লেন্স দেখেছি ৷ টুকটাক ছবি তুলেছি ৷ কিন্তু কখনও সেভাবে ভিডিও নিয়ে কোনও কাজ করিনি ৷ তবে বলতে পারি কিছুটা অনুপ্রেরণা আমি আমার মা-বাবার থেকে তো পেয়েইছি !

3

এত বড় সম্মান পেলেন, ভারতীয় হয়ে প্রথম, প্রথম কোনও মহিলা সিনেম্যাটোগ্রাফার এই সম্মান পেল...কেমন লাগছে ?

মধুরা: আমার অবশ্যই ভালো লাগছে ৷ কিন্তু তার থেকেও আমি বলব, আমার এই সম্মান পাওয়াটা যদি ফিউচার জেনারেশনের কাছে অনুপ্রেরণা হতে পারে, তাহলে সেখানেই আমার সাফল্য ৷

তবে জানেন কি? আমার এই সম্মানকে শুধুমাত্র ‘মহিলা’ ক্যাটাগোরিতে ফেলাটা একেবারেই উচিত নয়, কারণ আমার কাছে সিনেম্যাটোগ্রাফি ব্যাপারটাকে কোনও স্পেসিফিক জেন্ডারে আটকে রাখা উচিত নয় ৷ এমনকী, কান-এ পুরস্কার পাওয়ার পর স্পিচেও আমি এটাই বলেছি, যে আমি সেই সময়টার জন্য অপেক্ষা করছি, যখন সিনেম্যাটোগ্রাফারকে কেরিয়ার হিসেবেই দেখা হবে ৷ আলাদা করে ডিওপি মেল ও ডিওপি ফিমেল ধরা হবে না ৷ ডিওপি শুধু মাত্র ট্যালেন্ট হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত ৷ ভালো ডিওপি, খারাপ ডিওপি ! যখনই ডিওপির আগে এই ‘মহিলা’ শব্দটি দেওয়া হচ্ছে তখনই জেন্ডারে আটকে ফেলা হচ্ছে ! আমার মনে হয় এটা একেবারেই উচিত নয় ৷ কোনও কাজকে কি জেন্ডারে আটকে রাখা যায় !

da4976a4-309f-4c70-886b-982f97d1692a

কাজ করার সময় কি কখনও এই পার্থক্যটা অনুভব করেছেন ?

মধুরা: সেটা তো অল্প-বিস্তর সম্মুখীন হয়েছি ৷ কারণ, এই সিনেম্যাটোগ্রাফির কাজের জগতটা ভীষণভাবে পুরুষতান্ত্রিক ৷ যেমন, এসআরএফটিআই-র তিন ব্যাচে আমিই একমাত্র মেয়ে ছিলাম আমাদের ডিপার্টমেন্টে ৷ তখন থেকেই অনুভব করেছিলাম, মহিলা হওয়ার জন্য একটা পার্থক্য তো করা হবেই ৷ আর মনস্থির করেছিলাম এটাকেই কাটিয়ে উঠতে হবে, বলা ভালো ব্রেক করতে হবে ৷ তবে হ্যাঁ, এই ব্রেক করার মধ্যে বেশ কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে ৷ মেয়েদের তো কিছু শারীরিক ব্যাপার রয়েছে, মানে পিরিয়ডস, তার ওপর কেউ যদি বিয়ে করে নেয়, তাহলে তো হয়ে গেল, তাহলে তাঁকে আরও হাজার প্রশ্নও শুনতে হয় ৷ ছেলে ডিওপি-র দের এই সব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় না ৷ তবে শুধু এই ফিল্ডেই নয়, সব ফিল্ডেই মেয়েদের অল্প-বিস্তর এসব কথা শুনতে হয় ৷ আসলে এটা চলে আসছে বহু যুগ ধরে ৷ এটা ব্রেক হতে সময় লাগবে ৷

আমিও এরকম প্রশ্নের মুখে পড়েছি ৷ অনেক মিটিংয়েই আমার সঙ্গে কোনও ছেলে ডিওপি-র নাম আসলে, তাঁকেই বেছে নেওয়া হয়েছে ৷ আমাকে বলা হয়েছে, তুমি ভালো, সঙ্গে কাজ করতেই পার ৷ তখনই একটা বিভেদ রেখা কেটে দেওয়া হয়েছিল ৷ অনেক প্রোডাকশনে হাউজে কথা বলতে গিয়ে তো বিশ্বাসই করাতে পারিনি, আমি সিনেম্যাটোগ্রাফার ! তবে এই ব্যাপারটাকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি ৷

বিজ্ঞাপন, তথ্যচিত্র, এখনও অবধি তিনটে ফিচার ফিল্ম, পুরোদস্তুর বলিউডে কবে দেখা যাবে?

মধুরা: বলিউডে কেন? আমি আগে আমার শহরে কাজ করতে চাই ৷ বাংলা ছবি করতে চাই ৷ বাংলায় এখন অনেক ভালো কাজ হচ্ছে, আর আমি বাংলারই তো মেয়ে ৷ নিজের ভাষা, নিজের ইন্ডাস্ট্রিকেই তো আগে প্রাধান্য দেব ! আমি বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার জন্য মুখিয়ে আছি ৷ তবে হ্যাঁ, বলিউডে সুযোগ পেলে অনুরাগ কাশ্যপ, বিশাল ভরদ্বাজ, বিক্রম আদিত্য মোতওয়ানির সঙ্গে কাজ করতে চাইব সবার আগে ৷ আমি এই তিনজনের খুব বড় ভক্ত ৷ তবে করণ জোহর বা রোহিত শেট্টির সঙ্গেও কাজ করতে চাই ৷ আসলে, আমি কাজ করতে চাই ৷ সব ধরণের কাজ করতে চাই ৷ ভালো ভালো কাজ করতে চাই ৷ কিন্তু সবার আগে বাংলা ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করার ইচ্ছে রয়েছে ৷

First published: 05:08:27 PM May 27, 2019
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर