আবার রুখে দাঁড়াব, ক্ষতটা শুকোয়নি তাও চোয়াল শক্ত নীলাঞ্জনার

আবার রুখে দাঁড়াব, ক্ষতটা শুকোয়নি তাও চোয়াল শক্ত নীলাঞ্জনার

হাসতে হাসতে লড়ে যাচ্ছেন নীলাঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়।

প্রতিবাদী, অকুতোভয়, অপরাজিতা, বিশেষণে তাঁকে ব্যখ্যা করা মুশকিল। তিনি নীলাঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়, আনন্দপুরে নির্যাতিতার উদ্ধারকারী। পায়ের এক আঙুল গর্তটা আজও রয়েছে। কবে স্বাচ্ছন্দ্যে  হাঁটতে পারবেন জানেন না। কিন্তু মুখের অনাবিল হাসিটা শুকিয়ে যায়নি। অক্লেশে বলতে পারেন, প্রয়োজনে আবার রুখে দাঁড়াব। তাঁর সঙ্গে খোলামেলা আড্ডায় অর্ক দেব।

  • Share this:

নীলাঞ্জনাদি, আপনি এখন কেমন আছেন?

আমার স্টিচগুলি কাটা হয়ে গিয়েছে। ক্ষতটা শুকোচ্ছে। আমার মাথায় ছ'টা স্টিচ ছিল। হাঁটুতে, পায়ের পাতায় ৯ ইঞ্চি করে নেইল বসেছে। যেখান থেকে নেইলগুলি ঢোকানা হয়েছে সেখানে স্ক্রু দিতে হয়। হাঁটুর দুপাশেই এই স্ক্রু রয়েছে। তার জন্যেও সেলাই করতে হয়েছে। এই স্টিচগুলি খোলা হয়েছে। কিন্তু জায়গাগুলিকে আরও হিল করা জরুরি। ফলে পা স্ট্রেচ করে রাখতে হয়।

এছাড়া আমার পায়ের হাড়টা ভেঙে মাংস বেরিয়ে এসেছিল। প্রায় এক আঙুল মতো গর্ত রয়েছে। ওই ক্ষতটা ওপেন উন্ড। ওখানে প্লাস্টিক সার্জারিও কার্যকর হয়নি। স্কিন ড্রাফটিং করলে গ্যাংরিনের ভয় রয়েছে। তাই সেই পথে হাঁটিনি। তবে সুখের কথা সোয়াব কালচার করে দেখা গিয়েছে ওখানে ইনফেকশন নেই।

হাঁটাচলার বিষয়ে চিকিৎসক কী জানাচ্ছেন?

সাত তারিখে  ( ৭ সেপ্টেম্বর) আমার অপারেশন হয়েছিল। ৯ তারিখ থেকে আমাকে হাঁটানোর চেষ্টা শুরু হয়। এখন ওয়াকার নিয়ে ঘরের ভিতর একটু আধটু হাঁটছি। ঘর থেকে ড্রয়িং রুম, ড্রয়িং রুম থেকে ঘর।  হাঁটু ভাঁজও করতে পেরেছি দেখে চিকিৎসকও খুশি। এখানে আমার চিকিৎসকের কথাও একটু বলা উচিত, না বললে অন্যায় হবে। আমার চিকিৎসক কুনাল সেনগুপ্ত ভীষণ প্রথিতযশা ডাক্তার। আমার পরিবারের অনেকের অপারেশন করেছেন। ওঁর ভোকাল টনিকই আমায় চাঙ্গা করে  দেয়।

নীলাঞ্জনাদি, ঘটনার পর বেশ কিছুদিন কেটে গিয়েছে, ট্রমাটাও হয়তো একটু একটু করে কাটছে আপনার। এখন যদি জিজ্ঞেস করি, সেদিন ঠিক কী হয়েছিল?

পাঁচ তারিখ, পাঁচ সেপ্টেম্বর মায়ের জন্মদিন ছিল। সাড়ে এগারোটা নাগাদ মায়ের কমপ্লেক্সটা থেকে বেরিয়ে একটা টার্ন নিয়েছে আমাদের গাড়িটা। পেছনেই আমার বোনের গাড়িও ছিল। হঠাৎই চিৎকারটা কানে আসে। শুনতে পাই একটি মেয়ে বলছে, ‘বাঁচাও, হেল্প।‘ আমি আমার হাজব্যান্ডকে গাড়ি দাঁড় করাতে বলি। আমার বোনও পিছনে গাড়ি থামায়। আমি গাড়ি থেকে নেমে ওই গাড়িটাকে দা়ঁড় করাতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটা যেন হুড়মুড় করে বেরোয়। মেয়েটা দাঁড়াতেই দেখলাম জামাকাপড় ছিঁড়ে গিয়েছে,মাথা থেকে পা রক্তাক্ত। সারা হাতে ক্ষত। কী হয়েছে বলায় আমায় মেয়েটা বলেছিল,  ‘দিদি আমায় অ্যাসল্ট করছে। নামতে দিচ্ছে না। সমস্ত জিনিস গাড়িতে রেখে দিয়েছে।  চার পাঁচ দিনের আলাপ, ডেটে গিয়েছিলাম, ছেলেটিকে ভালো চিনি না। মারধর করছে,অসভ্যতা করছে।’

এই সময়েই দেখলাম ওই লোকটি পালানোর চেষ্টা করছে। আমি ভেবেছিলাম গাড়িটিকে আটকাব। আমার হাজব্যান্ড গাড়ির ডান দিকে আর আমি গাড়ির বাঁ দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। হাত তুলে বলছিলাম, 'দাঁড়ান'। আমি চাইছিলাম, মেয়েটির জিনিসগুলি গাড়ি থেকে বের করব। মেয়েটিকে নিয়ে পুলিশে যাব। এই সময় গাড়িটা একটা ঝাঁকুনি দিল, আমি পড়ে গেলাম। কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে তারপর গাড়িটা আমার পায়ের উপর দিয়ে নিয়ে চলে গেল। অসহ্য যন্ত্রণা হয়েছিল আমার।

এর পরের ঘটনাপরম্পরা তো আমরা জানি। এক কথায় বললে ওই মহিলা নেগোশিয়েট করছিলেন, হয়তো বাধ্য হয়েই...কেন এমন হয়, কী মনে হয় আপনার?

আমি নিজেই ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার ছিলাম। তিন বছরের সন্তান নিয়ে বিয়ে ভেঙে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমার প্রাক্তন স্বামী তাঁর অপূর্ণ সম্পর্কের ঝাল আমার ওপর মেটাতেন। এখন আমি বেরিয়ে আসতে পেরেছিলাম আমার বাবা মায়ের শিক্ষায়, সমর্থনে।ওটাই আমার শক্তি।  আমি যখন ছোট বাচ্চা, কী ভাবে বের হবো এই নিয়ে দোটানায় রয়েছি, আমার মা বলেছিলেন, তুমি এখনও যদি বেরোতে না পারো, তবে আমাকে আর মা বলেই ডেকো না। আমার সব দ্বিধা চলে যায়। তার পর অনেক লড়তে হয়েছে, তবে সিদ্ধান্তটা নিতে পেরেছি, ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

আমি এই জায়গা থেকে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি কোনও অত্যাচারিতের প্রতিই জাজমেন্টাল হতে পারি না। আর সমাজ যখন প্রশ্ন করে এটা করা উচিত ছিল, এটা কেন করল না, আমি এই জাজমেন্টাল হওয়ার জায়গাটাকেই খারিজ করেছি। নিজেকে দিয়েই বুঝেছি, এই ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স বা অন্য কোনও ট্রমাটিক এক্সপেরিয়েন্সের ক্ষেত্রেও জাজমেন্টাল হওয়ার জায়গা থাকে না।  আমার ব্যাপারটায় অভিযুক্ত পায়ের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, সেটা ক্রিমিনাল অফেন্স। তার বিষয়টা তো অপরাধ, বিচারাধীন। আইন আদালত বুঝে নেবে।

মেয়েটি যদি সেদিন বলতো ওই লোকটি তাঁর চেনা, তাহলে কী ভাবে রিঅ্যাক্ট করতেন আপনি?

আমি কিন্তু সাহায্য করতামই, তবে ধরনটা হয়তো আলাদা হতো। গাড়িটিকে আটকাতে যেতাম না সেক্ষেত্রে।

নীলাঞ্জনাদি, অনেকেই কিন্তু মেয়েটিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। আপনি কী বলবেন?

মেয়েটির প্রতি আমার কোনো অভিযোগই নেই। মেয়েটির যে আচরণগত পরিবর্তন তাকে আমি ধর্তব্যের মধ্যেই আনিনি। কারণ একজন মেয়ের সমাজে এখনও যা অবস্থান, তাতে আমরা মেয়েটিকে জাজ করার অবস্থাতেই নেই। বরং ওঁর ট্রমার কাউন্সেলিং করা উচিত। আমি জানি না,  কাউন্সেলিং করছে কিনা।  করলে মনের জোরটা ফেরত পাবে ও। আমার প্রার্থনা, ও যাতে সুস্থ ভাবে বাঁচতে পারে। ও ডিস্টার্বড বলেই তো আচরণে ঘনঘন পরিবর্তন হয়েছে।

আনন্দপুর কাণ্ডে আপনি রাস্তায় ছিলেন। এমন বহু ঘটনাই ঘটে অগোচরে, সর্বত্র আপনার মতো মানুষ থাকেনও না। আত্মরক্ষার বিষয়ে মেয়েরা কী ভাবে আরও সচেতন হবে?

দেখুন আত্মরক্ষার জন্য কিছু ব্যবস্থা নিতেই হবে। সেটা সঙ্গে পেপার স্প্রে রাখা হতে পারে। বা কোথায় আঘাত করলে আমায় যে আঘাত করছে সে এগোতে পারবে না তা জানা। এছাড়া এই ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে সাহায্য চাওয়া যায় এমন নম্বর সব সময় নিজের কাছে রেখে দেওয়া।

কিন্তু এর পর অন্য একটা কথাও বলতে হয়। সচেতন হতে হবে বাবা-মাকে। আমরা ছেলে বা মেয়েকে সমান ভাবে মানুষ করি না। তফাতটা ছোটবেলা থেকে গড়ে দিই। গোড়ায় গলদ থেকে যায়। সেই গলদটা না থাকলে এই ধরণের ঢাল তরোয়াল লাগবে না। বাবা মায়ের কাছে আমার অনুরোধ,  সন্তানদের বোঝান যে, তুমি ছেলে বা মেয়ে নও, তুমি মানুষ। সহ-মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখো। ছেলে বা মেয়ে এই আইডেন্টিটি আইডেন্টিটি কার্ডে লাগে, বাকি সময়ে সে মানুষ। মেয়ে মানেই অ্যাডজাস্ট করবে, ছেলে মানেই সুবিধে নেবে, এই চিরাচরিত ধারণাগুলি বদলানোর সময় এসেছে। সেটা যদি একবিংশ শতকে করা না যায়, তাহলে আধুনিক হলাম কোথায়!

সপিরবারে...। সপরিবারে...।

অনেকেই কিন্তু এই ধরনের পরিস্থিতিতে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে না। দেখেও পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যায়, পুলিশি হ্যারাসমেন্টের ভয়ের কথা শোনা যায়।

দেখুন, পুলিশ সম্পর্কে অনেক মিথ রয়েছে। এটা  সবটা ঠিক নয়। আমার কথাই যদি বলি, আমি এই ধরনের কাজ আগেও করেছি। এগুলি আমার এবং আমার বরের দৈনন্দিনেরই অংশ। এই ঘটনার দিন তিনেক আগেই আমাদের আবাসনের সামনে এক ভদ্রমহিলা পড়ে ছিলেন।  আমি দেখি তাঁর গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। প্রায় অচৈতন্য অবস্থায় ছিলেন ওই মহিলা, বুঝতে পারি কেউ ফেলে দিয়ে গিয়েছে। প্রথমে ১০০ ডায়াল করি। লালবাজার থেকে গড়ফা থানায় খবর দেয়। পুলিশ আসার আগে সিভিক ভলেন্টিয়ার চলে আসেন। গড়ফা থানার এক অফিসার সন্দীপ ওঁরাও নিজে গাড়ি চালিয়ে চলে আসেন। নিজের গাড়িতে ভদ্রমহিলাকে  তুলে নিয়ে যান উনি। চিকিৎসার ব্যবস্থা হয় ওই মহিলার। কই আমাকে তো কেউ হ্যারাস করেনি? এটা আসলে একটা পার্সপেক্টিভ। দৃষ্টিভঙ্গিটাই বদলাতে হবে। আমার কাছে জায়গাটা হচ্ছে যে, সহনাগরিককে সাহায্য করছি, তার জন্য একটু সময় দিতে হলে, সেটা আমি করতেই পারি।আমি সেদিন ওই মহিলাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে পারিনি। অনেক সময় তো নষ্ট করি, একটু সময় না হয় ভালো কাজে লাগালাম।

একটা ছবি চোখে ভাসছে, হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হচ্ছে, সবাই গাইছে হও ধর্মেতে ধীর, হও কর্মেতে বীর, হও উন্নত শির নাহি ভয়,আপনিও গাইছেন। অতুলপ্রসাদ-রবীন্দ্রনাথই কি আপনার শক্তির উৎস?

একটু আগে থেকে বলতে হয়। আমার পড়াশোনা বেথুন স্কুল, বেথুন কলেজে। সেখানে এই অতুলপ্রসাদী গানটা প্রার্থনায় গাইতে হতো। তখন গানটার মানে বুঝতাম না। সেদিন যখন গানটা গাইছিলাম, গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল, গানটার মানেটা সেদিন বুঝলাম। রবীন্দ্রনাথই বলুন বা অতুলপ্রসাদই বলুন, ওঁরা আমাদের নিঃশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। এমন কোনও ঘটনা নেই, যেখানে ওঁদের বাদ দিয়ে ভাবতে পারি।  আমি হাসপাতাল থেকে ফিরেই, এই বিষয়ে রবি ঠাকুরে গান আছে কিনা ভাবতে বসেছিলাম। হঠাৎ মনে পড়ল- "বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা/বিপদে আমি না যেন করি ভয়/দুঃখতাপে ব্যথিত চিতে নাই-বা দিলে সান্ত্বনা/দুঃখে যেন করিতে পারি জয়॥" রবীন্দ্রনাথের গান শিখেছি, তাই একটা অন্য চেতনা কাজ করে।

নীলাঞ্জনাদি, আপনার আরোগ্য কামনা করি। আশা রাখি, দ্রুত পথে দেখা হবে।

অবশ্যই, আপনারাও ভালো থাকবেন, পুজো ভালো কাটুক সকলের।

Published by:Arka Deb
First published:

লেটেস্ট খবর