নন্দীগ্রামে ‌বামেদের আলোয় ফেরাতে পারবেন? খোলামেলা কথাবার্তায় প্রার্থী মীনাক্ষী

নন্দীগ্রামে ‌বামেদের আলোয় ফেরাতে পারবেন? খোলামেলা কথাবার্তায় প্রার্থী মীনাক্ষী

নন্দীগ্রামে লড়াই মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়, শুভেন্দু অধিকারীদের সঙ্গে। কোন অস্ত্রে বিঁধবেন মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়?

মাসিক আয় পাঁচ হাজার। কী ভাবে চলে সংসার? নন্দীগ্রামের 'ক্ষত'টা সারাতে পারবেন? প্রার্থী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে খোলামেলা কথাবার্তায় অর্ক দেব।

  • Share this:

নন্দীগ্রামে দল আপনাকে প্রার্থীপদ দিয়েছে। অনেকেই বলছেন আপনি ধাপে ধাপে যোগ্যতাবলেই উঠে এসেছেন। এই মনোনয়ন আসলে পুরস্কার। আরেকদল বলছে বাঘের মুখে ঠেলে দিল দল। আপনি কী বলবেন?

দেখুন বিষয়টা খুব সহজ। গোটা পশ্চিমবঙ্গে লুটে খাওয়াদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে খেটে খাওয়ারা। ২০২১ সালের নির্বাচনটা এই সিস্টেমটাকে বদলানোর। সংসদীয় পদ্ধতিতে এই লড়াইয়ে আমরা অংশ নিয়েছি। আমি খেটে খাওয়াদের একজন প্রার্থী। কেউ অন্যত্র লড়ছে, আমি লড়ছি নন্দীগ্রামে। আমি এর বাইরে অন্য কোনও ভাবে এই মনোনয়নকে দেখছি না।

হলফনামা বলছে মাসিক রোজগার পাঁচ হাজার টাকা। আপনি কি একাই রোজগেরে? কী ভাবে চলে?

আমার বাবা অবসর নিয়েছেন। রোজগেরে বলতে আমিই, চালিয়ে নিই।

কেন চালিয়ে নেন? আপনার ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্খা নেই কোনও?

বামপন্থীরা টাকার কথা ভেবে লড়ে না। আমার কোনও উচ্চাকাঙ্খাই ব্যক্তিগত নয়, আৰ্থিক লাভের কথা ভাবিও না। ভাবি বেকার কাজ পাক, ফসলের দাম পাক কৃষক, গরিব মানুষ খেয়েপরে বাঁচুক। এগুলিই আমার আম্বিশান আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতো। সম্পত্তি তৈরি করতে চাই না। বরং বলতে পারেন যারা টাকা পয়সা দিয়ে মানুষ কিনতে চাইছে, ভোট কিনতে চাইছে, প্রতিদিন তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলাটাই আমার অ্যাম্বিশান।

প্রচারের মাঝেই পাত পেড়ে খাওয়া। ছবি ফেসবুক। প্রচারের মাঝেই পাত পেড়ে খাওয়া। ছবি ফেসবুক।

২০১৬ সালে নন্দীগ্রামে বামেরা ২৬.৭০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। আপনি হাড় ভাঙা পরিশ্রম আশা করছেন ভোট বাড়বে এই আশা নিয়েই। বাড়লে কত শতাংশে গিয়ে দা়ঁড়াবে, আপনার কী অনুমান?

যারা এখানে জিতেছিল, তারা মানুষের সঙ্গে বেইমানি করেছে। নন্দীগ্রামের মাটির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাই করেছে আমি বলব। গোটা দেশে নন্দীগ্রামের পরিচয় সন্ত্রাসকবলিত এলাকা, যেখানে ভোট হয় না। নন্দীগ্রামের মানুষ কি তাই চাইছেন? নন্দীগ্রামের ৯০ শতাংশ মানুষ খেটে খাওয়া, শান্ত, ভদ্র। তাঁরা নিজেদের অধিকারের দাবিতে মোর্চার উপর ভরসা করতে চাইছেন। এটাই আমার পর্যবেক্ষণ।

টুম্পাসোনা থেকে হালের পোস্টার। বামেদের প্রচার কৌশলে তারুণ্যের জয়জয়কার। বামেরা কি তবে বার্ধক্যের সীমাবদ্ধতা বুঝেই তারুণ্যে জোর দিচ্ছে?

আমাদের দল তারুণ্যে আস্থা রেখেছে ঠিকই। এখানে তরুণের উৎসাহ আর দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের অভিজ্ঞতার একটা মিশেল তৈরি করার চেষ্টা চলছে। আমি, ঐশী, দীপ্তিসা যেমন রয়েছি, তেমন মহম্মদ সেলিম, কান্তি গাঙ্গুলীরাও রয়েছেন।

বুঝলাম, কিন্তু থিতিয়ে যাওয়া একটা সময়ে করোনাই কি বাম ছাত্রযুবকে আবার রাস্তায় নামাল? রাজনীতির মূল স্রোতে নিয়ে এল আবার ?

বামেরা পথেই ছিল। বিশ্বায়নে যুবকযুবতীরা আত্মকেন্দ্রিক এমনটা বলাই হয়। তবে হ্যাঁ লকডাউনের সময় বাম ছাত্র-যুবরাই পথে ছিল। মানুষের মুখে ভাত তুলে দিয়েছে। আমরা আত্মকেন্দ্রিক নই, রাজনীতিবিমুখও নই। শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা রাজনীতি করতে চাইছে। আর আমরা চাইছি সেই রাজনীতির চালিকাশক্তি হতে।

নন্দীগ্রাম চষছেন, জিততে চাইছেন, কিন্তু আপনি মানুন বা না মানুন, লড়াই কঠিন বললেও কম বলা হয়। প্রচার কৌশলের উপরে অনেকটা নির্ভর করছে সাফল্য ব্যর্থতা। কী স্ট্র্যাটেজি আপনার?

আমার চিন্তাভাবনা খুব সহজ। যারা চেয়ারে বসে আছেন তারা মানুষকে দশ বছর কথা বলতে দেয়নি। আমি সাত আট দিন এখানকার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। মানুষকে আমাকে ভোট দিতে বলিনি। বলেছি যেখানে পছন্দ সেখানে ভোট দেবেন। যে কথা বলতে ইচ্ছে করে সেটাই বলবেন। যে রাজনীতি করতে মন চায়, সেটাই করবেন। আর এই পরিস্থিতিটা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যেই আমরা ফিরতে চাইছি। এটাই বলছি ঘরে ঘরে গিয়ে। মানুষও বলছে, ওরা কথা বলতে দেয় না। সেই জায়গায় আমরা কথা বলার জন্য মানুষকে উৎসাহিত করছি।

প্রচার চলছে জোরকদমে। ছবি ফেসবুক। প্রচার চলছে জোরকদমে। ছবি ফেসবুক।

নন্দীগ্রাম অধ্যায়ে সিপিএম-এর ভূমিকা নিয়ে কথা শেষ হওয়ার নয়। বাদী বিবাদী দুই পক্ষেরই নিজস্ব যুক্তি আছে, থাকবে। কিন্তু অস্বীকার করা যায় না ১৪ মার্চ সিপিএম-কে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে, ইমেজকে কালিমালিপ্ত করেছে। বাম সমর্থকরা কি মীনাক্ষীর উঠে আসাটাকে আলোয় ফেরার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন?

আমাদের দল নন্দীগ্রাম সিঙ্গুরে কারখানা গড়তে চেয়েছিল। মানুষ বলল, কারখানা চাই না। খোঁজ নিয়ে দেখুন যে মানুষ সেদিন কারখান চাননি তাঁরা কি আজ কারখানা চাইছেন না? তাহলে সেদিন কি সত্যিই কারখানা চাননি তাঁরা? সেদিন চিটফান্ডের টাকায় মেকি বামপন্থী, মেকি কৃষকদরদিরা পশ্চাদমুখী কথা বলতো। এর পাশাপাশি আমাদের এমন একজন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন যিনি জনসমক্ষে বলতে পারেন,আমাদের ভুল হয়েছে। ভুল স্বীকারের জন্য আমরা কালিমালিপ্ত হইনি। দু'কদম এগিয়ে দশকদম পিছিয়ে গিয়েছি। কর্মীরা আক্রান্ত হয়েছেন, কেউ খুন হয়েছেন, কেউ রেগে গিয়েছেন। কিন্তু আমরা মানুষের আদেশ মাথা পেতেই নিয়েছি। আজ যারা চাকরি দেয় না, মইদুল, সুদীপ্তদের খুন করেছে, তারা ক্ষমা চাইতে পারবে? লড়াইটা এখানেই।

যদি এমন কোনও সম্ভাবনা তৈরি হয় যাতে আপনারা নির্ণয়ক ফ্যাক্টর হয়ে উঠলেন, অর্থাৎ সরকার গড়তে কোনও পক্ষেরই আপনাদের ছাড়া চলছে না, আপনারা কোন পক্ষের হাত ধরবেন?

আমরা তৃণমূলের রাজনীতির বিরোধিতা করছি আর বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গে আসতেই দেবো না। খুব স্পষ্টভাবে বলছি তৃণমূলের রাজনীতিকে ঘৃণা করি। কলেজে ইলেকশানের জন্য খুন হতে হয় এ রাজ্যে। মাওবাদীদের সঙ্গে জোট করে শয়ে শয়ে কমরেডদের প্রাণ নিয়েছে ওরা। আমরা এই কাঁধে বাপ কাকাদের লাশ তুলেছি। হাতে রক্ত মেখেছি। পোড়া ঘরে জল ঢেলেছি। ঘরছাড়াদের অন্যত্র স্থান দিয়েছি। মা মরে গিয়েছে ছেলে সৎকার করতে পারেননি, এই রাজনীতিকে ঘৃণা করিনি। দূরত্বটা আমাদের এইরকমই।

তৃণমূলের ম্যানিফেস্টোতে এবার সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। তৃণমূল সম্ভবত ম্যানিফেস্টোতে বলবে, ক্ষমতায় এলে সাহা, তিলি, মাহিষ্যদের পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ভুক্ত করবে। সিপিএম সম্পর্কে তো আমরা এই অভিযোগ শুনিই, সিপিএম শ্রেণির রাজনীতিটা যত মন দিয়ে করেছে, বর্ণেরটা সেভাবে করেনি। ফলে ব্রাক্ষ্মণ্যবাদ মাথাচারা দিয়েছে। আপনি কী মনে করেন, সিপিএম-এর কি সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে ভাবা উচিত?

ওরা তো বাউরি ,মাহাতো, কুর্মি বা সংখ্যালঘু কমিটি করেছে সময়ে সময়ে। তাদের বাড়ির ছেলেদের চাকরি হয়েছে? তাদের বাড়ির ছেলে‌দের পরিযায়ী শ্রমিক হতে হয়নি? বিশেষ অধিকার দিয়ে কাউকে পিছিয়ে পড়া বললে তাদের এগিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও বর্তায়। আর এগিয়ে দেওয়া মানে সংরক্ষণ নয়। চাকরি চাই। তাই নিয়ে কী ভাবছে?

১৯৮৪ সাল নবাগতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে যাদবপুরে হারিয়ে আলোড়ন তুলে দিয়েছিলেন। কেউ ভাবতেই পারেনি এমনটাও ঘটতে পারে। এখন নন্দীগ্রামের মতো জায়গায় যেখানে দুই হেভিওয়েট নানা অঙ্ক কষে এগোচ্ছে, দুজনেরই বিপুল জনপ্রিয়তা রয়েছে, সেখানে যদি আপনি দ্বিতীয়ও হন, তাহলেই বামেদের নৈতিক জয় হবে। পাশাপাশি আপনার একটা ঐতিহাসিক উত্থানও হবে। লোকে বলবে আপনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা শুভেন্দু অধিকারীর মতো প্রার্থীকে হারিয়েছিলেন জীবনের প্রথম লড়াইয়ে। বিষয়টি নিয়ে ভেবেছেন?

আমার দল মানুষের আর্থসামাজিক উত্থানের কথা ভাবে। সেই জায়গা দাঁড়িয়ে আমরা দুই তিন ভাবছি না। ভাবছি নির্বাচন কমিশন যদি ভোটলুঠ রুখে দিতে পারে, আমরা এক নম্বরেই থাকব। নন্দীগ্রামের মানুষই সেটা বলছে। তেমনটা হলেই বন্ধ কারখানা খুলবে, মানুষ চাকরি পাবে, আমি আমার রাজনৈতিক কেরিয়ারের উত্থানকে এভাবেই মানুষকে সঙ্গে জড়িয়ে ভাবি।

ব্যক্তিগত প্রশ্নে ফিরি। আপনি তো একটি কোচিং সেন্টার চালাতেন। সেটির কী হল?

আমি হোলটাইমার হওয়ার পর থেকে কাজের চাপ বেড়েছে। আমাকে জেলায় জেলায় যেতে হয়। আমার শিক্ষক, আমার ছাত্রীরা ওখানে পড়ান। একটা কোচিং সেন্টারে ৩৯ জনকে ফ্রিতে পড়ানো হয়, আঁকা, গান, নাচ শেখানো হয়।

প্রথম থেকেই ভেবেছিলেন ২৪ ঘণ্টার রাজনীতিতে আসবেন? অন্য কোনও পেশার কথা ভাবেননি?

শিক্ষক হতে চেয়েছিলাম। এমএ বিএড করেছি। কিন্তু আপার প্রাইমারি, প্রাইমারিতে যা দুর্নীতি চাকরি পাওয়া কঠিন। একটা কলেজে দশ বছর পার্ট টাইম পড়িয়েছি। হোলটাইমার হয়ে সেটা ছেড়ে দিয়েছি। এখন খেটে খাওয়া মানুষের জন্য ২৪ ঘণ্টা মাথা ঘামানোই পেশা।

Published by:Arka Deb
First published: