নতুন নাম ধনখড়, চার দশকের রাজ্য-রাজ্যপাল সংঘাতে জ্যোতি বসু আর মমতা একই বিন্দুতে

রাজ্য বনাম রাজ্যপাল-ট্র্যাডিশান আজও চলিতেছে। ছবিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জগদীপ ধনখড়।

রাজ্যের শাসকদলের সঙ্গে রাজ্যপালের সংঘাতের ইতিবৃত্ত অত্যন্ত চার দশকের। আজকের যুদ্ধটা কোথায় আলাদা? বিশ্লেষণে অর্ক দেব।

  • Share this:

#কলকাতা: অতীতে রাজ্যপালের কার্যকলাপ নিয়ে ক্ষোভ চেপে রাখেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু রাজ্যপালের সম্মতিক্রমে রাজ্যের নবনির্বাচিত মন্ত্রী-বিধায়করা যখন জেল হেফাজতে, এবার আর রাখঢাক রাখতে চাইছেন না শাসক দলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চাইছেন শেষ দেখে ছাড়তে। সূত্রের খবর, আজই হয়তো রাজ্যপালকে অপসারণের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দকে  চিঠি দিতে পারেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এমনকী বিধানসভায় রাজ্যপালের অপসারণের দাবিতে পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, এমন কথাও নাকি ভাবছে শাসক দল।

জগদীপ ধনখড় বনাম রাজ্যের সংঘাত আনকোড়া নয়। ভোটের আগে থেকেই তৃণমূল অভিযোগ করে আসছে তিনি রাজ্যের ব্যাপারে নাক গলান। যাবতীয় সাংবিধানিক নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি প্রকাশ্যে রাজ্যের বিরোধিতা করেন। রাজ্যপালের 'অতিসক্রিয়তাকে' সামনে রেখেই গত ৩১ ডিসেম্বর ১৫৬ ধারার ১ নং উপধারাকে সামনে রেখে রাষ্ট্রপতির কাছে তাঁর অপসারণ চেয়ে আবেদনও করা হয়েছিল l রজ্যপালের ক্ষমতা কতটা সীমিত তা বোঝাতে, ১৯৭৩ সালের ২৩ অগস্ট শামসের সিংহ বনাম পঞ্জাব সরকারের মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ও পড়ে শোনান তৃণমূল সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়। কিন্তু এবার প্রেক্ষিত ভিন্ন। আগে আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল, এবার আঁচড় লেগেছে সরাসরি। ফলে সরকার হোক বা শাসকদল, তেড়েফুঁড়েই নামছে। অনেকেই বলছে রাজ্য বনাম রাজ্যপাল সংঘাত, এভাবে রাজ্যপালকে বয়কট করার ডাক বেনজির। কিন্তু এমনটা মেনে নিলে সত্যের অপলাপই হবে। বাংলা যেমন সৈয়দ নুরুল হাসান থেকে গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর মতো রাজ্যপাল পেয়েছে, তেমনই এসেছেন বহু রাজ্যপাল যাদের সঙ্গে রাজ্যের তথা শাসকদলের সম্পর্ক তিক্ত থেকে তিক্ততর হয়েছে।

১৯৬৭ সালে রাজ্যপাল ধর্মবীরের সঙ্গে তুমুল সংঘাত বেঁধেছিল মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়ের। ধর্মবীর অজয় মুখোপাধ্যায়কে  তিনদিনের মধ্যে যুক্তফ্রন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে বলে চিঠি দেন। অজয় মুখোপাধ্য়ায় জবাব দেন, যা হওয়ার তা পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী বিধানসভাতেই হবে। চিঠি পেয়ে ধর্মবীর মন্ত্রীসভা বরখাস্তের সুপারিশ পাঠালেন কেন্দ্রে। বিবাদ উঠল চরমে। সিপিএম-এর প্রয়াত প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদক প্রমোদ দাশগুপ্ত বাংলার আরেক প্রাক্তন রাজ্যপাল বি ডি পাণ্ডের নামই দিয়েছিলেন বাংলা দমন পাণ্ডে।

তবে সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধ হয়েছিল প্রাক্তন রাজ্যপাল এপি শর্মার মেয়াদে। ১৯৮৪ সালে এ পি শর্মা বাম-সরকার মনোনীত প্রার্থী রমেন পোদ্দারকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চাল্সেলর পদে অনুমোদন না দিয়ে সন্তোষ ভট্টাচার্যের নাম বাছাই করে। অনিলানয়ন তখনও শুরু হয়নি তবে শিক্ষাঙ্গনে শাসক ঘনিষ্ঠদের বসানোর কাজ তখন শুরু করছে বামেরা, কাজেই মার্কসীয়দের পছন্দ ছিলেন দলঘনিষ্ঠ রমেন পোদ্দার। অন্য দিকে কংগ্রেস-জনতা পার্টির পছন্দ ছিল সন্তোষ ভট্টাচার্য। এই ঘটনা নিয়ে বামফ্রন্টের ভিতরে তুমুল ক্ষোভ সঞ্চারিত হয়। বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান সরোজ মুখোপাধ্যায়ের ডাকা বৈঠকে স্থির হয়, কেউ রাজ্যপালের সভায় যোগ দেবে না। জ্যোতি বসু নিজে সেই সময়ে রাজ্যপালের ডাকা একটি আইনি পরামর্শের বৈঠকে যাননি। এমনকি যাননি ১০ জানুয়ারি নবনির্বাচিত মন্ত্রী নিহার বসুর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানেও। এ পি শর্মার যুক্তি ছিল, ভোটাভুটিতে সন্তোষ ভট্টাচার্য রমেন পোদ্দারের থেকে এগিয়ে গিয়েছিলেন, তাই তিনি যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বামেরা আবার পাল্টা নজির টেনে এনে বলে, ১৯৫৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর পদে বসেন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, যিনি আদতে এই পদের অন্য দাবিদার বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর থেকে কম ভোট পেয়েছিলেন। অর্থাৎ ভোটাভুটিকে সেদিন গুরুত্ব দিতে চায়নি বামেরা। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেও ক্ষোভের আগুন ছড়ায়। প্রথম দিনই বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে বাধা পান সন্তোষ ভট্টাচার্য। নিরন্তর বাধার মধ্যে সন্তোষ ভট্টাচার্য এই পদ ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। কিন্তু এপি শর্মাকে বয়কটের ডাক উঠতে থাকে বামেদের মধ্যে থেকে। ১৯৮৪ সালেই তিনি বি‌দায় নিলে বাংলায় রাজ্যপাল হয়ে আসেন উমাশঙ্কর দীক্ষিত। মনে রাখতে হবে এই আটের দশকেই সাকারিয়া কমিশনের কাছে পাঠানো রিপোর্টে বামেরা বলেছিল, এই আলঙ্কারিক রাজ্যপাল পদটি রাখারই কোনও প্রয়োজন নেই।

ফলে বিবাদেরও একটা দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু গত কয়েক দশকে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহকে যাঁরা হাতের তালুর মতো চিনেছেন তাঁদের একটা বড় অংশই মানছেন সংঘাত কখনও এতটা বেআব্রু হয়ে দাঁড়ায়নি। বরিষ্ঠ সাংবাদিক জয়ন্ত ঘোষালের কথায়, "রাজ্যপালের ভূমিকা তো ব্রিটেনের রানির মতো। তিনি শুনবেন, বলবেন কম। তাছাড়া তিনি যদি বলতেও চান কেন্দ্রে রিপোর্ট পাঠানোর এক্তিয়ারও তাঁর আছে। কোনও বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করেও তিনি রিপোর্ট দিতে পারেন। সরকারের নীতি নির্ধারণ তিনি করতে পারেন না, প্রকাশ্যে ট্যুইট করে মতামতও দিতে পারেন না। কারণ মুখ্যমন্ত্রী বা স্পিকার এদের সাংবিধানিক পদকেই খাঁটো করা হয় এমনটা করলে।"

জয়ন্তবাবু কথায় কথায় তুলে আনলেন, কেরল বা মহারাষ্ট্রে সাম্প্রতিক অতীতে রাজ্য-রাজ্যপাল দ্বন্দ্বের প্রসঙ্গ। উল্লেখ্য কেরলের রাজ্যপাল আরিফ মহম্মদ খানকে দেখা গিয়েছিল ৩৭০ ধারা নিয়ে প্রকাশ্যে ইন্টারভিউ দিতে। জয়ন্তবাবু মনে করছেন, এটা কোনও ভাবেই কাম্য নয়।‌ তাঁর কথায়, "এই মনান্তরে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোই আক্রান্ত হচ্ছে। কেন্দ্র-রাজ্যের চলার কথা পারস্পরিক সহযোগিতার নীতিতে। সেক্ষেত্রে কেন্দ্রের কথা যেমন রাজ্য শুনবে, রাজ্যের বিষয়ও তো কেন্দ্রকে শুনতে হবে। "

রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বনাথ চক্রবর্তীও মানলেন অতীতে যে দ্বন্দ্ব ছিল আর এখন যে মারকাটারি লড়াই, তার মাত্রা এক নয়। তিনি বলছেন, "অতীতে একে অপরের প্রতি সৌজন্য রেখে লড়াই করেছে। এখন অশ্রদ্ধা লাগামছাড়া হয়ে গিয়েছে। রাজ্যপালকে পাগলা কুকুর বলা হয়েছে দেখলাম। অতীত খুঁজে এমন নিদর্শন আর পাবে না।"

বিবাদের ধরনের ফারাকটা স্পষ্ট করলেন তিনিই। বললেন, "ইতিহাস খুঁজলে দেখবে খুব সীমিত ক্ষেত্রেই লড়াই হয়েছে অতীতে। বিষয়গুলি ছিল ভাইস চ্যান্সেলারের নিয়োগ, সংখ্যাগরিষ্ঠতা। সেগুলি মিটেও গিয়েছে। রাজ্যপালের ভাষণ নিয়েও কখনও কখনও সরগরম হয়েছে বিষয়টা। কিন্তু এবার যে লড়াইটা হচ্ছে সেটা হল, অন্তত, সীমাহীন।"

নবনির্বাচিত সরকারকে উপসর্গটি দেখিয়ে একটি পরামর্শও দিচ্ছেন বিশ্বনাথ চক্রবর্তী। তাঁর কথায়, "রাজ্যপাল আসার পর থেকেই এক যোগে হিংসা নিয়ে ট্যুইট করে চলেছেন। মোট ৯০ শতাংশ ট্যুইট এটা নিয়েই। তৃণমূলের রাজনৈতিক অভিসন্ধির যে অভিযোগটি সামনে আনছে তা মিথ্যে নয়। তবে রাজ্য সরকারকেও আইন মোতাবেক শাসন পরিচালনা এই খামতিগুলি দূর করার বিষয়ে যত্নবান হতে হবে। ফাঁক থাকলেই জায়াগা থেকেই জগদীপ ধনখড় বারংবার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন এই জায়গাগুলিতে ঢোকার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে বিপুল জনাদেশ পেয়েছেন, আইনের শাসনে আরও যত্নবান হলে জগদীপ ধনখড় কি ঢোকার সুযোগ পাবেন?"

Published by:Arka Deb
First published: