'এই দলটা গরিবের জন্য ভাবে', নকশাল থেকে বিজেপি-বৃত্ত সম্পূর্ণ করলেন মিঠুন

'এই দলটা গরিবের জন্য ভাবে', নকশাল থেকে বিজেপি-বৃত্ত সম্পূর্ণ করলেন মিঠুন

বাংলার রাজনীতিতে প্রায় সব 'ঘর' ঘুরে ফেলে বৃত্ত সম্পূর্ণ করা সেই মানুষটা, 'মহাগুরু' মিঠুন চক্রবর্তী বললেন, 'আমি গরিবের জন্য কাজ করতে চাই।'

বাংলার রাজনীতিতে প্রায় সব 'ঘর' ঘুরে ফেলে বৃত্ত সম্পূর্ণ করা সেই মানুষটা, 'মহাগুরু' মিঠুন চক্রবর্তী বললেন, 'আমি গরিবের জন্য কাজ করতে চাই।'

  • Share this:

    #কলকাতা: তখন স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়তেন গৌরাঙ্গ চক্রবর্তী। ঠিক সেই সময়ই ছাত্র রাজনীতির আঁচ এসে পড়েছিল কলেজপড়ুয়া ছেলেটির মনেও। জড়িয়ে পড়েছিলেন নকশালপন্থী রাজনীতির সঙ্গে। পড়াশোনা, উত্তর কলকাতা আর রাজনীতি-ছেলেটির মনের দূরদূরান্তেও তখন সিনেমার নায়ক হওয়ার চিন্তা নেই। বরং সমাজ বদলের স্বপ্ন তাঁর চোখে। ভাইয়ের আকস্মিক মৃত্যুই সেই ছেলেটার মনটাকে একেবারে নাড়িয়ে দিল। সরে এলেন রাজনীতি থেকে, ফিরলেন পরিবারের নিরাপদ ঘেরাটোপে। এরপরই 'বোম্বে' পাড়ি। যদিও শোনা যায়, রাজনৈতিক কারণে তাঁর প্রাণের ঝুঁকি ছিলই, তাই তিনি নিজের জায়গা ছেড়ে পাড়ি দিয়েছিলেন সেই আরব সাগর পাড়ে। বদলে গেল নাম। তারপর গঙ্গা দিয়েও কত জল গড়াল। 'ডিস্কো ডান্সার' থেকে সুপারস্টার, 'সুভাষদা'র সান্নিধ্যে ফের রাজনীতিতে প্রবেশ, ২০১১ সালের পর থেকে তৃণমূল ঘনিষ্ঠতা, ঘাসফুল শিবিরের রাজ্য়সভার সাংসদ হয়ে এবার তিনি 'স্বপ্নপূরণ' করলেন নরেন্দ্র মোদির সান্নিধ্যে। বাংলার রাজনীতিতে প্রায় সব 'ঘর' ঘুরে ফেলে বৃত্ত সম্পূর্ণ করা সেই মানুষটা, 'মহাগুরু' মিঠুন চক্রবর্তী বললেন, 'আমি গরিবের জন্য কাজ করতে চাই।'

    উত্তর কলকাতার গলি থেকে মুম্বইয়ের স্টার হয়ে ওঠা মিঠুনের জীবনের লড়াই যে কারও কাছে শিক্ষণীয় হতে পারে। মিঠুন বারবার নিজেও বলেছেন সে কথা, 'আমাকে দ্য়াখো, আমি লড়াই করেছি বলেই আজ এই জায়গায়।' হক কথা। তবে, রাজনৈতিক মিঠুন বরাবরই কেমন যেন রহস্যময় রয়ে গেলেন বলেই মত অনেকের। অতি বাম রাজনীতি থেকে আজ বিজেপিতে যোগদান, মিঠুনকে বেঁধে রাখতে পারেননি এর আগে কেউই। পরিবার হয়ে ওঠা সুভাষ চক্রবর্তীর মৃত্যুর পরও যেমন বামেদের থেকে দূরে সরে গিয়েছেন তিনি, তেমনি দু'বছর তৃণমূলের সাংসদ থেকে সারদা কাণ্ডের জেরে সেই যে দূরত্ব বাড়ালেন 'বোন' মমতার থেকে, আজ হয়ে উঠলেন 'যুযুধান'।

    রবিবার ব্রিগেডে যখন ধুলো উড়িয়ে ঢুকছে নরেন্দ্র মোদির কনভয়, ততক্ষণে বক্তব্য রাখা হয়ে গিয়েছে মিঠুনের। আর সেই মিনিট কয়েকের বক্তৃতাতেও ফুল ফর্মে ছিলেন 'এমএলএ ফাটাকেষ্ট'। হাজার মাথার অনুরোধে জনতার উদ্দেশে দাঁড়িয়ে ধুতি-পাঞ্জাবি-টুপি মাথার 'বাঙালি বাবু' মিঠুন তখন আওড়ে যাচ্ছেন একের পর এক গরমাগরম সংলাপ। বলছেন সেই চিরচেনা, 'মারব এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে।' আর তিনি যে ভোটে একপ্রকার দাঁড়াচ্ছেনই, তা স্পষ্ট করেই তখন ব্রিগেড কাঁপিয়ে বলেন, 'আরেকটা নতুন ডায়লগ দিচ্ছি, আমার জন্য এখন থেকে এটাই সবাই বলবেন।..... আমি জলঢোঁড়াও নই, বেলেবোড়াও নই, আমি কোবরা, আমি জাত গোখড়ো, এক ছোবলেই ছবি! আমি সবসময় আপনাদের সঙ্গে থাকব।' রাজনৈতিক মহলের একটা বড় অংশ বলছে, মিঠুনকে বড় পদের আশ্বাসই দিয়েছে বিজেপি। আর সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি মিঠুন নিজেও। এবার কি বাস্তবে দেখা যাবে 'মিনিস্টার ফাটাকেষ্ট'কে? সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নে 'মহাগুরু'র জবাব, 'হতেই পারে।' এমনকী মিঠুনকে মুখ্যমন্ত্রী মুখ করার জল্পনা যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল। 'ঘরের মেয়ে' মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করতে গিয়ে স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি মিঠুনকে 'বাংলার ঘরের ছেলে' বলে এগিয়ে দিলেন। বঙ্গ রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা এই পরিচয়কে লঘু করে দেখতে নারাজ।

    ব্রিগেডের সভা সেরেই নিজের বক্তব্য অনেকটা গুছিয়ে নেন মিঠুন। সংবাদমাধ্যমে বলেন, 'এখন সবাই জানতে চাইবে, আমি কেন বিজেপিতে? আমি অতিবাম রাজনীতি করেছি, কিন্তু থাকিনি। তৃণমূলের সাংসদ ছিলাম। আমি বলব না, অন্য কেউ ভুল ছিল। বরং আমি বলব, ওটা আমার ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এবার আমি বিজেপিতে। আসলে আমার একটা স্বপ্ন ছিল, গরিবের জন্য কাজ করব। প্রধানমন্ত্রী আজ বলেছেন, গরিবের জন্যই কাজ করবেন। আমার মনে হয়, এই দলটা ভাবছে গরিবের জন্য। আমার লক্ষ্য সেটাই, ওই মানুষগুলোর জন্য কাজ করা। তার জন্য আমাকে কারও হাত ধরতেই হবে।' এতবার দলবদলে মানুষের কাছে তাঁর ইমেজ 'স্বার্থপর' হয়ে উঠতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই যেন মিঠুন সংযোজন করে দেন, 'আমাকে স্বার্থপর ভাবতেই পারেন অনেকে। কিন্তু আমি গরিব মানুষের স্বার্থটা আগে দেখব। এখানে কৈলাসজি, দিলীপ দা'রা দীর্ঘদিন কাজ করছেন। আর এখন সেই সময় এসেছে, যখন বিজেপি এ রাজ্যে সরকার গড়বেই। আর সোনার বাংলা গড়ার পর আমি সবথেকে গর্বিত মানুষ হব।'

    মিঠুনের বিজেপিতে যোগদানকে স্বাভাবিক কারণেই গুরুত্ব দিতে চায়নি তৃণমূল। ভোট যখন দরজায়, তখন ফোকাস নড়লে ঘর উজাড় হয়ে যেতে পারে। সেই কারণেই এদিন শিলিগুড়ির সভামঞ্চ থেকে মিঠুনের যোগদান নিয়ে আকারে-ইঙ্গিতেও একটিও শব্দ ব্যয় করেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। 'বোনের' সঙ্গে দূরত্ব এবার না মেটার হয়ে গেল 'মিঠুন দা'র। যদিও রাজনীতিতে 'চির' শব্দের মূল্য কবেই বা ছিল। আর মিঠুন চক্রবর্তী তো এখন থেকে পুরোদস্তুর রাজনীতিক।

    Published by:Suman Biswas
    First published: