বসুশ্রী হলে পয়লা বৈশাখের জলসা আর জিয়া নস্ট্যাল

সালটা ১৯৫০ ৷ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রোডের উপর বসুশ্রী হলের গায়ে সবে তারুণ্যের রং লাগতে শুরু করেছে ৷ ইউরোপিয়ান ধাঁচে তৈরি হলটির একটি ঘরে রোজ সন্ধ্যাতেই তাবড় তারকাদের ভিড় জমে যেত ৷

Amrit Halder | News18 Bangla
Updated:Apr 10, 2019 03:54 PM IST
বসুশ্রী হলে পয়লা বৈশাখের জলসা আর জিয়া নস্ট্যাল
কৌলীন্যের বিচারে তখন এই জলসাই ছিল পয়লা নম্বরে ৷
Amrit Halder | News18 Bangla
Updated:Apr 10, 2019 03:54 PM IST

#কলকাতা: সালটা ১৯৫০ ৷ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রোডের উপর বসুশ্রী হলের গায়ে সবে তারুণ্যের রং লাগতে শুরু করেছে ৷ ইউরোপিয়ান ধাঁচে তৈরি হলটির একটি ঘরে রোজ সন্ধ্যাতেই তাবড় তারকাদের ভিড় জমে যেত ৷ এমনই এক সন্ধ্যায় আড্ডায় হাজির হলের সর্বেসর্বা মন্টু বসু, শ্যামল মিত্র, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অজিত চট্টোপাধ্যায় ৷ তবুও আড্ডাটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা তখনও ৷ আসলে আড্ডার প্রাণ পুরুষ হেমন্ত মুখোপাধ্যায় যে এখনও এসে পৌঁছননি ৷ অবশেষে বসুশ্রীতে এসে হাজির হলেন ৬ফুট ২ ইঞ্চির মানুষটা ৷

সান্ধ্যকালীন আড্ডা বসবে, আর একটু খাওয়া-দাওয়া হবে না ! এটা বিলকুল নাপসন্দ ছিল হেমন্তবাবুর ৷ তিনি আসতে না আসতেই চলে এল ভাঁড়ে চা আর পূর্ণ ঘোষের খাস্তা শিঙাড়া ৷ চায়ের ভাঁড়ে চুমুক লাগিয়ে হেমন্তেবাবু বললেন, ‘শোন মন্টু তোর হলে তো অনেক জায়গা ৷ সামনেই তো পয়লা বৈশাখ ৷ একটা জমজমাট জলসা করা যায় না?’’ সবাই তো হেমন্তবাবুর সেই প্রস্তাবে দারুণ খুশি ৷ কিন্তু জলসা জিনিসটা আসলে কী, তখনও জানেন কেউই ৷ আসলে তখনও এ দেশে তেমনভাবে জলসা রং জমানো শুরু করেনি ৷ তবে হেমন্তবাবু যখন বলেছেন, তখন বিরাট একটা ব্যাপার হবে ৷ হেমন্তবাবুর এক কথায় রাজি মন্টু বসু ৷ তবে তাঁর আবদার, ‘‘দাদা, গোটা ব্যাপারটা কিন্তু তোমাকেই দেখতে হবে ৷’’ হেমন্তবাবুও নিরাশ করলেন না ৷ কথা দিলেন, যদি বোম্বেতেও থাকেন পয়লা বৈশাখের সময় বসুশ্রীর জলসা হাজির হবেনই ৷ সেই থেকে শুরু হল বসুশ্রী সিনেমা হলে পয়লা বৈশাখের জলসা ৷

2

মন্টু বসু, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও শ্যামল মিত্র (বাঁ দিক থেকে) ৷

সে এক রমরম ব্যাপার ৷ এই একটা দিনের জন্য অপেক্ষায় থাকতেন বহু মানুষ ৷ এই আসরের তো টিকিটের কোনও ব্যাপার ছিল না ৷ হল খোলার কিছুক্ষণের মধ্যেই হাউসফুল ৷ অনুষ্ঠানের দিন ভোর থেকে রাজ্য তো বটেই অন্যান্য রাজ্যের বাঙালিরা এসে ঠাই গাড়তো বসুশ্রীর সামনের ফুটপাথে ৷ বাংলা বছরের প্রথম দিনে বাঙালির সেই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মতো ৷ ভিড়ের চাপে বন্ধ হয়ে যেত গোটা এলাকা ৷ এক বছর তো উত্তম কুমারকে দেখার জন্য এমন হুড়োহুড়ি, বহু মানুষ চোট পেয়েছিলেন ৷ এরপর থেকে সোজা গেট দিয়ে উত্তমবাবুকে আর জলসায় আনা হত না ৷ এমনকী ঘোষণাও করা হত না যে তিনি আসছেন এ বার ৷ খুবই সন্তর্পণে হলের পিছনের গেট দিয়ে আনা হত মহানায়ককে ৷ তবু গুরুকে দেখতে চাইছেন সকলেই ৷ তবে হাজার হাজার লোক হলের ভিতর ঢুকবেন কী করে? হলের সামনে রাস্তায় উপর সামিয়ানা টাঙানোর ব্যবস্থা হল ৷ লাগানো হল বেশ কতগুলো মাইক ৷ সেই মাইকেই তখন শোনা যাচ্ছে উত্তম কুমারের গলা ৷ শোনা যাচ্ছে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কিংবা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান ৷ এতেই খুশি সবাই ৷

Loading...

কৌলীন্যের বিচারে তখন এই জলসাই ছিল পয়লা নম্বরে ৷ কত যে তাবড় তাবড় তারকা এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন তা বলে শেষ করা যাবে না ৷ শ্যামল মিত্র থেকে শুরু করে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন এই জলসার পরিচিত নাম ৷ আর শিল্পীরাও এই অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার একটা সুযোগ পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করতেন ৷ স্বর্ণযুগের শিল্পীরা এখনও এই অনুষ্ঠান নিয়ে নস্ট্যালজিয়ায় ভোগেন ৷ সে দিনগুলো স্মৃতিতে অমলিন এখনও ৷

3

আল্পনা বন্দোপাধ্যায়, লতা মঙ্গেশকর, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, বেলা মুখোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (বসে বাঁদিক থেকে) ৷ মন্টু বসু, ভি বালসারা, অজিত চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র (বাঁদিকে দাঁড়িয়ে) ৷

সে সময় শিল্পীদের জন্য কোনও গ্রিনরুমের ব্যবস্থা ছিল না ৷ সামনের সারিতেই বসে থাকতেন সবাই ৷ ডাক পড়লে স্টেজে উঠতেন ৷ তখন ‘সপ্তপদী’ বেশ কিছুদিন রিলিজ হয়ে গিয়েছে। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় সে সময় খ্যাতির শীর্ষে ৷ মঞ্চে তখন ‘গীতশ্রী’ ৷ আর সামনের সারিতে স্বপ্নের নায়ক উত্তম কুমার ৷ তাঁকে দেখে প্রেক্ষাগৃহে রীতিমতো গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। মন্টুবাবু সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে ইশারা করে বললেন, ‘‘স্টেজ থেকে এখন নেমো না ৷’’ মঞ্চের উপর চুপচাপ বসে রয়েছেন সন্ধ্যাদেবী এবং রাধাকান্ত নন্দী ৷ প্রায় ঠেলেই উত্তমকুমারকে স্টেজে তুলে দিলেন মন্টু বাবুরা ৷ কী করতে হবে? না ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গাইতে হবে। এই রে গানের খাতা তো আননেনি মহানায়ক ৷ তায় আবার অনুরোধ-‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গাইতে হবে ৷ স্টেজে উঠেই উত্তম কুমার সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কানে কানে বললেন, ‘‘আমার কাছে গানটা লেখা নেই ৷’’ গায়িকার উত্তর-‘‘আপনি চিন্তা করবেন না গানটা আমার লেখা আছে।’’ হারমোনিয়ামটা বাজানো শুরু করলেন সন্ধ্যাদেবী । মহানায়ক গান গাইতে শুরু করলেই প্রেক্ষাগৃহ হাততালিতে ফেঁটে পড়ছে ৷ যখন ‘তুমি বলো, না তুমিই বলো’ ওই জায়গাগুলো আসছে গোটা প্রেক্ষাগৃহের দর্শক-শ্রোতারা আনন্দে উঠে দাঁড়াচ্ছেন। হল যেন ফেটে পড়ছে। দর্শক-শ্রোতাদের ওই উচ্ছ্বাস দেখে উত্তমবাবু এবং সন্ধ্যাদেবী রীতিমতো তখন চার্জড। গান চলল বেশ কিছু সময় ৷

4

গান গাইছেন উত্তম কুমার ৷ পাশে শ্যামল মিত্র, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, তরুণ কুমার,  বাসবী নন্দী ও সুপ্রিয়া চৌধুরী ৷

এই অনুষ্ঠানে একবার এসেছিলেন লতা মঙ্গেশকরও ৷ শোনা যায় মহানায়িকা সুচিত্রা সেন একবারের জন্যই এসেছিলেন বসুশ্রীতে পয়লা বৈশাখের জলসায় ৷ কলকাতায় থাকলে এই অনুষ্ঠানে গান গাইতেন কিশোর কুমার ৷ অনুষ্ঠানের এক্কেবারে শেষে মঞ্চে উঠতেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ৷ গাইতেন বহু গান ৷ আসলে এই অনুষ্ঠানের প্রাণপুরুষ ছিলেন তিনিই ৷ হেমন্ত মুখোপাধ্যায় মারা যাওয়ার পর বেশ কিছু বছরের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বসুশ্রীর পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান ৷ আসলে মন্টু বসু হেমন্তবাবু ছাড়া এই অনুষ্ঠান চালিয়ে নিয়ে যেতে চাননি ৷ পয়লা বৈশাখের জলসা নেই বসুশ্রীতে ৷ ভাবতেই পারতেন না তখনকার তারকারা ৷ মন্টু বসুও এদিনটায় প্রচণ্ড মনোকষ্টে থাকতেন ৷ হঠাৎ একদিন একটা ফোন এল তাঁর কাছে ৷ ‘‘দাদা এ বার পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানটা হচ্ছে তো?’’ না বলে ফোনের রিসিভারটা নামিয়ে দিয়ে চিন্তায় ডুবে গিয়েছিলেন তিনি ৷ সারাটা বছর ভালো থাকলেওে, পয়লা বৈশাখের দিনটায় ভীষণ কষ্ট পেতেন ৷ তাঁর এই কষ্ট দেখেই পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জোরাজুরিতেই ফের চালু হল বসুশ্রীর জলসা ৷ অজয় বিশ্বাসের তত্ত্বাবধানে শুরু জলসা ৷ ধীরে ধীরে সেই চেনা জৌলুস হারিয়েছে বসুশ্রীর পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান ৷ তবে এখনকার তারকা এখনও এই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকেন ৷ এ বার পয়লা বৈশাখে চাঁদের হাট বসবে বসুশ্রীতে ৷ বাংলা বছরের প্রথমদিনটায় বাঙালির জলসায় মাতবে বাংলা ৷

ছবি  : বসুশ্রী হলের আর্কাইভ থেকে ৷ 

তথ্য সহায়তা: দেবজীবন বসু 

First published: 03:32:50 PM Apr 10, 2019
পুরো খবর পড়ুন
Loading...
अगली ख़बर