বিনোদন

corona virus btn
corona virus btn
Loading

কেন সৌমিত্রই একমাত্র বিশ্বমানের 'বাঙালি' নায়ক, অন্য কেউ যা পারেননি

কেন সৌমিত্রই একমাত্র বিশ্বমানের 'বাঙালি' নায়ক, অন্য কেউ যা পারেননি

আলোআঁধারি এক মায়াবী রাত। মশারীর অন্দরে নতোমুখ বধূর দু বাহুতে হাত রেখে প্রাণপণ বোঝানোর চেষ্টা করছেন এক স্বামী।

  • Share this:

শর্মিলা মাইতি #কলকাতা: আলোআঁধারি এক মায়াবী রাত। মশারীর অন্দরে নতোমুখ বধূর দু বাহুতে হাত রেখে প্রাণপণ বোঝানোর চেষ্টা করছেন এক স্বামী। স্ত্রীকে তাঁর বাবার পাতা ফাঁদ থেকে উদ্ধারের জন্য। দৈবশক্তির অধিকারিণী সে নয়, সে রক্তমাংসের মানবী, এক প্রেমযোগ্যা নববধূ সেটুকু বোঝানোর কাকুতিমিনতি এক যুবকের। সত্যজিত রায় পরিচালিত 'দেবী'। শ্রেষ্ঠাংশে সৌমিত্র ও শর্মিলা। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অগণিত ছবির লাইব্রেরি থেকে একটি দৃশ্যের অবতারণা করা খুবই দুরূহ ব্যাপার। কিন্তু কলমের উপর বিশ্বাস রেখে বলতে পারি,  এরকম কঠিন জটিল মনস্তত্ত্বের একটি দৃশ্য সৌমিত্র ছিলেন বলেই সম্ভব হয়েছে।  তবু এ দৃশ্যে পরিচালক সত্যজিতের মুনশিয়ানার পাল্লা ভারি হবে, নাকি সৌমিত্রের অভিনয় দক্ষতার সে নিয়ে তর্ক চলতেই পারে।  তর্কপ্রিয় বাঙালি এখনও মজে উত্তম না সৌমিত্র টপিকে। কিন্তু সেই গণ্ডি কয়েক যুগ আগে অতিক্রম করে বহু ঊর্ধ্বে, যে বিশ্বময়তায় একটা গোটা জাতিকে পৌঁছে দিলেন, সে নিয়ে কজন তর্ক তোলেন? না তুললেও, বিনা বাক্যব্যয়ে স্বীকার করেন ক'জন?

দেবী-র সে দৃশ্য হোক বা অপুর সংসারের অপু, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনেতার চেয়েও বেশি করে এক চিত্রকর। পরের পর ছবিতে তিনি নিবিষ্ট মনে আঁকছেন এক বাঙালি পুরুষকে। যে সুদর্শন, বুদ্ধিদীপ্ত, স্থিতধী পুরুষ শুধুই চরিত্র নয়। যে চলমান। সময়,  সমাজকে সঙ্গে নিয়ে চলে। সেলুলয়েডের পরিসর থেকে বেরিয়ে এসেও পথ হাঁটে। অপুর সংসার ছবির সেই তীব্র জীবনমুখী যুবার মতো, সব আবেগকে জয় করে সে চলতে থাকে। ঠিক এমনই চলমানতার সন্ধানে থাকে বিশ্বদর্শক। অনেকটা ভ্যান গঘের ছবি, যা ক্যানভাসের চতুর্পাশ থেকে বেরিয়ে এসে সময়ে মিশে যায়।

সাবটাইটেল দেখে বিশ্বদর্শক ছবি বোঝেন না। বোঝেন অভিনয় দেখে। অভিব্যক্তিতে। তাই সৌমিত্র অভিনীত সত্যজিতের 14 টি ছবি এখনও বিশ্বের দর্শক, ছাত্র ও সমালোচকের কাছে এক-একটি অনবদ্য টেক্সট। কখনও 'ঘরে-বাইরে', 'অশনি সঙ্কেত' এর মতো ইতিহাসের দলিল, কখনও বা ফেলুদা সিরিজের বাঙালি সত্যসন্ধানী, যাকে অনায়াসে তুল্যমূল্য বিচার করা যায় সারা বিশ্বে পরিচিত শার্লক হোমসের সঙ্গে। অননুকরণীয়। এক পূর্ণ বাঙালি স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল।

আসলে সৌমিত্র কিন্তু সত্যজিতেও আটকে নেই। বিপুল ছবির ভাণ্ডারে এত বেশি চরিত্রায়ণ যে কোনও কোনওটি একটু অনাদরলালিত। করোনাক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া, তাঁর শয্যাশায়ী থেকেও লড়াইয়ের সময়টায় ফেলুদার চেয়েও বেশি, বাঙালির বুক চিরে তেড়ে ফুঁড়ে বেরিয়ে এল ক্ষিদ্দা। কোনি-র ক্ষিদ্দা। মুষ্টিবদ্ধ হাতে যিনি উচ্চকণ্ঠে বলেন, ফাইট কোনি ফাইট! এই ছবিও কিন্তু মান হিসেবে সিনেমাবোদ্ধা বাঙালির কাছে বিশেষ সমাদর পায়নি এতটা। দূরদর্শনের রিপিট টেলিকাস্ট হওয়া ছবি,  প্রায়শ দেখা। হঠাৎ ক্ষিদ্দাই সকল বাঙালির ফাইটিং স্পিরিট। ম্যাজিক মন্ত্রটা সৌমিত্ররই। এমন এক অভিনেতা যিনি আজীবন 'ব্যবহৃত' হতেই চাইতেন। চাইতেন বিবর্তিত হতে। তিন ভুবনের পারে',  'সাত পাকে বাঁধা' হয়ে থাকতে নয়, আরও গভীরতর প্রতিজ্ঞায় নিয়োজিত তিনি। কবিতা, নাটক, লেখালিখি সবকিছু দিয়ে বাংলা ভাষাকে নাগপাশের মতো জড়িয়ে রেখেছেন। যৌবনে আকণ্ঠ ডুবেছেন অভিনয় ও জ্ঞানচর্চায়। অর্থের লোভ থেকে বিরত থেকেছেন। কখনও ছিটকে বেরিয়ে এসে একটু মুম্বই গিয়ে চর্চা করতে চাননি। পরম আত্মসম্মানে সেসব অফার সরিয়ে রেখেছেন। প্রযোজককে ফিরিয়েছেন। জীবনে কখনও সেজন্য অনুতাপ করেননি। বাঙালি অবশ্য করেছে। সৌমিত্র 'বম্বে' গেলে কী না করতে পারতেন, সে নিয়ে আকাশকুসুম ভাবনা ভেবেছেন। 'বম্বে' না যাওয়ার জন্যেই যে তিনি 'রে-র হিরো' হয়ে থেকে গিয়েছেন এমন মন্তব্যও করতে শুনেছি জনৈক বিখ্যাত সমালোচককে! এমনকি 'মাঝখানে' সৌমিত্র 'যে সব ছবিতে যা সব চরিত্র পেয়েছেন' তা নিয়েও চায়ের আড্ডা কম বসেনি। এসবের মধ্যে এক সহজ সত্য হারিয়ে গেল। অভিনেতার ধর্মই অভিনয় করে চলা। তীব্র জীবনমুখী, প্রাণশক্তিতে ভরপুর যে প্রৌঢ়  সৌমিত্রকে আমরা প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় জুড়ে পেয়েছি, তার কোনও তুলনা এ যাবত বাংলা ছবির ইতিহাসে নেই। নায়কের চরিত্রেই অভিনয় করেছেন তিনি। তাঁরই রূপায়নে বেশ কিছু বাঙালি 'টাইপ' বিশ্বসিনেমায় 'আইকনিক' হয়ে উঠেছে। গৌতম ঘোষের 'দেখা' হোক বা ঋতুপর্ণ ঘোষের 'অসুখ', সৌমিত্রের নিজস্ব ছোঁয়া চরিত্রকে গ্লোবাল করে তোলে। ভাষার ঊর্ধ্বে গিয়ে। অতনু ঘোষের রূপকথা নয় ছবির ঝোলা-কাঁধে বৃদ্ধ, বেলাশেষে, পোস্ত ছবিতে জ্যেষ্ঠতম , বরুণবাবুর বন্ধু ছবির বজ্রকঠিন সেই মধ্যবিত্ত বৃদ্ধ , তারা কেউ শুধু চরিত্র নয়। এক পূর্ণ জীবনবৃত্তের প্রতিভূ। ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মাননা তাঁর সিনেমায় অনির্বচনীয় অবদানের জন্য।  ইউরোপের কোনও ইউনিভার্সিটিতে সৌমিত্রতত্ত্ব নিয়ে থিসিস করছে অনুসন্ধিতসু ছাত্র, এমনটা শুনে গর্বিত হওয়ার দিন আসন্ন। কারণ আমাদের, বাঙালিদের একজনই সৌমিত্র। যিনি অন্য কোনও ভাষার ছবিতে অভিনয় না করেও। একমেবাদ্বিতীয়ম।

Published by: Akash Misra
First published: November 5, 2020, 7:48 PM IST
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर