বিনোদন

corona virus btn
corona virus btn
Loading

সত্যজিতের ছবিতে অবিস্মরণীয় সংলাপ সৌমিত্রর, যা প্রবাদ হয়ে গেছে অজান্তেই

সত্যজিতের ছবিতে অবিস্মরণীয় সংলাপ সৌমিত্রর, যা প্রবাদ হয়ে গেছে অজান্তেই

এক জীবনে কত বার বলবে বাঙালি? সত্যি হিসেব রাখতে পারবেন না। ধরতেও পারবেন না। কারণ, পিঠ চাপড়ে দেওয়ার সময়ে আচম্বিতে, স্বতস্ফূর্ত উচ্ছ্বাসে বেরিয়ে আসে এই শব্দগুলো, তাই না।

  • Share this:
শর্মিলা মাইতি
#কলকাতা: সাবাশ তোপসে!
এক জীবনে কত বার বলবে বাঙালি? সত্যি হিসেব রাখতে পারবেন না। ধরতেও পারবেন না। কারণ, পিঠ চাপড়ে দেওয়ার সময়ে আচম্বিতে, স্বতস্ফূর্ত উচ্ছ্বাসে বেরিয়ে আসে এই শব্দগুলো, তাই না।
কিন্তু আজও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা হল না যে মানুষটির কাছে, তিনি তো দীর্ঘ যন্ত্রণার লড়াই কাটিয়ে পাড়ি দিয়েছেন অমৃতলোকে। তুমি যত বড় হও, তুমি তো মৃত্যুর চেয়ে বড় নও। এই কথা বলে যাব আমি চলে।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে এমন কত বাক্যবন্ধ যে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে, আম বাঙালির ঘরোয়া সংলাপ হয়ে উঠেছে, তা নিয়েই গোটা বই লেখা যেতে পারত। ইত্যবসরে কয়েকটির উপর আলোকপাত করা যাক, যা আজও সমালোচকের, ক্রিটিকের চোখ এড়িয়ে গেল।
ফেলুদা সিরিজের প্রথম ছবি সোনার কেল্লা। ঠিক যে সিকোয়েন্সে প্রথম লালমোহনবাবু এন্ট্রি নিচ্ছেন ট্রেনের কামরায়, অনবরত বাঙালি টোনে ও টানে হিন্দি বলছেন। (একটু তলিয়ে বললে বোঝা যাবে, এই 'এন্ট্রি' বাংলা গোয়েন্দা ছবির ইতিহাসে একটি তাতপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। লালমোহনবাবুর চিত্রায়ণ ও চরিত্রায়ণ বদলে বদলে গিয়েছে এর পর থেকে) ফেলুদা সৌমিত্র নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলছেন, কলকত্তা... আপনি হিন্দি চালিয়ে যেতে পারেন, বেশ লাগছে।
এই সংলাপটা রসিক বাঙালি যে কতবার ব্যবহার করেছে, আত্মসমালোচনার সময়ে! সৌমিত্রর অননুকরণীয় ছোঁয়ায় সূক্ষ্ম রসও উজাড় হয়ে আসে।
তেমনিভাবেই 'জয় বাবা ফেলুনাথ' ছবির বডিবিল্ডার গুণময় বাগচীর (মলয় রায়)  প্রশংসাসূচক মন্তব্যটা! বিছানায় গা এলিয়ে বলছেন, "বিশ্বনাথের মন্দির তো সবাই দেখতে পায়, বিশ্বশ্রীর মন্দির ক'জন দেখার সুযোগ পায়?"
নেহাতই নিজস্ব স্টাইলে বলা। কিন্তু সচেতন সাহিত্যপ্রেমী পুরুষ কীভাবে যথাযথ উপমার ব্যবহার করতে পারেন, এটা তার নমুনা। মাপকাঠি বললেও অত্যুক্তি হয় না। ঠিক এমনি করেই সত্যজিতের স্ক্রিপ্ট থেকে অনেকটা ঊর্ধ্বে উত্তোলন করতে পারতেন সৌমিত্র।
যেমন করে 'অরণ্যের দিনরাত্রি' ছবিতে এক সংযত, পরিমিতিবোধসম্পন্ন যুবক তার কাঙ্ক্ষিত প্রেমিকার থেকে অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে স্বগতোক্তির মতো বলে ওঠেন, "কিন্তু একটা ব্যাপার বার বার বলব ঠিক করছি, কিন্তু কিছুতেই বলে উঠতে পারছি না, কেন বলুন তো?"
আপাতভাবে মনে হয় এ আর এমন কি। এ কথা তো কত 'কনফিউজড' পুরুষ কত নারীকে বলেছে। কিন্তু এই রেপিটিটিভ ডায়লগেও নতুন করে একটা বাঙালি মাত্রা যোগ করে আকার দেওয়ার কাজটা একমাত্র এই অপূর্বদর্শন যুবাই করেছেন।
অপূর্বর কথাই যখন উঠল, তখন 'অপুর সংসার'-এর দিকে তাকানো যাক। কলকাতায় নতুন সংসারে রাত কেটে ভোর। উনুন ধরাচ্ছেন শর্মিলা। সৌমিত্র বালিশের তলা থেকে সিগারেটটা বের করতে যাবেন... বেরিয়ে এল চিরকুট। মেয়েলি হাতে লেখা। কথা দিয়েছ, খাওয়ার পর একটা খাবে।
এটি সংলাপ কেন? নবাগত সৌমিত্র অর্থাত অপু তো বলেনইনি কিছু। সংলাপে কি সর্বদা কথা থাকতেই হবে। পরের শটে সৌমিত্রের চাহনিই অনেক পুরুষের না-বলা কথা বলে দেয়।
কিছু না বলে সদ্যবিবাহিতার সঙ্গে বাক্যালাপ। এ বোধহয় তিনিই শিখিয়েছিলেন বাঙালি পুরুষকে। লজ্জা, প্রেম ও প্রশ্রয়ের এমন মেলবন্ধন আর কি কোনও অভিনেতার কাছে মেলে?
চারুলতার অমলও কথা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে পারে। চারুর ঘরে বসে অমল যখন বলছে, "সমস্ত জীবনটাই যেন এক ছন্দে বাঁধা। জন্ম মৃত্যু, দিনরাত্রি, সুখ দুঃখ, মিলন বিরহ... ঠিক যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো... একবার উঠছে একবার পড়ছে। একটা আছে বলেই অন্যটার সার্থকতা, তাই না? " বলে চারুর দিকে তাকায় অমল। রবীন্দ্রনাথের রচনাকে এমন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিলেন বলে, বৈপরীত্যেও কেমন কোমলতা, পেলবতার মলম মাখিয়ে দিতে পারলেন তিনি। তিনি মানে সৌমিত্র। অমল তো চরিত্র।
প্রেম সম্পর্কটা পুরুষ কীভাবে সবুজ, সতেজ করে রাখবে, ভাববে, সেটাও বোধহয় অজান্তে শিখিয়েছেন সৌমিত্র। একএকটি সংলাপ অনন্য মাত্রা পেয়েছে। ঘরে বাইরে ছবিতে সন্দীপ আবার পজেসিভ পুরুষ। দুই বলিষ্ঠ হাতে ধরেছেন বিমলাকে। বলছেন, "আমি সন্ধ্যেবেলা আসব। তুমি এখানে থাকবে। রোজ রোজ লোক পাঠিয়ে ডাকতে ভাল লাগে না।" থরথর করে কাঁদছেন বিমলা। বাঙালি পুরুষ কি এভাবেই জোর খাটিয়ে তার প্রেমিকার কাছ থেকে ভালবাসার পরীক্ষা নেয়নি?
মোট চোদ্দটি সত্যজিতের ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। প্রতিটি ছবিই কাটাছেঁড়া করলে এমন সব মণিমুক্তো বের হয়ে আসবে, যে সব সংলাপের অমরত্বের ঋণস্বীকার আজও করা হয়নি। হয়নি কেন? সে কি সৌমিত্রের অভিনয়জীবনের দৈর্ঘ্য ও ব্যপ্তির জন্য? এত এত উৎকৃষ্ট কাজ তিনি রেখে গিয়েছেন বলে? হীরক রাজার দেশে' ছবির প্রতিটি সংলাপ চিরস্মরণীয়। দড়ি ধরে মারো টান। রাজা হবে খান খান। ছন্দোবদ্ধতা অমূল্য হয়েছে পণ্ডিতের অভিব্যক্তিতে।
আজ তিনি নেই বলেই অবকাশ হল। কৃতজ্ঞতাটুকু জানানোর। সৃষ্টি যখন সোনার তরী নিয়ে চলে গেল, তখন।
Published by: Akash Misra
First published: November 17, 2020, 9:40 PM IST
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर