'সারা জীবন এত ছবি তুললাম, আমি চলে গেলে তার কী হবে', শেষ সাক্ষাৎকারে অকপট নিমাই ঘোষ

'সারা জীবন এত ছবি তুললাম, আমি চলে গেলে তার কী হবে', শেষ সাক্ষাৎকারে অকপট নিমাই ঘোষ
আলোকচিত্রী নিমাই ঘোষ।

২০১৯ সালের ১৩ মে নিমাই ঘোষের নিজের বাড়িতে তাঁর সঙ্গে যে সামান্য কথাবার্তা হযেছিল তাতে আমরা শুধু সত্যজিৎ রায়ে আটকে থাকিনি। অনেক অন্ধকারে আলো ফেলেছিলেন এই আলোকচিত্রী। জানিয়েছিলেন অনেক প্রাপ্তি অনেক আক্ষেপের কথা।

  • Share this:

তাঁকে লোকে সত্যজিৎ রায়ের আলোকচিত্রী বলেই চেনে। এই পরিচয় অস্বাভাবিক নয়, নিমাই ঘোষ শুধু সত্যজিৎ রায়েরই ছবি তুলেছিলেন এক লক্ষের বেশি। পুরোটাই ফিল্মে। আজকের এই ডিজিটাল যুগেও  এই পর্বত নির্মাণ অসম্ভব। ২০১৯ সালের ১৩ মে  নিমাই ঘোষের নিজের বাড়িতে তাঁর সঙ্গে যে সামান্য কথাবার্তা হযেছিল তাতে আমরা শুধু সত্যজিৎ রায়ে আটকে থাকিনি। অনেক অন্ধকারে আলো ফেলেছিলেন এই আলোকচিত্রী। জানিয়েছিলেন অনেক প্রাপ্তি অনেক আক্ষেপের কথা।  আজ তাঁর মৃত্যুদিনে সেই সাক্ষাৎকারটি প্রথম প্রকাশিত হল। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন-অরিত্রা দাশগুপ্ত।

আপনাকে সত্যজিৎ রায়ের ছবি তুলিয়ে হিসেবেই লোকে বেশি চেনে। কিন্তু আপনার তোলা আরও অসংখ্য ছবি রয়েছে। রামকিঙ্করের ছবিটি কী অবিশ্বাস্য! অনবদ্য। এই ছবিটির ব্যাপারে কিছু বলুন। যতটুকু মনে পড়ে।

নিমাই ঘোষ: আমি যখন প্রথমে ওনার বাড়ি যাই উনি বসে ছিলেন। আমি ঐ অবস্থাতেই র কিছু ছবি তুলি। দেখতে পেয়েই উনি খুব বিরক্ত হন। তারপর জিজ্ঞেস করেন, আমি কেন এসেছি। আসবার কারণ বলতেই খুব আপত্তি করলেন। তারপর আমার তোলা ছবিগুলো দেখতে চাইলেন। আমি দেখাতেই ওর মধ্যে এক অদ্ভুত বদল এল। প্রস্তুতি নিয়ে বসলেন এবং আমাকে আরও ছবি তোলার অনুমতি দিলেন।আমি সেই সময় রামকিঙ্করের বেশ অনেক গুলো ছবি তুলেছিলাম।

নিমাই ঘোষের ক্যামেরায় বিস্মিত রামকিংকর বেইজ। নিমাই ঘোষের ক্যামেরায় বিস্মিত রামকিংকর বেইজ।

নানা লেখায় পড়েছি আপনি সত্যজিৎ রায়ের প্রায় এক লাখের কাছাকাছি ছবি তুলেছিলেন। এর মধ্যে আপনার সবচেয়ে প্রিয় ছবি কোনটা?

নিমাই ঘোষ: শিল্পী বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের ওপর মানিকদা যে তথ্যচিত্রটা বানিয়েছিলেন 'দি ইনার আই' নামে, ওর বেশ কিছু শুটিং দিল্লিতে বিনোদবিহারীর এক ছাত্রের বাড়িতে হয়েছিল। ওখানে ওঁর আঁকা একটি ছবি ছিল। তো শট নিতে গিয়ে মানিকদা দেখলেন ছবিটি বাঁকা অবস্থায় রয়েছে। উঠে গিয়ে যখন ছবিটা ঠিক করছেন তখন দেওয়ালে মানিকদার বিশাল ছায়া পড়ে অদ্ভুত সুন্দর দেখতে লাগছিল। আমি ওই মুহূর্তটাকে তুলে রেখেছিলাম। ওই ছবিটা আমার অন্যতম প্রিয় ছবি।

আপনি তো প্রথম জীবনে থিয়েটার করেছেন এবং সে সময়ে যারা থিয়েটার করতেন তাদের বেশ কিছু ছবি ও তুলেছেন। সে ব্যাপারে কিছু বলুন?

নিমাই ঘোষ: আমি যখন কলেজে পড়ি তখন থেকেই আমাদের বেশ কিছু বন্ধু মিলে থিয়েটার করতাম। আমাদের নাটক দেখতে এসেছিলেন রবি ঘোষ। তিনি আমাদের নাটকের যথেষ্ট প্রশংসা করেছিলেন। এবং আমাকে তাঁদের দলে নাটক করার জন্য বলেছিলেন। ব্যাস ওই সময় থেকেই আমার নাটকের প্রতি উৎসাহ।

থিয়েটারের জন্য তোলা ছবিতে আলো যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা আমাকে প্রায় হাতে ধরে বুঝিয়েছিলেন তাপসদা, মানে তাপস সেন।

তাপস সেন সম্পর্কে বলার লোক তো আমাদের চারপাশে কমে আসছে। আপনার বয়ানটাই ইতিহাসের অংশ। ওর কথা কিছু বলুন।

নিমাই ঘোষ: তাপসদার সঙ্গে আমার আলাপ নাটক করতে গিয়েই। আমি তাপসদার লাইটিং করার বিষয়টা মন দিয়ে লক্ষ্য করতাম। তাপসদার সঙ্গে আলো নিয়ে আলোচনা করতাম। তাপসদা আমাকে বুঝিয়ে দিতেন। এমন অনেক দিন হয়েছে আমি যখন সবে সবে ছবি তুলছি, ছবি তোলার পর তাপসদাকে দেখাতে নিয়ে যেতাম, তাপসদা ধৈর্য ধরে আমার তোলা ছবি দেখতেন । বুঝিয়ে বলে দিতেন কোথায় আলো কম, কোথায় আলো বেশি। সত্যি কথা বলতে কি ছবিতে আলো কী ভাবে ব্যাবহার করতে হয় তা বোঝানোর জন্য আমি সারাজীবন তাপসদার কাছে ঋণী।

আপনি যে সময় ছবি তুলছেন সত্যজিত রায়ের সে সময় সমসাময়িক আরও দুজন মানুষ ছবি বানাচ্ছেন। ঋত্বিক ঘটক এবং মৃণাল সেন। তাঁদের সঙ্গে আপনার অভিজ্ঞতা রয়েছে কোনও?

নিমাই ঘোষ: ঋত্বিকের একটি ছবির শুটিংয়ের সময়ই আমি উপস্থিত ছিলাম। 'যুক্তি তক্ক আর গপ্পো'-র কিছু ছবি আমি তুলেছিলাম। ছবি তোলার পর ঋত্বিককে ছবি দেখাতেই আমার জামার কলার ধরে টেনে বললেন, দারুণ ছবি তুলেছ নিমাই। এত জোরে টানলেন যে কলারটা ছিঁড়েই গেল, বুঝলাম খুশি হয়েছেন। এছাড়া ঋত্বিকের সঙ্গে আমার কোনও অভিজ্ঞতা নেই। ব্যাক্তিগতভাবে ঋত্বিকের জীবনযাত্রার সঙ্গে আমার দূরত্ব ছিল।

আপনি তো আদিবাসীদের ওপর বেশ কিছু কাজ করেছেন। সে দিকটায় তেমন আলো পড়েনি।

নিমাই ঘোষ: উপজাতিদের নিয়ে আমি কাজ করা শুরু করি মানিকদার মৃত্যুর পর। তখন কিছুই ভালো লাগত না। একদিন এক ভদ্রলোক এলেন । নাম লক্ষ্মী খিলানি। তাঁর বাড়ি কচ্ছর গান্ধীধামে। তাঁর কাছ থেকেই আমি কচ্ছর উপজাতিদের ব্যাপারে জানতে পারি এবং কাজ করার ব্যাপারে উৎসাহ দেখাই। ভদ্রলোক আমাকে সব রকম সাহায্যের আশ্বাস দিলেন। তারপর আমি কচ্ছ গেলাম ,ছবি তুললাম। আমি তিন বার কচ্ছ গিয়েছি। আলাদা আলাদা সময়ে গিয়ে ছবি তুলেছি। এছাড়াও বস্তার, ওড়িশা অরুণাচল প্রদেশ বিভিন্ন জায়গার আদিবাসিদের ছবি আমি তুলেছি। প্রত্যেকটা জায়গারই তিনটে সিজনের ছবিই আমি তুলেছি।

নিমাই ঘোষের আদিবাসী সিরিজের একটি ছবি। নিমাই ঘোষের আদিবাসী সিরিজের একটি ছবি।

এখন কী কাজ করছেন?

নিমাই ঘোষ: আমি অমৃতসরের গোল্ডেন টেম্পল নিয়ে কাজ করছি এখন। এমন ভাবে গোল্ডেন টেম্পলকে তুলে ধরছি সেভাবে আগে কেউ করেনি। তবে সমস্যা অনেক। শরীরের নানান সমস্যা রয়েছে সবটা এখন আর পেরে উঠি না। কাজটা করতে চাই ভীষণভাবে জানিনা শেষ করতে পারব কিনা।

এই বয়সে এসে কী মনে হয়? না পাওয়া রয়ে গেল কী কী?

নিমাই ঘোষ: আমি আন্তিনিওনির অনেক ছবি তুলেছি, ওঁর বাড়িতে আমাকে নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন আমি শর্ত দিয়েছিলাম আপনাকে ইজেলের সামনে বসতে হবে। উনি আমার কথা রেখেছিলেন। অনেকেই হয়ত জানেন না উনি কত বড় মাপের চিত্রশিল্পী ছিলেন। উনি ইজেলের সামনে বসে ছবি আঁকছেন এছবি খুবই রেয়ার। আমার কাছে আছে।আমি চাই এই শেষ বয়সে এসে ছবিগুলো লোকে দেখুক। তার একটা ব্যাবস্থা হলে খুব খুশি হই। আর একটা বিষয় নিয়ে ভাবলে ভয় করে, আমার যে এত ছবি আমি না থাকলে তার কী হবে? সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে গেলে ভীষণ কষ্ট হবে, এই আর কী।

First published: March 25, 2020, 9:56 PM IST
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर