এখনকার পরিচালক, অভিনেতাদের কোনও পড়াশোনা নেই : খরাজ মুখোপাধ্যায়

Kharaj Mukherjee in 'Antarleen' movie (smoking is injurious to health)

তিনি অপ্রতিহত, তিনি অপ্রতিরোধ্য, তিনি অপরিহার্য্য! তিনি খরাজ মুখোপাধ্যায়। তিনি হিরো নন! কিন্তু একার কাঁধে একটা ছবিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখেন! অবলীলায়, অনায়াসে!

  • Share this:

#কলকাতা: তিনি অপ্রতিহত, তিনি অপ্রতিরোধ্য, তিনি অপরিহার্য্য! তিনি খরাজ মুখোপাধ্যায়। তিনি হিরো নন! কিন্তু একার কাঁধে একটা ছবিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখেন! অবলীলায়, অনায়াসে!

শুধু টলিউড কেন? বলিউডেও তিনি সমান প্রতাপশালী! ‘লাগা চুনরি মে দাগ’, ‘যুবা’, ‘কহানি’, ‘কহানি টু’, ‘মেরে পেয়ারি বিন্দু’...! একের পর এক প্রশংসনীয় অভিনয়! কিন্তু এতবছর ধরে বিরামহীন সাফল্যর পরও তাঁর পা মাটি ছুঁয়ে! তাই তো সাবলীল ভাবে বলতে পারেন-- ''পড়াশোনায় ভাল ছিলাম না। মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে বাবা বলেছিলেন, ‘পরীক্ষাটা যখন দিবিই ঠিক করেছিস, একটু ভাল করেই দে।’ কথাটা মাথায় ঢুকে গিয়েছে। তাই বাংলা, হিন্দি, লো-বাজেট, হাই-বাজেট, সিরিয়াস, এলেবেলে... যে ছবির অফারই আসুক, সিরিয়াস না হয়ে পারি না! বলিউডে ছবির অফার পাচ্ছি বলে আহামরি কিছু হয়নি! পাচ্ছি, তাই করছি। কিন্তু তাই বলে মুম্বই চলে যাওয়ার কোনও পরিকল্পনা নেই।''

আকাশ বেশ মেঘলা। খরাজ মুখোপাধ্যায়ের ম্যাডক্স স্কোয়্যারের বাড়িতে বসেছিল আড্ডা! বাইরের ঘরের সোফায়, কোলে কুশন টেনে গুছিয়ে বসেছেন। পরণে চেক-চেক লুঙ্গি, স্যান্ডো গেঞ্জি! সেদিন ছিল শুক্রবার! বেশ কিছু বাংলা ছবি মুক্তি পেয়েছে! সন্ধেবেলা প্রিমিয়ারের নেমন্তন্ন রয়েছে খরাজেরও! একবার আলগা হাতে ঘড়িটা দেখে নিলেন...!

 আচ্ছে, সত্যি করে বলুন তো, এখনকার ছবি কেমন লাগে? মাঝখানে যেমনটা চলছিল, মানে রাজা চন্দ, রাজীব বা রাজ চক্রবর্তীর মতো পরিচালকেরা শুধুই দক্ষিণী ছবির বাংলা রিমেক বানিয়ে যাচ্ছিল, তার থেকে খানিকটা হলেও সরেছে ইন্ডাস্ট্রি! সৃজিত, কৌশিক (গঙ্গোপাধ্যায়), শিবু (শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়)-র মতো পরিচালকেরা অন্য কনসেপ্টের  ছবি বানাচ্ছে! তবে সত্যি বলতে কী, রাজা চন্দ, রাজীব বা রাজ চক্রবর্তীকে দোষ দিয়ে কী হবে? সেই সময়ে ইন্ডাস্ট্রির একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল 'শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস' (এসভিএফ)-এর। তারা দেখত, ভালই হয়েছে, দর্শক তামিল ছবির বাংলা ভাইপো-কে ভালই চেটেপুটে খাচ্ছে! এটাই চলুক! তবে, এখন দেখছি, ওরাও বুঝতে পেরেছে, স্ট্র্যাটেজি পালটাতে হবে। দর্শক এখন অনেক চালাক হয়ে গিয়েছে। দিগন্তও খুলেছে! ওয়েব সিরিজ, শর্ট ফিল্ম-এর রমরমা বাজার ! টিকতে গেলে বদলাতে হবে! তাই ওরা বছরে যেমন ৫-৬টা আগাগোড়া মশালাদার ছবি করছে, তেমনি অন্য ঘরানার ছবিও বানাচ্ছে।

কিন্তু এই যে প্রতি সপ্তাহে কাঁড়ি কাঁড়ি ছবি মুক্তি পাচ্ছে, লক্ষী তো আসছে না!  '' আসছে না তো! তবে এটা শুধু সিনেমার ক্ষেত্রে না! সব জায়গায়ই দেখবেন, ডিম্যান্ডের থেকে সাপ্লাই বেশি হয়। সেদিন একজন থিয়েটার কর্মীর থেকে শুনলাম, বাংলায় ১০ হাজারেরও বেশি রেজিস্টার্ড নাটকের গ্রুপ রয়েছে। তারমধ্যে কলকাতাতেই প্রায় ৮হাজার! কিন্তু হল তো হাতেগোণা! কী করে অতগুলো গ্রুপ-কে ডেট দেবে?''

তা হলে কী হবে? '' কিচ্ছু হবে না! মেনে নিতে হবে! এর কোনও সমাধান নেই! দোকানে যান, ৭৩রকমের সুটকেস! কোনটা ছেড়ে কোনটা নেবেন? দর্শকেরও তো তাই হচ্ছে! গাদা-গাদা ছবি! কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখবে? তাই সেই মুহূর্তে যেটা দেখতে ইচ্ছে করছে, ঢুকে পড়ছে! ওই ছুটির দিন! সময় কাটানোর জন্য কিছু একটা দেখে নিলেই হল!''

আপনি একজন সিনিয়র অভিনেতা। এই প্রজন্মর পরিচালক, অভিনেতা, টেকনিশিয়ানদের কাজ কেমন লাগে? অনেকেই ভাল! পরিচালক হিসেবে প্রথমেই বলব শিবু (শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়)-র নাম। সৃজিত, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ও খুব ট্যালেন্টেড! কিন্তু বেসিক সমস্যাটা কোথায় বলুন তো? সবাই ভীষণ তাড়ায়! যেন ট্রেন ধরতে হবে! চেবে চিন্তে কাজ করার কালচারটাই চলে গিয়েছে! এই যেমন পদ্মনাভ (দাসগুপ্ত)-কে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কতদিন লাগবে একটা স্ক্রিপ্ট লিখতে? বলবে ৭ দিন! তারপর পরিচালক ১৫ দিনে একটা গোটা ছবি বানিয়ে ফেলবেন! এটা কী হচ্ছে? কোনও হোমওয়র্ক নেই, পড়াশোনা নেই, রিসার্চ নেই! ছবি বানিয়ে ফললেই যেন কেল্লা ফতে! অথচ পরিচালক যখন অডিশন নেন, তখন ব্যারিটোন স্বরে কত বড় বড় কথা! এদিকে কাস্ট করছেন কিন্তু নিজের শালার ছেলেকেই!

মাঝখানে উঠে গিয়ে রান্নার তোড়জোর শুরু করলেন! মেনু--চিংড়ির চচ্চড়ি! মিনিট দুই পর রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন! কফির কাপে চুমুক...! বলে চললেন...

''আরেকটা সমস্যা কী জানেন? সবাই সব মেনে নিচ্ছে! একটা ছোট্ট ঘটনা বলি! পাটায়া-য় শুটিং করছি। প্লিজ পরিচালকের নাম বলতে বলবেন না! আমি শট দিতে এসেছি কালো প্যান্ট পরে। পরিচালক বললেন, আমায় সাদা প্যান্ট পরতে হবে! কিন্তু কোথায় সাদা প্যান্ট? তলব করা হল প্রোডাকশন ম্যানেজারকে! কিন্তু কোথায় তিনি? তিনি শুটিং করতে গিয়েছিলেন, না পাটায়া ঘুরতে, তাই-ই তো বুঝতে পারছিলাম না! অনেকক্ষণ বাদে যখন উদয় হলেন, পরিচালকের দাবি শুনে, মাথা চুলকিয়ে বলেন, ''সাদা প্যান্ট তো নেই! কালোই পরতে হবে!'' পরিচালক খুব হম্বিতম্বি করে বললেন, 'সাদা প্যান্ট-ই লাগবে! নইলে শুটটা হবে না!' উত্তরে ম্যানেজার খুব শান্ত গলায় বললেন, 'একটাই প্যান্ট! কালো! সাদা প্যান্টের বাজেট নেই!' পরিচালকের সব হম্বিতম্বি মুহূর্তে গায়েব! শট-টা কালো প্যান্টেই হল! অথচ ভাবুন, সামান্য একটা প্যান্ট! দাম বড়জোর ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা! তারও নাকী বাজেট নেই! পরিচালক মেনেও নিচ্ছেন! হাসি পায়!''

এত বছরের অভিনয় জীবন! এত শেড-এর, এত জঁর-এর, এত বাঘা-বাঘা চরিত্রে কাজ করেছেন! কিন্তু তাও, এমন কোনও চরিত্র নেই, যেটা করার জন্য আজও অপেক্ষা করে আছেন?  ''চয়েছিলাম তো অনেক কিছুই! 'গুপি গাইন বাঘা বাইন'-এর বাঘা হতে চেয়েছিলাম! কিন্তু হল না! ফাইনালি এখন তো বুড়োই হয়ে গেলাম! 'পরশপাথর'-এর তুলসি চক্রবর্তী হতে চেয়েছিলাম! কিন্তু ওরকম আরেকটা ছবি বানানোর ক্ষমতাই হল না কারও!''

আফসোস হয়? নাহ! রবিদা (ঘোষ) বলেছিল, আফশোস করা মানে দু'পা পিছিয়ে যাওয়া! এগোতে পারবি না! তাই আফশোস করি না!

Published by:Rukmini Mazumder
First published: