তুমি আর কোথায় পেলে সেই আমাকে: দেবদীপ মুখোপাধ্যায়

Photo Source: Facebook

তুমি আর কোথায় পেলে সেই আমাকে: দেবদীপ মুখোপাধ্যায়

  • Share this:

    #কলকাতা:গড়িয়াহাট,মাণিকতলা,হাতিবাগান,গোলপার্ক...বাস-ট্রাম-ট্যাক্সি...সিগন্যাল, রোদ্দুর, জেবরা ক্রসিং, ফুটপাট...

    এলোমেলো চাহনি, কপালের উপর অবাধ্য কয়েকটা চুলের আনাগোনা, ভিড়ের ঠেলায় চশমাটা নাকের ডগায়, আলগোছে হাতটা কী একবার ছুঁয়ে গেল? সিগন্যাল রেড... সাদাকালো ডোরা কাটা পেরিয়ে আলতো পায়ে এগিয়ে যাওয়া......একবার কি ফিরে তাকাল? সিগন্যাল গ্রিন...গাড়ির তাড়া... বলতে না পারা কথা না বলাই থেকে গেল... রাস্তার এপারে একলা মন...

    ক্ষণিকের দেখা, ক্ষণিকের ভাললাগা নিয়েই দেবদীপ মুখোপাধ্যায়ের গান ''তখনও তো তোমার আমার হয়নি আলাপ!'' শহরজুড়ে এখন একটাই গুনগুনানি, ''মেলাচ্ছি তাল তারা লা লালা আলালা লালা লালা লারালা লালা...'' মাত্র কয়েকদিনেই 'হয়নি আলাপ'-এর ইউটিউব ভিউ ৬ লক্ষ ৪২ হাজার ৯৭১! গানের দুনিয়ায় এখন নতুন সেনশেসন দেবদীপ!

    উচ্ছ্বসিত দেবদীপের ভাষায়,

    রাস্তাঘাটে কত মানুষকেই তো দেখি! কতজনকে ভাললাগে! কিন্তু ওই মুহূর্তটুকুই রয়ে যায়! মানুষটা হারিয়ে যায়! এই ভাললাগাগুলোকে সম্বল করেই ২০১৫-এ গানটা লিখেছিলাম। উপল, অনিন্দ্যদার রুফ-টপ কনসার্টে গানটা হিট করে গেল! কিন্তু এর আগেও একবার গেয়েছিলাম। আমার এক বন্ধু তমাল-এর শো 'গানপয়েন্ট'-এ! ভেবেছিলাম, তখনই হয়তো মানুষের পছন্দ হবে! তা বিশেষ হল না! হয়তো রুফ-টপ কনসার্টটাই আদর্শ সময় ছিল!

    শ্যামবাজারের সেন্ট পল্স কেজি অ্যান্ড ডে স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে রবীন্দ্রভারতী ইউনিভার্সিটিতে মিউজিক অনার্স! তারপর? কাঁধে ঝোলা, চলল ভোলা! বাঙালি ছেলের চাকরি! কিন্তু গান যার মনে একবার হুল ফুটিয়েছে, তার কি আর চাকরির গড়পরতা নিয়মে মন টেকে? দেবদীপের ভাষায়, '' চাকরির সঙ্গেসঙ্গে চলতে লাগল আমার প্রথম অ্যালবাম 'স্বপ্ন রঙের মেয়েটা'র রেকর্ডিং! ২০১৪-এ মুক্তি পেল অ্যালবামটা। সত্যি বলতে কী, 'হয়নি আলাপ'-এর থেকে অনেক বেশি খেটে ওই অ্যালবামটা তৈরি করেছিলাম। কিন্তু কোথাও বোধহয় ত্রুটি ছিল! আমার রিয়েলাইজেশন-- অ্যালবামের ভিডিওগুলো খুব ডার্ক! মানুষ আসলে সহজবোধ্য জিনিসই পছন্দ করে।''

    ছোটবেলা থেকেই কি গানে ইন্টারেস্ট? '' না, না!'' দরাজ গলার হাসি... '' ছোটবেলায় মা অনেক চেষ্টা করেছিল, প্রথাগতভাবে গান শেখানোর। কিন্তু মন বসেনি। তখন আমার কাছে গান মানে--পাড়ায় গান বাজলে রাস্তায় নাচ, আর তিনতলায় কাকু বক্স বাজালে খাটে শুয়ে নাচ!''

    Photo Source: Facebook Photo Source: Facebook

    তা হলে? গানের জগতে এলেন কীভাবে?

    সেটা ক্লাস সেভেনের ঘটনা। একদিন আমার এক বন্ধু টেবিল বাজিয়ে শিলুদা (শিলাজিৎ মজুমদার)-র একটা গান শোনাল--'জোনাকিটা জ্বলছিল'! মজা পেলাম। ওর থেকেই ক্যাসেটটা নিয়ে গানটা শুনলাম। তারপর একে একে সুমন চট্টোপাধ্যায়, অঞ্জন দত্ত, ফসিলস, চন্দ্রবিন্দু থেকে মান্না দে! হাতের কাছে যা পেতাম, শুনতাম! পাশাপাশি, 'ও আকাশ, তুমি নীল, কেন নীল' টাইপের গান লেখাও শুরু হয়ে গিয়েছে! এই করতে করতে ক্লাস টুয়েলভ! নিজেকে অলরেডি রকস্টার ভেবে ফেলেছি! কিছু হলেই গান গেয়ে ফেলছি! শিলুদার ডাইহার্ট ফ্যান! ভীষণ বেসুরে গলায় গানও শুনিয়ে দিয়েছিলাম শিলুদাকে!

    Photo Source: Facebook Photo Source: Facebook

    তারপর?

    তখন ঠিক উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আগে। টেস্ট পরীক্ষা শেষ হয়েছে। স্টাডি লিভ চলছে। জানতে পারলাম শিলুদা একটা শো করছে-- 'বিষ'। পৌঁছে গেলাম শিলুদার কাছে। বায়োলজি, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রির প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস বাঙ্ক করে চলতে লাগল গানের রিহার্সাল। আর তখনই বুঝতে পারলাম, আমার গলায় সুর লাগে না! তা যাই হোক! শো-টা খুব ভাল ভাবেই হল! পরের দিন ছিল ফিজিক্স প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা! প্রিজমের মধ্যে দিয়ে আলোর রশ্মি দেখতে দেখতে ঘুমিয়েই পড়েছিলাম!

    বাবা মায়ের ইচ্ছে ছিল কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়বে দেবদীপ! কিন্তু দেবদীপের মনে তখন যেদ-- গানটা শিখতেই হবে! '' এই যেদ থেকেই রবীন্দ্রভারতীতে ভর্তি হলাম। কারণ, তারআগেই শিলুদা তাড়িয়ে দিয়েছিল বেসুরো গাই বলে। গান শেখা চলছে। চলছে গান লেখা। ইউনিভার্সিটিতে এক বান্ধবীর জন্মদিনে উপহার দিলাম 'প্রিয় গান'!''

    আর 'স্বপ্ন রঙের মেয়েটা' কে? ''আমার ছোটবেলাকার প্রেম! ১৩ বছর অপেক্ষাও করেছিলাম ওর জন্য।''

    এখন পর্যন্ত কতগুলো প্রেম করেছেন? ''অনেক! তবে, এখন সিরিয়াস প্রেমে! সংহিতার সঙ্গে। একটা বেসরকারি ইউনিভার্সিটির শিক্ষিকা সংহিতা।''

    Photo Source: Facebook Photo Source: Facebook

    আপনি তো শিলাজিতের ব্যান্ডে গিটারিস্ট ও ভোকালিস্ট। শিলাজিৎ সেলেব্রিটি! আপনিও এখন লাইমলাইটে এসেছেন! কখনও মনে হয় না, শিলাজিতের পাশে আপনি চাপা পড়ে যাচ্ছেন?

    যখন মিউজিক করি, খালি ওটার নেশাতেই বুঁদ হয়ে থাকি! অন্যকিছু মাথায় আসে না! অফকোর্স শিলুদা অনেক বড় নাম! কিন্তু আমি শিলুদার পাশে থেকে কতটা মাইলেজ পাচ্ছি, আদৌ পাচ্ছি কিনা, এসব নিয়ে ভাবি না! আমি যতটা প্যাশন নিয়ে একটা নোড বাজাই, ততটা প্যাশন নিয়েই ১০০টা নোট বাজাই।

    নিজের ব্যান্ড তৈরি করার কথা ভাবেন না? যেখানে আপনিই লিড? '' ভেবেছি! নিজের ব্যান্ড খুলেওছিলাম। কিন্তু নিয়মিত শো পাওয়া খুব মুশকিল। আর সেক্ষেত্রে ব্যান্ডটা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া খুব কঠিন। কারণ, অ্যাট দ্য এন্ড অফ দ্য ডে, টাকাটা দরকার!''

    একসময় এক বান্ধবীর ইচ্ছে ছিল অ্যাস্ট্রোনট হবে। সেই শুনে দেবদীপও ভেবেছিলেন, অ্যাস্ট্রোনট হবেন! সেখান থেকে, সম্পূর্ণ উলটো মেরুতে-- গানের জগৎ! প্রথম দিকে বাবা-মায়ের আপত্তি ছিল, কিন্তু তাঁরাও এখন খুশি। জোরকদমে চলছে নতুন গান, ''যতটা স্বপ্ন মনে থাকে'র কাজ!

    photo source: facebook photo source: facebook

    খানিকটা ইমোশনাল হয়ে পড়লেন 'হয়নি আলাপ'স্টার...

    খুব কষ্ট করে 'স্বপ্ন রঙের মেয়েটা' রেকর্ডিং করেছিলাম। তখন অল্প বয়স, পুঁজি কম! যে মিউজিক কোম্পানিতে সিডি জমা দিয়েছিলাম, তারা কিছুদিন বাদে বলেছিল, কপিটা হারিয়ে ফেলেছে। আরেকটা কপি দিলাম। তারও বেশ কয়েক মাস পরে যোগাযোগ করতে বলেছিল, ওই কপিটাও নাকি হারিয়ে ফেলেছে! শেষমেশ নিজেই শিলুদা-র বাড়িতে ৩০ কপি সিডি রিলিজ করেছিলাম। সেখান থেকে আজ! লোকে এখন আমার গান গাইছে, আমায় নিয়ে জানতে চাইছে... সত্যি, কী বলব! জানি না! ভাষা হাতড়াচ্ছি!

    'হয়নি আলাপ' শুনতে ক্লিক করুন-

    আরও পড়ুন-ট্রেন্ডসেটার দীপিকা এবার সুপারহিরোর চরিত্রে
    First published: