কয়েক বছর ধরে মৃত্যুকে সহজ করে নিতে চেয়েছিলেন সৌমিত্র?

এখনও মেঘ জমে আছে মনের কোণে। যে মানুষটিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি বাংলা সিনেমার পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠ।

এখনও মেঘ জমে আছে মনের কোণে। যে মানুষটিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি বাংলা সিনেমার পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠ।

  • Share this:

    শর্মিলা মাইতি #কলকাতা: কী নিয়ে যেতে চান পরপারে? না কি শূন্য হাতের চলে যেতে চান? এখনও মেঘ জমে আছে মনের কোণে। যে মানুষটিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি বাংলা সিনেমার পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠ।

    সুষ্পষ্ট সচেতন উত্তর এসেছিল, গমগমে ভরাট সৌমিত্রকণ্ঠে।  নেব অভিধান, আর আবোলতাবোল। সুকুমার রায়ের আবোলতাবোল। যাতে লেখা আছে, আদিম কালের চাঁদিম হিম / তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম। জীবনের সব কাজ সারা হলে সন্ধ্যার পথে হেঁটে যাওয়ার মন্ত্র।

    মন থেকে কি অনেক আগেই পরপারের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন  সৌমিত্র । মৃত্যু অমোঘ সত্য বলেই কি সহজ করে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন মনে মনেই? অভিনয়ে যত ডুব দিয়েছেন, ততই যেন প্রশস্ত হয়েছে সেই দর্শন। শেষ অধ্যায়ের প্রতিটি ছবিই তার নিদর্শন। পার্কে বসে ছানাদাদু যখন চাঁদুর সঙ্গে কথোপকথনের সময়ে বলে ওঠে স্বগতোক্তির মতো করে, "এ শহরটা ক্রমশ এক বৃদ্ধাবাস হয়ে উঠছে... '' কিংবা পোস্তর দাদু যখন কাঠগড়ায় আত্মসমর্পণ করে, ভেঙে পড়ে অসহায়ের মতো বলে ওঠেন, "এই যে ওরা চলে যাচ্ছে, আমি জানি ওরা আর কখনও ফিরবে না। " যে হৃদয়বিদারী আর্তনাদ সেই কথাক'টির মধ্যে ছিল.. কত শত দুঃখ বেদনা পেরলে তবেই এমন আবেগের মন্থন হয়! বয়স হলে নীরবতার রং লাগে মানুষের জীবনে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও কি সেই নৈঃশব্দই সযত্নে লালন করছিলেন, যার নাগাল কারওর পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। না, পরজন্মে কখনও বিশ্বাস করতেন না তিনি। কিন্তু এটা মনেপ্রাণে মানতেন, জীবনের ইচ্ছাপত্রে যদি লেখা থাকে বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিত্বের নাম, যাদের বড় দেখতে  ইচ্ছা করে, মরণের পর তাদের সঙ্গে উপরে গিয়ে দেখা হবেই। ইচ্ছা ছিল, সবার আগে বাবার সঙ্গে দেখা করবেন। তার পর মানিকদা। সত্যজিত রায়। 1992 সালে সত্যজিতের মৃত্যুর পর থেকেই তিনি বুঝেছিলেন এ কত বড় কঠিন সত্য। এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, তৃতীয় নম্বর যে ব্যক্তির নাম লেখা আছে, তিনি শিশির ভাদুড়ি।  সৌমিত্রের নাট্যগুরু। যাঁর কাছে হাতেখড়ি। ইচ্ছা ছিল দেখা করবেন রবি ঘোষের সঙ্গেও। আর দেখা করতে চেয়েছিলেন সেই প্রাণপুরুষের সঙ্গে। যিনি তাঁর নিত্যদিনের মানসসঙ্গী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বলেছিলেন, আহা যদি তার সঙ্গে একবার দেখা হতো... আজ কি সেই স্বর্গধামে একের পর একমাত্র সঙ্গে তাঁর ইচ্ছাপূরণ হচ্ছে। দীর্ঘ চল্লিশ দিন মৃত্যুর সঙ্গে তিন পাত্তি খেলার সময়ে কী বদলেছিল তাঁর ধ্যান ধারণা। না কি প্রবল শারীরিক যন্ত্রণাই বিদ্ধ করছিল তাঁকে।... মৃত্যু অনিবার্য। আমরাও তা বিস্মৃত হয়েছিলাম। চমক ভাঙল সংবাদে। 15 নভেম্বর দুপুর 12.15। এই বিষময় বছরে বাংলা সিনেমা সম্পূর্ণরূপে অনাথ হল। চলে গেলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

    Published by:Akash Misra
    First published: