corona virus btn
corona virus btn
Loading

‌পানশালা, রেস্তোরাঁ, পার্ক, যেন ইতিহাস হয়ে গিয়েছে! আতঙ্কের মার্কিন মুলুক থেকে লিখলেন শুভ্রজ্যোতি‌

‌পানশালা, রেস্তোরাঁ, পার্ক, যেন ইতিহাস হয়ে গিয়েছে! আতঙ্কের মার্কিন মুলুক থেকে লিখলেন শুভ্রজ্যোতি‌

মানুষ হিসেবে আমি ভীষণরকম আশাবাদী হলেও পরিস্থিতির গম্ভীরতা সুস্থির চিন্তার প্রবাহকে বারংবার প্রতিহত করছে। এখন অনির্দিষ্টকালের অপেক্ষা, আবার সব কিছু স্বাভাবিক হওয়ার আগে।

  • Share this:

#বস্টন: প্রিয়জনদের বিদায় জানিয়ে গত ২৭শে জানুয়ারি মাঝরাতে যখন সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে কলকাতা বিমানবন্দর থেকে রওনা দিলাম তখনও আগামী বিপর্যয়ের সামান্যতম আভাসটুকু ছিল না। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির জীবপ্রযুক্তিবিদ্যা শাখায় ম্যালেরিয়া নিয়ে উচ্চতর গবেষণার আহ্বান পেয়েই আমার বস্টনে আসা। পৌঁছনোর পর থেকে গবেষণাগারের যাবতীয় দায়িত্ব সম্পর্কে নিজেকে ওয়াকিবহাল করার সাথে সাথে দ্রুত নতুন পরিবেশ, পরিস্থিতি ও মানুষজনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, স্থায়ী বাসস্থানের খোঁজখবর করা, সবই এগোচ্ছিল পরিকল্পনামাফিক। পৃথিবীজুড়ে সমান্তরাল গতিতে এগোচ্ছিলো করোনার সংক্রমনও। চিনের উহান শহরের করোনা ভাইরাসের ইতিবৃত্ত তখন সবার পিৎজা-বিরতির আলোচ্যবিষয়। যদিও সিয়াটেলে আমেরিকার সর্বপ্রথম করোনা আক্রান্তের খবর আসে একেবারে ফেব্রুয়ারির দোরগোড়ায় তা সত্ত্বেও কেউই সে বিষয়ে মাত্রাতিরিক্ত মাথা ঘামাননি। একে একে ক্যালিফোর্নিয়া, নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সি, মেরিল্যান্ড, ফ্লোরিডাতেও পাওয়া গেলো সংক্রামিতের খবর। ভয়ের কারণটা ঘটলো আরও প্রায় একমাস পর।

দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার, ১২ই মার্চ। জানা গেল বস্টনে, কেমব্রিজের এক প্রসিদ্ধ ঔষধ প্রস্তুতকারক সংস্থার এক সম্মেলনে উপস্থিত ৭৭ জনের দেহে সংক্রমণের হদিশ মিলেছে। অনতিবিলম্বে এমআইটি কর্তৃপক্ষের একের পর এক ই-মেইল আসছিল আমাদের কাছে। খবর এলো হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় সমস্ত আবাসিকদের হস্টেল খালি করার নির্দেশ দিয়েছে। চার্লস নদীর ধার ঘেঁষে একটা চাপা অস্বস্তি ক্রমশই ভীড় জমাচ্ছিল। ইনস্টিটিউট থেকে জানানো হলো অত্যাবশ্যক গবেষণার কাজগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মস্থলে কাজের সুরক্ষা যথাসম্ভব সুনিশ্চিত করার। স্নাতক স্তরের পঠনপাঠন তার আগেই স্থগিত করা হয়েছিল। 'স্প্রিং ব্রেক'–এর সাপ্তাহিক ছুটি চলতে থাকায় প্রথম থেকেই পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রনেই ছিল। গবেষণাগারের সতীর্থদের সহায়তায় যথেষ্ঠ তৎপরতার সাথেই চলতে থাকা যাবতীয় বৈজ্ঞানিক পরিক্ষানিরীক্ষাগুলির গতিবিধি নিয়ন্ত্রিত হল। তবুও প্রতিদিনই আসতে হচ্ছিল ল্যাবে। এখানে সাধারণত সকাল সাতটা থেকে ন'টার মধ্যেই লোকজন নিজনিজ কর্মস্থলে পৌঁছনোর চেষ্টা করেন। ফেরার ভিড়টাও বিকেল চারটা-ছ'টার মধ্যে। ব্যস্ত সময়ের মেট্রোয় ভিড় কলকাতার মতো না হলেও সহযাত্রীর কনুইয়ের অসতর্ক ধাক্কা খাওয়াটা অসম্ভব নয়। আমার সাউথ বস্টনের বাড়ি থেকে ইনস্টিটিউট মিনিট কুড়ির একটা নাতিদীর্ঘ মেট্রোরেলের যাত্রা। কিন্তু করোনার আতঙ্ক এতটাই ঘিরে ধরেছিল যে প্রতিদন ট্রেনের মধ্যের ওই সময়টুকুও অফুরন্ত অনুভূত হতে লাগলো। অগত্যা আমি আমার ল্যাব সুপারভাইজারের সম্মতি নিয়ে ঘরে বসে কাজের সিদ্ধান্ত নিলাম। আমাদের ইনস্টিটিউট বন্ধ হল আরও পাঁচ দিন পর।

আজ আমার গৃহবন্দী দশার ৫৩–তম দিন। সূর্যের আলো শুধু জানলা দিয়েই দেখারই সাহস হয়। জোরালো শীত চলায় গোটা ফেব্রুয়ারিতে বাড়ি থেকে ইনস্টিটিউটের পথ ছাড়া আর বেশি কিছু ঘুরে দেখার সাহস করিনি। এক রোববার বস্টন বেদান্ত সোসাইটি যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। ফেরার পথে হার্ভার্ড ব্রিজ দিয়ে চার্লস নদী পেরোচ্ছিলাম। দেখছিলাম বিভিন্ন বয়সের অসংখ্য মানুষজনের প্রাণশক্তির উচ্ছ্বলতা। হেঁটে, দৌড়ে দৈনন্দিন শরীরচর্চা সারছিলেন সবাই। সময় এত তাড়াতাড়ি রং বদলাবে সেটা আঁচ করাটা সেই মুহূর্তে দুঃসাধ্য ছিল যে কারওর পক্ষেই। আর বারকয়েক গিয়েছিলাম হার্ভার্ড স্কোয়ারে। মনে পরে সেইখানের অস্থায়ী ফুড ট্রাকগুলো ঘিরে অসংখ্য পড়ুয়াদের আনাগোনা ও কোলাহলমুখর সমাগম। বসন্তের উপস্থিতিতে এখন হার্ভার্ড ইয়ার্ডের গাছপালাগুলোও নিশ্চই শীতের জড়তা কাটিয়ে রঙিন হয়ে উঠেছে। ঘরে বসে সেই মনোরম পরিবেশের স্পর্শ উপলব্ধি করাটা একটু হলেও কঠিন। আমাদের বাড়ির ঠিক পাশেই, রাস্তার উপরের নাম না জানা গাছটাকে কে যেন গোলাপি ভেলভেটের চাদরে মুড়ে দিয়েছে। বসন্ত এসেছে। অনেকক্ষণ চেয়ে থাকলে ঘরবন্দিদশার আলস্য ও একাকীত্বকে কিছুটা সময় পাশকাটানো যায়। এখনও রাস্তায় মাস্ক পরিহিত লোকজন দেখা যায়, যদিও হাতেগোনা। গভর্নমেন্টের লকডাউন নির্দেশিকায় অত্যাবশ্যক পরিষেবাগুলি ছাড়াও শরীরচর্চা ও পোষ্য নিয়ে ভ্রমণকে ছাড় দিয়েছে। কিছুদিন আগেরও সেই কোলাহলমুখর পানশালা, রেঁস্তোরা, পার্কগুলোকে কেমন প্রাগৈতিহাসিক লাগে। অনলাইনে খাবার আনাচ্ছি বেশ কিছুদিন যাবৎ। সব জিনিস নিয়মিত পাওয়াও যাচ্ছে না সরবরাহের অপ্রতুলতার কারণে। জোড়াতালি দিয়ে চালানো ছাড়া গত্যান্তর নেই। বাইরে থেকে আসা সমস্ত প্লাস্টিকের মোড়কগুলো জীবাণুনাশকের সাহায্যে পরিষ্কার করে নিতে হচ্ছে বারবার। পড়াশোনা চালানোর সাথে সাথে গৃহকর্মে নিপূন হওয়াটাই মনে হয় লকডাউনকালে সবচেয়ে অপরিহার্য পাঠ। বাইরে বেরোনো বন্ধ, তাই ইন্টারনেটই বাইরের পৃথিবীর সাথে একমাত্র সংযোগমাধ্যম। মা-বাবা-দাদার সান্নিধ্য, ল্যাব মিটিং, কাছের মানুষদের সঙ্গে আড্ডা, বিশ্বের খবরাখবর রাখার ওই একমাত্র জানালা। অবশ্যই একটা প্রবল অচলাবস্থার মাঝে দাঁড়িয়ে আছি।

একটা উৎকন্ঠা তাড়া করছে সবসময়ই, সেটা দেশে থাকা প্রিয়জনদের শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করাই হোক বা ব্যক্তিগত কর্মজীবনে সৃষ্টি হওয়া দোলাচলই হোক। সমস্ত প্রতিষ্ঠানেই বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য অত্যাবশ্যক উপকরণ হলো গবেষণাখাতে বরাদ্দ তহবিল। আর তার সাথে রয়েছে প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট প্রতিচিত্র। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই বরাদ্দ সংক্ষেপন একটা অনতিদূর ভবিষ্যৎ মাত্র। আমরা যারা সীমিত সময়ের ভিসা নিয়ে গবেষণার জন্য এসেছি, তাদের সেই ভিসার নবীকরনের সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন থাকছে। যার জেরে গবেষণার জন্য প্রস্তাবিত সময় নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে বাধ্য। রোগ মোকাবিলা, বেকারত্বের সম্ভাবনা প্রতিহত করা, দৈনন্দিন খাদ্যসামগ্রী মজুত করা সবকিছুই ডারউইনের ‘‌যোগ্যতমের উদ্বর্তন' তত্ত্বকে বার বার মনে করতে বাধ্য করছে। তাই সর্বোপরি যেই কাজের জন্য আমার এখানে আসা, সেই গবেষণার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকার অবিরত প্রয়াসও চালিয়ে যেতে হচ্ছে। কিছুদিন আগেই খবর এলো গোটা দেশ জুড়ে আমেরিকান নাগরিকরা লকডাউনের প্রতিবাদে সামিল হচ্ছেন। তাদের কর্মসূচি ঠিক না ভুল সেইটা সময়ই বলবে। তবে ম্যাসাচুসেটসের স্বাস্থ্যদপ্তর ক্রমাগত বিবিধ বিধিসম্মত নির্দেশিকা জারি করছে নাগরিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করার জন্য। যখন লিখতে বসছি তখনও সরকারিসূত্রে গোটা রাজ্যে করোনা সংক্রমণে মৃতের সংখ্যা চার হাজার ছাড়িয়েছে। শুধু বস্টন শহরেই একা আক্রান্তের সংখ্যা নয় হাজারের উপর। যদিও ঘন্টা চারেক দূরত্বের নিউ ইয়র্ক শহরের অধিবাসীরা এই মারণব্যাধির তীব্রতার সাক্ষী হয়েছেন তবুও বলব স্পেন ও ইতালির মত ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার এখনও হয়নি এই রাজ্য।

যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশুনার পাট চুকিয়ে যখন ভারতীয় রাসায়নিক জীববিজ্ঞান সংস্থা (আই আই সি বি) তে গবেষণার কাজে যোগ দিয়েছিলাম তখন থেকেই ইচ্ছা ছিল উচ্চতর গবেষণার জন্য কোনো আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার। ইচ্ছেপূরণ হওয়ার আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সুযোগ মিলছে না আপাতত। সৌভাগ্যক্রমে আইআইসিবি-র বেশ কয়েকজন সহকর্মী ও বন্ধু শহরের এপাশ ওপাশে ছড়িয়ে আছেন এবং তাদের উপস্থিতিই এই দুঃসময়ে একটু হলেও ভরসা জোগাচ্ছে। রোগমুক্তির ক্ষেত্রেও আশার আলো দেখাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকের দল। করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে মানবশরীরে পরীক্ষার পাশাপাশি 'রেমডেসভির' নামক ওষুধের ব্যবহার হচ্ছে আক্রান্তের শরীরে 'ভাইরাল লোড' কমাতে। চিকিৎসায় সাড়াও মিলছে। ফেডারেল গভর্মেন্ট আমেরিকান নাগরিকদের মনোবল বৃদ্ধির চেষ্টায় 'স্টিমুলাস চেক' ও বিলি করছে। তবুও আগামীদিনে অনুনোপেক্ষণীয় বেকারত্বের অশনিসংকেত থেকেই যাচ্ছে। মানুষ হিসেবে আমি ভীষণরকম আশাবাদী হলেও পরিস্থিতির গম্ভীরতা সুস্থির চিন্তার প্রবাহকে বারংবার প্রতিহত করছে। এখন অনির্দিষ্টকালের অপেক্ষা, আবার সব কিছু স্বাভাবিক হওয়ার আগে।

শুভ্রজ্যোতি সাহা (‌গবেষক)‌

First published: May 7, 2020, 3:04 PM IST
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर