এসি অডিটোরিয়ামে 'আগুনের পরশমণি', পিজির উডবার্ন দেখাল অন্যরকম টিকাকরণ!

আলো দেখাচ্ছে প্রশাসনিক সদিচ্ছা... ছবি : সংগৃহিত

স্মার্ট ডিভাইসে চলছে 'আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে' অথবা 'আমি কান পেতে রই'... শুনতে শুনতেই ডাক পাবেন, ভ্যাকসিনের (Corona Vaccination)| ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শ মেনে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ঘরে ফিরতে পারেন 'অনেক হ্যাপা' না পুইয়েই।

  • Share this:

#কলকাতা : মে মাসের শুরু থেকেই রাজ্যে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছে বেসরকারি উদ্যোগে টিকাকরণ (Corona Vaccination)| এদিকে দ্বিতীয় দফার টিকাকরণে যাঁরা কোভিশিল্ড অথবা কোভ্যাকসিনের প্রথম ডোজটি নিয়ে ফেলেছিলেন মার্চের মাঝামাঝি বা শেষে, তাঁরা পড়েন আতান্তরে। প্রথম ডোজ হয়তো নিয়েছেন বাড়ির পাশের বেসরকারি হাসপাতালে। দ্বিতীয় ডোজ নিতে ফোন করে জানছেন সেখানে আর ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে না।

প্রাথমিক একটা ধাক্কা লেগেছিলো টিকা প্রত্যাশীদের অনেকেরই| একে চাহিদার তুলনায় টিকার অপ্রতুলতা| তার ওপর 'সরকারি গেড়োয় পরে শেষ পর্যন্ত টিকা পাব তো?'-- এই মানসিকতা| বেশ খানিকটা সংশয় ঘিরে ধরেছিল শহরবাসীকে| যাঁরা বেশিরভাগই প্রায় সিনিয়র সিটিজেন। সর্বত্রই একটা উৎকন্ঠা গ্রাস করছিল টিকা প্রত্যাশী ও তাঁদের পরিবারকে| তবে ছবিটা কিন্ত বদলেছে পক্ষকাল যেতে না যেতেই| আর সেই বদলে যাওয়া ছবিই দেখা গেল এস এস কে এম (SSKM Hospital) হাসপাতালে উডবার্ন ব্লক থেকে শুরু করে সল্টলেকের বোরো অফিসে|

উডবার্ন ব্লকে চলছে দ্বিতীয় ডোজের টিকাকরণ ছবি : সংগৃহিত উডবার্ন ব্লকে চলছে দ্বিতীয় ডোজের টিকাকরণ
ছবি : সংগৃহিত

শহরের প্রাণকেন্দ্রের ঐতিহ্যবাহী এস এস কে এম হাসপাতাল চত্বর। গত ৩ মে থেকে এখানে শুধুমাত্র কোভিড ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজটি দেওয়া হচ্ছে। আগে এসে রেজিষ্ট্রি করিয়ে নাম নথিভুক্ত করতে হবে। তার জন্য প্রাথমিক লাইন দেওয়ার পর একটি বিশাল অডিটোরিয়ামে পৌঁছবেন ভ্যাকসিন প্রার্থী| শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে বসার সুন্দর বন্দোবস্ত সেখানে| শীততাপনিয়ন্ত্রিত সেই হল ঘরেই অপেক্ষা করতে হবে আপনার নাম ডাকা পর্যন্ত| আর সেই ফাঁকে আপনাকে সঙ্গ দেবে রবি ঠাকুরের গান। কখনও শ্রীকান্ত আচার্য কখনও লোপামুদ্রা কিম্বা শ্রাবণী সেন|

অপেক্ষায় সঙ্গে আছেন কবিগুরু... অপেক্ষায় সঙ্গে আছেন কবিগুরু...

স্মার্ট ডিভাইসে চলছে 'আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে' অথবা 'আমি কান পেতে রই'... শুনতে শুনতেই ডাক পাবেন, ভ্যাকসিনের| ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শ মেনে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ঘরে ফিরতে পারেন 'অনেক হ্যাপা' না পুইয়েই। এভাবেই ভ্যাকসিন নিলেন তথ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রে চাকুরিরত জয়ন্ত দত্ত মজুমদার। প্রথম ডোজ নিয়েছিলেন দক্ষিণ কলকাতার বেসরকারি হাসপাতালের ঝা চকচকে পরিবেশে। দ্বিতীয়টি নিতেই পিজিতে আসা। গোটা ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত সন্তুষ্ট জয়ন্তর কথায়, "অনেকেই শুনলাম ভোর পাঁচটা থেকে লাইন দিয়েছেন। কিন্তু আমার মনে হয় না সেটার প্রয়োজন আছে। সুবিধেমতো বরং একটু হাতে সময় নিয়ে আসাই ভাল। খুব বেশিক্ষণ যে সময় লাগছে তা কিন্তু নয়।"

ছবিটা এক না হলেও বেশ শান্তিপূর্ণভাবেই ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজটি নিলেন ষাটোর্ধ ঘোষ দম্পতি। সকাল ১০টা ৫ নাগাদ রবীন্দ্র সরোবর লেক কালীবাড়ির উল্টোদিকে বোরো অফিসের হেলথ সেন্টারে পৌঁছে দেখলেন মাত্র ৫ জনের লাইন। স্বাস্থ্য কর্মীদের প্রাথমিক মৌখিক জিজ্ঞাসাবাদের পরেই মিনিট তিনেকেই হাতে পেলেন ভ্যাকসিন নেওয়ার কুপন। টোকেন নম্বর দিয়ে বলা হল সাড়ে এগারোটার পরে আসতে। সেইমতো গিয়ে মাত্র ঘণ্টা দেড়েকেই বাড়ি ফিরলেন স্বামী-স্ত্রী। টিকা নিয়ে হাসিমুখে।

একইভাবে ভ্যাকসিন দেওয়া চলছে সরকারি তালিকামাফিক ঢাকুরিয়া, মুকুন্দপুর থেকে সল্টলেকের বোরো অফিসগুলিতেও। মুকুন্দ পুরের মুকুন্দ ভবনে দুদিনের চেষ্টায় কোভ্যাক্সিনের দ্বিতীয় ডোজ নেওয়া ৭৫ বছরের বৃদ্ধাও তাই দিনশেষে খুশিই। এত বড় কাজে এটুকু সমস্যা হতেই পারে বলেই মনে করেন তাঁর মত লাইনে অপেক্ষারত আরও অনেক 'সিনিয়র সিটিজেন'।

ইতিমধ্যেই রাজ্যে করোনা পরিস্থিতি দেখে ১৬ মে রবিবার থেকে আগামী ৩০ মে পর্যন্ত কার্যত লকডাউনের পথে হেঁটেছে রাজ্য সরকার। আর সেক্ষেত্রে টিকাকরণের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম চালু করে বিভিন্ন দফতরকে আলাদা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সুষ্ঠু টিকাকরণের জন্য। বিজ্ঞপ্তি জারি করে রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, সাধারণ মানুষের টিকা পাওয়ার বিষয়টি দেখভাল করবে স্বাস্থ্য দফতরের অধীনে থাকা হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকরা। অন্য দিকে, যাঁদের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ানোর বেশি সম্ভাবনা রয়েছে, সেই মানুষদের টিকা দেওয়ার বিষয়টি দেখবে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। বিষয়টি জেলাশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেই জানানো হয়েছে।

টিকার আকাল রয়েছে। কারণ ভ্যাকসিনের চাহিদা অনুযায়ী জোগান নেই এখনও। প্রশাসনিক স্তরে কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা থাকলেও ক্রমশ সে জট খুলবে বলেই মনে করছেন শহরবাসী। আর আশায় বুক বাঁধছেন ছোট খাটো সমস্যা এড়িয়ে ১৮ উর্ধরাও নিশ্চই টিকা পাবেন আগামী সপ্তাহ থেকেই। আর আশার সেই আলোটুকু দেখাচ্ছে প্রশাসনিক সদিচ্ছা।

সংযুক্তা সরকার

Published by:Sanjukta Sarkar
First published: