Home /News /coronavirus-latest-news /
‘‘ক্রমশ বাড়ছে মৃতের সংখ্যা, এই বন্দিদশার শেষ কবে জানা নেই’’

‘‘ক্রমশ বাড়ছে মৃতের সংখ্যা, এই বন্দিদশার শেষ কবে জানা নেই’’

শুধু ভাবছি ভারতে একবার কমিউনিটি স্প্রেড হলে অবস্থাটা কী হবে । আমরা এখানে স্টুডেন্স কমিউনিটিতে থাকি, সেখানে আমাদের চারপাশের কয়েকজনের পজেটিভ রিপোর্ট এসেছে। অ্যারিজোনা থেকে লিখছেন সৃজিতা সেনগুপ্ত ।

  • Share this:

    #অ্যারিজোনা: আমরা যেখানে থাকি অ্যারিজোনা, সেখানে তুলনামূলক ভাবে আক্রান্তের সংখ্যা কম হলেও, গ্রাফ এখনো পর্যন্ত সবসময়ই উর্ধ্বমুখী । অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির হেলথ সেন্টারে পরীক্ষা করে পনেরো জন স্টুডেন্টের কোভিড পজিটিভ ধরা পড়ে । স্বভাবতই, কলেজ টাউন এলাকায় একটা স্বাভাবিক চাপা আতঙ্কের রেশ স্পষ্ট । বিশেষত অনেক ছাত্র-ছাত্রী এখনও হস্টেল ডর্মিটরিতে রয়েছে । তাছাড়া, কেমিস্ট্রি, বায়োলজির মতো কিছু ডিপার্টমেন্টের রিসার্চ ল‍্যাব এখনও খোলা থাকছে, কারণ তাঁদের গবেষণার কাজ ল‍্যাব-এক্সপেরিমেন্ট ছাড়া বাড়ি বসে করা নিতান্তই অসম্ভব । বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সমস্ত অ্যাপার্টমেণ্টের জিম, সুইমিংপুল, বাস্কেটবল কোর্টের অ্যাকসেস । তবে অ্যারিজোনাতে পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ব‍্যবহার কম হওয়ায় কমিউনিটি স্প্রেড রুখতে খানিকটা হলেও সাহায্য হয়েছে । সরকারিভাবে এখানে 'স্টে অ্যাট হোম' নির্দেশ জারি হয়েছে ৩১শে মার্চ, অর্থাৎ কেউ আপৎকালীন প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে বেরোতে পারবেন না ।

     এমনিতেই অ্যারিজোনা ফাঁকা ফাঁকা । আর এখন দেখে মনে হবে না এখানে মানুষ থাকে ।
    এমনিতেই অ্যারিজোনা ফাঁকা ফাঁকা । আর এখন দেখে মনে হবে না এখানে মানুষ থাকে ।

    জানুয়ারির মধ‍্যভাগে আমেরিকায় ফেরত আসার সময় পোর্ট অফ এন্ট্রির এয়ারপোর্টে করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত একটা সতর্কবার্তা চোখে পড়েছিল । প্রাথমিকভাবে চিনের উহান প্রদেশ থেকে আগত কোনও যাত্রীর কোনোরকম রোগের লক্ষণ দেখা দিলে তাঁকে অবিলম্বে ডাক্তারের দ্বারস্থ হতে বলা হয়েছিল । তখনও সেভাবে স্ক্রিনিং শুরু হয়নি । সম্ভবত সকলেরই কল্পনাতীত ছিল এই রোগটা একটা বিশ্বব‍্যাপী মহামারীর আকার ধারণ করতে পারে । প্রশাসন থেকে জণগন - সর্বক্ষেত্রেই তৎপরতা দেখা দেয় মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনঘনত্বের একটা বিরাট অংশ অন্য দেশ থেকে আগত অভিবাসী মানুষেরা । ফলত এই দেশে যে একটা সার্বিক প্রভাব পড়তে পারে, তা অনিবার্য ছিল ।

     সুপারমার্কেট গুলোর হাল এরকমই ।
    সুপারমার্কেট গুলোর হাল এরকমই ।

    মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে একে একে বিভিন্ন বিদেশী নাগরিকদের আমেরিকায় প্রবেশ কিছু দিনের জন্য স্থগিত ঘোষণা হয় । প্রথমে চিন, ইরান ও ছাব্বিশটা ইউরোপীয় দেশ । দ্বিতীয়ভাগে ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ড । তবে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র বিদেশী নাগরিকদের জন্যেই । এদেশীয় কোনো নাগরিকের জন্যে সর্বদাই অবারিত দ্বার, তাঁরা চাইলে দেশে ফিরতে পারেন, কিন্তু দেশের নির্দিষ্ট তেরোটা এয়ারপোর্ট দিয়েই ঢোকা যাবে এবং মানতে হবে ১৪ দিনের 'সেল্ফ কোয়ারেন্টাইন'। তৃতীয় ও চতুর্থ সপ্তাহে জরুরি পরিষেবা ব‍্যতীত কানাডা ও মেক্সিকোর বর্ডার সিল করা হয় দুই দেশের সঙ্গে যৌথ সম্মতিতে । সব জায়গার মতোই এখানেও অধিকাংশ কর্পোরেট অফিস 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' ঘোষণা করে । স্কুল-কলেজেও শুরু হয় 'অনলাইন ক্লাস' । একে একে বন্ধ হতে থাকে মল, সিনেমাহল, পাব । রেস্টুরেন্ট খোলা থাকলেও 'অনলি টেক-অ্যাওয়ে' বা 'কনট‍্যাক্ট লেস ডেলিভারি' সিস্টেম চালু হয় । 'প‍্যানিক বায়িং' বিষয়টা বোধহয় সব দেশ নির্বিশেষে বাস্তব চিত্র । রাতারাতি খালি হতে থাকে বড় বড় সুপারমার্কেটের স্টক, সঙ্গে দ্রব্য মূল‍্যবৃদ্ধি তো আছেই । তবে কদিনের মধ্যেই, সেফওয়ের মতো সংস্থায় দেখেছি 'লিমিটেড পারচেস' চালু হতে । অর্থাৎ একজন ব‍্যক্তি নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ও খাদ্যসামগ্রী নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি কিনতে পারবেন না । যে লাগামটা এই পরিস্থিতিতে ভীষণই দরকার ছিল ।

     বন্ধ স্যুইমিং পুল ।
    বন্ধ স্যুইমিং পুল ।

    সানফ্রান্সিসকো ও অন‍্যান‍্য আরও কিছু শহরে প্লাস্টিক ব‍্যাগ ব‍্যবহারের ওপর যে কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা বর্তমান পরিস্থিতিতে সাময়িক সময়ের জন্যে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে । যাতে স্টোরের কর্মীদের কাস্টমারের আনা ব‍্যাগ না ধরতে হয়, তাঁরা দোকানের নিজস্ব প্লাস্টিকে জিনিস দিতে পারেন । এছাড়াও, বিভিন্ন জায়গায় অনেক রেস্তোরাঁ দেশের ক্রাইসিসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে 'ফুড প‍্যান্ট্রি' হিসেবে সচল থাকছে। সেলিব্রেটি শেফ হোসে অ্যাঁন্দ্রেস তাঁর কয়েকটি রেস্তোরাঁতে 'কমিউনিটি কিচেন' শুরু করেছেন । তবে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য, এই আপৎকালীন পরিস্থিতিতে, এখানকার কৃষকগোষ্ঠীর মধ্যে কয়েকটি অ্যাপ ব‍্যবহার শুরু হয়েছে, যার মাধ্যমে 'ফ্রেশ প্রোডিউস' জিনিস তাঁরা সরাসরি কাস্টমারের কাছে ডেলিভারি করতে পারছেন । কারণ এঁদের উৎপাদনের মূল অংশ সরবরাহ হত রেস্তোরাঁয় । কিন্তু সেখানে চাহিদায় মন্দা দেখা দেওয়ায় শিকাগোর গ্রিন সিটি মার্কেট বা নিউইয়র্কে 'ourharvest.com' বা 'fellowfarmer.com' প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে খানিকটা সমস্যার সুরাহা শুরু করেছে ।

    আমেরিকায় এই মুর্হূতে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে পাঁচ লক্ষ, অফিসিয়ালি মৃতের সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার । একথা ঠিক, এদেশে করোনার টেস্টিং হচ্ছে অনেক বেশি মাত্রায় । কিন্তু যত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও বেহাল ব‍্যবস্থা ধীরে ধীরে প্রকট হচ্ছে । ভেন্টিলেটরের কমতি বা ডাক্তার-নার্সদের পর্যাপ্ত পিপিই'র অভাব এখানেও অনেকাংশে বাস্তবিক সমস্যা।

     ধূ ধূ করছে গোটা এলাকা ।
    ধূ ধূ করছে গোটা এলাকা ।

    অসুবিধেয় পড়েছে বিদেশ থেকে পড়তে আসা অনেক ছাত্রছাত্রী, যাঁরা বেশিরভাগ এই সময় বিভিন্ন কোম্পানিতে 'সামার ইন্টার্নশিপ' করে । কারণ অনেক কোম্পানি এই পরিস্থিতিতে তাঁদের অফার বাতিল করেছে এবং বেশীরভাগেরই নতুন রিক্রুটমেন্ট আপাতত বন্ধ । ফলত চাকরিক্ষেত্রে এটা যে খুব একটা সদর্থক ইঙ্গিত নয়, সেটা বলাই বাহুল্য । উপরন্তু কলেজের অনেক ইমিগ্র‍্যান্ট ছাত্রছাত্রী অন-ক‍্যাম্পাস বিভিন্ন পার্টটাইম নন-টিচিং কাজ করত হাত খরচার প্রয়োজনে । কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এ সব কাজই বন্ধ । আর এদেশেও অনেক দৈনিক পারিশ্রমিকে কাজ করা মানুষ আছেন । এখানকার পরিস্থিতি ক্রমশ যত খারাপ হচ্ছে, তাতে এই লকডাউন বেশীদিন চললে এই মানুষগুলোও সমস্যায় পড়বেন । সরকার থেকে 'প‍্যানডেমিক আনএমপ্লয়মেণ্ট অ্যাসিসটেন্স প্রোগ্রাম' ঘোষিত হয়েছে, যাতে খানিকটা অর্থসাহায্য তাঁরা পাবেন বলে আশা করা যায় । সাধারণত এপ্রিল মাসে যে ইনকাম ট‍্যাক্স ফাইলিং ডেডলাইন থাকে তা অধিকাংশ স্টেটে পিছিয়ে ১৫ জুলাই করা হয়েছে, যা মার্কিন অর্থনীতিতে খানিকটা হলেও প্রভাব ফেলবে।

     পড়ন্ত সূর্যের আলোয় যেন মৃত্যুপুরী আমেরিকা ।
    পড়ন্ত সূর্যের আলোয় যেন মৃত্যুপুরী আমেরিকা ।

    আমি ভারতবর্ষের মেয়ে, ভিড়ভাট্টায় চলাফেরা করেই বড় হয়েছি । আমেরিকা, বিশেষত অ্যারিজোনা স্বাভাবিক সময়েও আমার চোখে ফাঁকা ফাঁকাই লাগে ! আর এখন এই ঘরবন্দি দশার প্রায় এক মাসে জানালার বাইরে তাকালে আরোই জনশূন্য একটা প্রান্তর মনে হচ্ছে । মাঝে মধ্যে কিছু গাড়ি চলাচল ব‍্যতীত মানুষের হেঁটে যাওয়া সেভাবে দেখতে পাই না। তবে এই মহাযুদ্ধ লড়তে ধৈর্য্য ধরে বাড়িতে থাকা এবং অপেক্ষা ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই এই মুহূর্তে । মনেপ্রাণে চাই ভারতে যাতে যে কোনও মূল্যে এই ব‍্যাপকহারে স্প্রেড আটকানো যায় । সবাই সুস্থ থাকুক, পৃথিবীর এই অসুখ সেরে যাক শিগ্গির ।

    ছবি: লেখিকার সৌজন্যে

    Published by:Simli Raha
    First published:

    Tags: Coronavirus, USA

    পরবর্তী খবর