corona virus btn
corona virus btn
Loading

প্লেগে বাংলায় 'লকডাউন', পথে নিবেদিতা, বেলুড় মঠ বিক্রি করতে চেয়েছিলেন বিবেকানন্দ

প্লেগে বাংলায় 'লকডাউন', পথে নিবেদিতা, বেলুড় মঠ বিক্রি করতে চেয়েছিলেন বিবেকানন্দ
প্লেগ রুখতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিবেকানন্দ, পথে নেমে কাজ করেন নিবেদিতা।

মানুষ ভুল বুঝেছে, তবু যাত্রা থামেনি। শুধু প্লেগ নয়, সেদিন গুজবের সঙ্গেও যুদ্ধ করতে হয়েছিল বিবেকানন্দ, নিবেদিতাকে। কী ভাবে লড়েছিলেন তাঁরা? লিখছেন অর্ক দেব।

  • Share this:

#কলকাতা: ১৮৯৮ সালের এপ্রিল মাস। বাংলায় হানা দিল প্লেগ। এর মাত্র তিন মাস আগে কলকাতায় পা রেখেছেন নিবেদিতা।বিবেকানন্দ তাঁকে ভারতে আসতে অনুরোধ করে চিঠিতে লিখেছেন, "তোমার শরীরে প্রবাহিত কেল্টিক রক্তের জন্যে তুমি সেই নারী যাকে আজ ভারতের প্রয়োজন।" এই আবেদন ফেরাতে না পেরেই আসা। কিন্তু এসেই যেন ঝড়ের সামনে পড়লেন নিবেদিতা। সারদাদেবীর সান্নিধ্যে ভারতীয় জীবনের খুঁটিনাটি শিখছেন, চলছে বৃহত্তর সেবার আদর্শে ব্রতী হওয়ার প্রস্তুতি, তখনই বলা কওয়া নেই, পরীক্ষার সামনে পড়তে হল তাঁকে।

১৭ এপ্রিল বাংলায় প্রথম প্লেগে মৃত্যু হয়। কাপালিটোলা লেনের এক বাসিন্দার দেহ ময়নাতদন্ত করে চিকিৎসকরা সিদ্ধান্তে আসেন- প্লেগেই মৃত্যু। ঝড়ের বেগে সংক্রমণ ছড়ায় বেনিয়াপুকুর, বড়বাজার, কুমারটুলি, শ্যামপুকুরে। ৩০ এপ্রিল প্রশাসন জানিয়ে দেয় কলকাতায় প্লেগ মহামারীর আকার ধারণ করেছে। প্লেগ যখন ক্রমেই ডালপালা মেলছে, ভাঙা শরীরে বিবেকানন্দ তখন দার্জিলিংয়ে। ২৯ এপ্রিল বিবেকানন্দকে ব্রহ্মানন্দ চিঠিতে লেখেন, "কলিকাতায় ৪|৫ দিনের মধ্যে ১০|১২টি প্লেগ কেস হইয়াছে।তাহাদের মধ্যে ৮|১০জন মারা পড়িয়াছে। বাকিদের জীবনের আশা খুব কম...।" চিঠিতে খবরাখবর দিলেও জীর্ণ শরীরে বিবেকানন্দ কলকাতায় আসুক এমনটাও চাননি ব্রহ্মানন্দ। তবে, কারও নিষেধ না শুনেই ৩ মে কলকাতায় এসে পৌঁছন স্বামীজী। কলকাতা ততদিনে শ্মশানের চেহারা নিতে শুরু করেছে।

শুধু যে ভয়াল সংক্রমণই শহরের গলায় কাঁটার মতো বিঁধে ছিল তাইই নয়। সমস্যা দেখা দেয় টিকাকরণ নিয়ে। টিকাকরণের নামে অন্ত:পুরে ‘ম্লেচ্ছ’ ইংরেজ প্রবেশ করে নারীর শ্লীলতা হরণ করবে, এই আশঙ্কাতেই টিকাকরণের বিরুদ্ধাচরণ শুরু করে জনতা। শুরু হয় শহর ছেড়ে পলায়ন।ওই বছর ৮ মে মারাঠা সংবাদপত্রে লেখা হচ্ছে, “ট্রেনে, স্টিমারে, পথে শুধু দেখা যায় প্রবাহিত বিপুল জনতরঙ্গ। কয়েকদিনের মধ্যে ২ লক্ষ মানুষ শহর ছেড়ে চলে গিয়েছে। ধনী পর্দানশীনা মহিলাও পর্দা বন্ধন সরিয়ে রাস্তায় ছুটছেন-মারাত্মক শহর থেকে বাঁচবার জন্যে।”

আজ যেমন সরকারি লকডাউন, তেমন লকডাউন দেখেছিল শহর ওই ১৮৯৮-এ। তবে এই লকডাউন ছিল প্রতিবাদের ভাষা। মুসলমান ও দলিত সমাজে একটা ধারণা ছড়িয়ে যায়, বৃটিশ সরকার সপ্তাহে দু'দিন বাড়ি এসে টিকা দেবে। এই 'বাধ্যতা'র বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়ানো। রাজপথে ঘুরতে থাকে লাঠি, স্লোগান উঠতে থাকে জায়গায় জায়গায়। ৪ মে অমৃতবাজার পত্রিকা লেখে, "কলকাতা এক পরিত্যক্ত নগরীর চেহারা নিয়েছে।"

এই বিরোধিতার কার্যকারণ ইতিহাসকার দীপেশ চক্রবর্তী তুলে ধরেছেন তাঁর ‘শরীর, সমাজ ও রাষ্ট্র: ঔপনিবেশিক ভারতে মহামারী  ও জনসংস্কৃতি’ প্রবন্ধে। তিনি দেখিয়েছেন, এই প্রতিরোধ মুম্বই হয়ে কলকাতায় এসেছিল। ১৮৯৬ সালের ২০ অক্টোবর আর্থার রোডের হাসপাতাল আক্রমণ করেন ১ হাজার মিল শ্রমিক। অভিযোগ গৃহস্থ মহিলাকে জোর করে হাসপাতালে ভর্তি করার। এই স্রোতই প্লেগের সঙ্গে সাগর পাড়ি দিয়ে কলকাতায় আসে। দীপেশ চক্রবর্তীর ভাষায়, "মহামারী কে ঘিরে সমাজের আত্মসংবদ্ধ হওয়ার প্রয়াস।" কলকাতার মুসলমান সমাজে রটে যায়, হজ আটকাতেই এই ব্যবস্থা। পাছে সুলতানি সৈন্য নিয়ে মুসলমান প্রত্যাঘাত করে।

ফলে হাতেকলমে কাজে নামা মানে অকূলপাথারে পড়া। বহু বিরোধিতা, নিন্দের মুখে দাঁড়ানো। বিবেকানন্দ সেদিন অবশ্য পিছিয়ে আসেননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, রোগ ঠেকাতে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে স্বাস্থ্যবিধি। একই সঙ্গে লড়তে হবে গুজবের সঙ্গে। একটি প্রচারপত্র তৈরি করার ভার পড়ে নিবেদিতার উপর। নিবেদিতার তৈরি করা ম্যানুয়াল দুই ভাষায় অনুদিত হয় রাতারাতি।

কলকাতায় এসে দু'মাসও প্রস্তুতির সময় পাননি নিবেদিতা। কলকাতায় এসে দু'মাসও প্রস্তুতির সময় পাননি নিবেদিতা।

স্বামী অব্জজানন্দ রচিত 'স্বামীজীর পদপ্রান্তে' গ্রন্থে সেই ম্যানুয়ালটি পাওয়া যায়। একবার চোখ বোলানো যাক তাতে-

কলিকাতানিবাসী ভাইসকল!

১| আমরা তোমাদের সুখে সুখী ও তোমাদের দুঃখে দুঃখী, এই দুর্দিনের সময় যাহাতে তোমাদের মঙ্গল হয় এবং রোগ ও মারীভয় হইতে একি সহজে নিষ্কৃতি হয়, এই আমাদের নিরন্তর চেষ্টা ও প্রার্থনা।

২| যে মহারোগের ভয়ে বড়, ছোট , ধনী নির্ধন, সকলে ব্যস্ত হইয়ে শহর ছাড়িয়া যাইতেছে  সেই রোগ যদি যথার্থই আমাদের মধ্যে উপস্থিত হয় তাহা হইলে তোমাদের সকলের সেবা করিতে করিতে জীবন যাইলেও আমরা আপনাদিগকে ধন্য জ্ঞান করিব, কারণ তোমরা সকলে ভগবানের মূর্তি। তোমাদের সেবা ও ভগবানের উপাসনায় কোনও প্রভেদ নাই। যে অহঙ্কারে, কুসংস্কারে, অজ্ঞানতায় অন্যথা মনে করে, সে ভগবানের নিকট মহা অপরাধী ও মহাপাপ করে ইহাতে সন্দেহমাত্র নাই।

৩| তোমাদের নিকট আমার সবিনয় প্রার্থনা অকারণে ভয়ে উদ্বিগ্ন হইও  না। ভগবানের উপর নির্ভর করিয়া স্থিরচিত্তে উপায় চিন্তা কর , অথবা যাহারা তাহা করিতেছে তাহাদের সহায়তা কর।

৪| ভয় কিসের? কলিকাতায় প্লেগ আসিয়েছে বলিয়ে সাধারণের মনে যে ভয় হইয়াছে তাহার বিশেষ কোনও কারণ নাই। আর আর স্থানে প্লেগ যেরূপ রুদ্রমূর্তি হইয়াছিল, ঈশ্বরেচ্ছায় কলিকাতায় সেরূপ কিছু নাই। রাজপুরুষেরাও আমাদের প্রতি বিশেষ অনুকুল।

৫| এস, সকলে বৃথা ভয় ছাড়িয়া ভগবানের অসীম দয়াতে বিশ্বাস করিয়া কোমর বাধিয়া কর্মক্ষেত্রে নামি , শুদ্ধ ও পবিত্র ভাবে জীবনযাপন করি। রোগ ও মারীভয় প্রভৃতি তাঁহার কৃপায় কোথায় দূর হইয়া যাইবে।

৬| (ক) বাড়ি, ঘরদুয়ার, গায়ের কাপড় বিছানা, নর্দমা, প্রভৃতি সর্বদা পরিষ্কার রাখিবে।

(খ) পচা বাসি খাবার না খাইয়া টাটকা পুষ্টিকর খাবার খাইবে। দুর্বল শরীরে রোগ হইবার অধিক সম্ভাবনা।

(গ) মন সর্বদা উৎফুল্ল রাখিবে। মৃত্যু সকলেরই একবার হইবে। কাপুরুষ কেবল নিজের মনে ভয়ে বারম্বার মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করেন।

(ঘ) অন্যায়পূর্বক যারা জীবিকা অর্জন করেন, যাহারা অপরের অমঙ্গল ঘটায়, ভয় কোনো কালে তাহাদের ত্যাগ করে না। অতএব এই মৃত্যুভয়ের দিনে এই সকল বৃত্তি ত্যাগ করিবে।

(ঙ) মহামারীর দিনে গৃহস্থ হইলেও কাম ক্রোধ হইতে বিরত থাকিবে।

(চ) বাজারে গুজবাদি বিশ্বাস করিবে না।

(ছ) ইংরাজ সরকার কাহাকেও জোর করিয়া টিকা দিবেন না। যাহার ইচ্ছা হইবে সেই টিকা লইবে।

(জ) জাতি, ধর্ম ও স্ত্রী লোকের পর্দা রক্ষা করিয়া যাহাতে আমাদের বিশেষ তত্ত্বাবধানে নিজের হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা হয় তজ্জন্য বিশেষ চেষ্টার ত্রুটি হইবে না। ধনী লোক পালাক, আমরা গরীব। গরীবের মর্মবেদনা বুঝি। জগদম্ভা সকল নি:সহায়ের সহায়; মা অভয় দিতেছেন- ভয় নাই, ভয় নাই!!

৭| হে ভাই, যদি তোমার কেহ সহায় না থাকে অবিলম্বে বেলুড় মঠে, শ্রীভগবান রামকৃষ্ণ দাসদিগের খবর পাঠাইবে। শরীরের দ্বারা যতদূর সাহায্য হয় তাহার ত্রুটি হইবে না। মায়ের কৃপায় অর্থসাহায্যও সম্ভব।

বিশেষ দ্রষ্টব্য- প্রতিদিন সন্ধ্যাকালে পল্লীতে পল্লীতে মারীভয় নিবারণের জন্যে নাম সংকীর্তন করিবে।

এই কাগজটি বিলিবন্টন নিয়ে সেদিন মঠের সন্ন্যাসীদের কম বিপদে পড়তে হয়নি। স্বামী রামকৃষ্ণানন্দজীকে লেখা সুবোধানন্দের একটি পত্র মারফত জানতে পাই প্রথম দফায় ১ লক্ষ হ্যান্ডবিল ছাপানো হয়েছিল। স্বামী অখণ্ডানন্দ সেই হ্যান্ডবিল নিয়ে রাস্তায় বেরোলে তাঁকে ব্রিটিশের চর ভেবে তাড়া করা হয়।অখণ্ডানন্দ অবশ্য বিপদে ছিলেন অকুতোভয়। একা একাই দিনের পর দিন আর্তজনের সেবা করেছেন মু্র্শিদাবাদে।

শুধু অখণ্ডানন্দই নন, সেদিন দমানো যায়নি গোটা বিবেকানন্দ-নিবেদিতা ব্রিগেডকে। বিবেকানন্দের মনে ছিল প্লেগ হাসপাতাল তৈরির সংকল্প। তার জন্যে বেলুড়ের জমি বিক্রি করতেও প্রস্তুত ছিলেন তিনি।ভক্তদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ''আমরা যে গাছতলার ফকির ছিলাম, সেই গাছতলাতেই থাকব।"

প্লেগ বাংলাকে সহজে ছাড়েনি। ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল গ্যাজেটের পাতায় চোখ রেখে দেখতে পাই মুম্বই শহরে প্লেগ প্রাণ নিয়েছে ১৯২৯-৩০ পর্যন্ত। কলকাতাকে এই রোগ ছেড়েছে ১৯২৫ সালে।

১৯৪৮ সালের মেডিক্যাল গ্যজেটে প্রকাশিত রিপোর্ট। ১৯৪৮ সালের মেডিক্যাল গ্যজেটে প্রকাশিত রিপোর্ট।

তবে প্লেগ ছাড়লেও মারীর সঙ্গে লড়াই শেষ হয়নি। একের দাপট কমেছে তো বেড়েছে অন্য রোগের দমক। নতুন করে লড়াই শুরু হয়েছে ম্যালেরিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, কালাজ্বর, স্মল পক্সের সঙ্গে। সেবাধর্মে ব্রতীরা সেবা করে গিয়েছেন নিঃশব্দেই।

শতাব্দী পেরিয়ে আজ আবার মড়কের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা। দানীর দাপট দেখে, বিবেকানন্দের পরিশ্রমের কথাই মনে আসে। মনে পড়ে 'বিদেশী' মেয়ে নিবেদিতার নীরব সেবাদর্শের বিলুপ্ত শক্তিকে।

বিশেষ সহায়তা- শাহরোজা নাহারিন।

Published by: Arka Deb
First published: April 22, 2020, 1:49 AM IST
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर