ঋণশোধ বাংলার, দেহদান আন্দোলনের কাণ্ডারী ব্রজ রায়ের প্যাথলজিকাল ময়নাতদন্ত

প্রয়াত জনস্বাস্থ্য ও দেহদান আন্দোলনের কাণ্ডারী ব্রজ রায়।

যিনি নিজে দেহদান নিয়ে জীবনের সাড়ে তিনদশক গলা ফাটালেন, করোনা প্রোটোকল মেনেই তাঁর দেহও দাহ করতে হবে বৈকি, তবে স্বাস্থ্য দফতরের সৌজন্যে দেহদান আন্দোলনের পথিকৃত সদা হাস্যময় মানুষটি প্রাপ্য মর্যাদা পেলেন।

  • Share this:

#কলকাতা: কলকাতা শহরে একটা চালু প্রবাদ ছিল,"মানুষ মরলে কে যায়, কাক, শকুন আর ব্রজ রায়।" বৃহস্পতিবার মহামারির শহরে ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল  ১০টা ৪০মিনিট, প্রবাদটিকে নিয়েই পরলোক গমন করলেন কলকাতার দেহদান আন্দোলনের প্রধান মুখ ব্রজ রায়। তবে সব মরণ সমান নয়। একদিন নেহাত ব্যঙ্গ আর আর হাজার বাঁকা চোখের মাঝেই একা মরণোত্তর দেহদান বিষয়টিকে যিনি মান্যতা দিতে দরজায় দরজায় ঘুরেছেন, বাজারি উপহাসেরও পাত্র হয়েছেন,আজ চল্লিশ বছরের লড়াইয়ের শেষে মৃত্যুর দিনে তাঁকেই যথাযথ সম্মান দিল কলকাতা শহর তথা বাংলা। স্বাস্থ্য দফতরের উদ্যোগে করোনা রয়েছে এমন মৃতের প্যাথোলজিকাল অটোপসি করার জন্য ব্রজ রায়ের দেহকেই বেছে নেওয়া হল। করোনা রোগীর মৃত্যুর মিছিল গোনার দিনে, এমন একটি বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ গোটা ভারতের জন্যই দৃষ্টান্ত, আর শহর কলকাতার জন্য গর্বের। যিনি নিজে দেহদান নিয়ে জীবনের সাড়ে তিনদশক গলা ফাটালেন, করোনা প্রোটোকল মেনেই তাঁর দেহও দাহ করতে হবে বৈকি, তবে স্বাস্থ্য দফতরের সৌজন্যে দেহদান আন্দোলনের পথিকৃত সদা হাস্যময় মানুষটি প্রাপ্য মর্যাদা পেলেন।

খুন বা আত্মহত্যার ঘটনায় মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত তো আকছার হয়। সেখান থেকেই মৃত্যুর কার্যকারণ বেরিয়ে আসে। তবে সাধারণ ময়নাতদন্তের সঙ্গে প্যাথোলজিকাল অটোপসির ফারাক আছে। কোথায় তা আলাদা তা বুঝিয়ে বললেন আর.জি. কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক সোমনাথ দাস। যে তিনজনের দল আজ এই ময়নাতদন্ত করে তার নেতৃত্বে ছিলেন সোমনাথ দাস। তিনি এ দিন বলেন, "করোনার মধ্যে এই ময়নাতদন্তের গুরুত্বই আলাদা। কারণ সাধারণ ময়নাতদন্তে মৃত্যুর প্রধান কারণটি ধরা পড়ে বটে, কিন্তু প্যাথলজিকাল ময়নাতদন্তে খুঁটিয়ে দেখা যায় মৃত্যুর আগে ঠিক কী কী পরিবর্তন হয়েছিল মৃত ব্যক্তির শরীরে। পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিবর্তনগুলি ধরা পড়ে। আর করোনায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে এই পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব অসীম। গোটা পূর্ব ভারতে করোনা-পর্বে এই ঘটনা আমাদের চোখে পড়েনি। এমনকি কোনও এইমস-ও এই প্যাথোলজিক্যাল অটোপসি করছে বলে শুনিনি। রিপোর্টটা প্রকাশিত হলে একটি নতুন দিক উন্মোচিচ হবে।" বলার অপেক্ষা রাখে না, ব্রজ রায় তাইই চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন মৃত্যুর পর দেহ ছাই হয়ে না গিয়ে, মাটির তলায় শায়িত না হয়ে বৃহত্তর কোনও কাজে লাগুক।

১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি দেহদানের গুরুত্ব বোঝাতে একটি আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজনীতা অনুভব করেন ব্রজ রায় ও তাঁর বন্ধুরা। ৫ জন মিলে শুরু করেন গণদর্পণ নামক একটি দল। ১৯৮৬ সালের ৫ নভেম্বর জে বি এস হলডেনের ৯৫ তম জন্মদিবসে ব্রজ রায় সুবর্ণ বণিক সমাজের সভাকক্ষে ৩৪ জন গণদর্পণ-এর সভায় উপস্থিত থেকে মরণোত্তর দেহদানের উদ্যোগের শরিক হন। এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আন্দোলনের শুরুয়াত এভাবেই। ব্রজ রায় বলতেন, যুক্তির পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য জন্যই মরণোত্তর দেহদান আন্দোলন। ভারতে দ্বিতীয় এবং পূর্ব ভারতে প্রথম দেহদান সহায়ক সংগঠন ছিল গণদর্পণ।

গত ৬ মে ব্রজ রায় গুরুতর অসুস্থ অবস্থায়  এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি হন। দিন দুয়েক পরেই কোভিড পজিটিভ হওয়ায় তাঁকে শম্ভুনাথ পন্ডিত হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা নাগাদ ব্রজ রায় মারা যান। গণদর্পণ-এর পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য দফতরে কাছে আবেদন জানানো হয়। ওঁর দেহের বিশেষ অটোপসির জন্য আবেদন জানানো হয়। সেই আবেদনেই সাড়া দেয় স্বাস্থ্য দফতর।

উল্লেখ্য শুধু গণদর্পণ নয়, ব্রজ রায়ের অন্য রাজনৈতিক পরিচয়ও রয়েছে। তিনি জীবনের প্রথম পর্বে স্বাধীনতা সংগ্রামী অনন্ত সিংহের ছায়াসঙ্গী ছিলেন তিনি। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলায় অনন্ত সিংহের দল আরসিসিআই (রেভুলশনারি কমিউনিস্ট কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া) যে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেছিল, তার শরিক হয়ে গিয়েছিলেন রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে দীর্ঘ সময় জেলে কাটিয়েছেন। ১৯৭৭ সালে বামেরা ক্ষমতায় এলে ব্রজ রায় দলের অন্যদের সঙ্গেই মুক্তি পান। শুরু হয় নতুন ইনিংস।

Published by:Arka Deb
First published: