corona virus btn
corona virus btn
Loading

করোনার জেরে স্ট্যানফোর্ড এলাকাটা যেন 'ঘোস্ট টাউন', শুধুই নিস্তব্ধতা... ক্যালিফোর্নিয়া থেকে অস্মিতা

করোনার জেরে স্ট্যানফোর্ড এলাকাটা যেন 'ঘোস্ট টাউন', শুধুই নিস্তব্ধতা... ক্যালিফোর্নিয়া থেকে অস্মিতা

ক্যালিফোর্নিয়ার যা অবস্থা এখন বাড়ির বাইরে পা রাখতেই ভয় করে। মাঝে করোনার ভরকেন্দ্র ছিল ইতালি, এখন নিউইয়র্কের মৃত্যু মিছিল আমেরিকাকে করোনার ভরকেন্দ্রে পরিণত করেছে। এখন ক্যালিফোর্নিয়ার ঠিক কী পরিস্থিতি? ক্যালিফোর্নিয়া থেকে লিখছেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট ডক্টরাল ফেলো অস্মিতা সিনহা।

  • Share this:

#ক্যালিফোর্নিয়াঃ মাত্র মাস দুই হল গবেষণার কাজে ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছি। ভারত থেকে আসার সময় জানুয়ারী মাসের শেষে হংকং হয়ে ক্যালিফোর্নিয়া টিকিট কেটেছিলাম। তখনই শুনেছিলাম চিনের ইউহানে করোনার প্রকোপ এবং মেনল্যান্ড চিন থেকে আসা যাত্রীদের এয়ারপোর্টে মেডিকেল  চেকআপ হচ্ছে। এরপর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে বিমান সংস্থা থেকে বিমান বাতিল করে দেওয়া হয়। একপ্রকার বাধ্য হয়ে তাই মিডল-ইস্ট দিয়ে আমেরিকায় এসেছি।  আসার দিন সাতেক পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। ধীরে ধীরে মানিয়ে নিচ্ছিলাম নতুন জায়গা, নতুন ল্যাব, নতুন ল্যাবমেটস, নতুন স্যারেদের সঙ্গে। সত্যি কথা বলতে,  সেভাবে তখনও করোনা মানুষের মধ্যে প্যানিক তৈরির পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ভারতের অনলাইন সংবাদ মাধ্যম গুলোতে চোখ রাখলে ভারতের খবর পেতাম। এরপরই  এক এক করে দেশে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে লাগল।

এক সপ্তাহ পর থেকে আমেরিকাতে অদ্ভুত তৎপরতা চোখে পড়ল। কোভিড-১৯-এর  কারণে মার্চের মোটামুটি দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে চিন-ইরান-সহ ইউরোপেরও বেশ কিছু দেশ থেকে আসা ফ্লাইট বাতিল করা হল। বাবা-মায়ের এপ্রিলে আসার কথা ছিল। কিন্তু বাতিল হয়ে গেল ভিসা দেওয়া। বলা বাহুল্য সব সতর্কতামূলক ব্যবস্থাই ছিল বিদেশীদের ক্ষেত্রে। আমেরিকাবাসীরা তখনও দেশে ফিরতে পারবে মুষ্টিমেয় কিছু টার্মিনাল দিয়ে, বাধ্যতামূলক হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে ১৪ দিন। এরপর ১০ মার্চ নাগাদ হঠাৎ শুনলাম এ দেশেও করোনার প্রকোপ বাড়ছে। ১৩ মার্চ ওয়াশিংটন-বাসী বন্ধু ফোন করে জানাল ওঁদের ইউনিভার্সিটি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বলা হয়েছে খাবার মজুত করে, ঘরে থাকতে। ১৫ মার্চ আমিও ইন্ডিয়ান স্টোর আর কাছাকাছির সুপার মার্কেট থেকে ১৫ দিনের রসদ সংগ্রহ করলাম। দু-একদিন পর একে একে বন্ধ হয়ে গেল স্কুল, কলেজ, পাব, বাস্কেটবল কোর্ট, সুইমিংপুল, জিম, রেস্টুরেন্ট। তখনও জানতাম না করোনা এতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে আমেরিকায়। সারা বিশ্বে মহামারীর আকার নেবে। ১৬ মার্চ  ইউনিভার্সিটি গিয়ে কানাঘুষো শুনলাম ইউনিভার্সিটি শাটডাউনের কথা। ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ আমাদের ইউনিভার্সিটি। ৭ এপ্রিল পর্যন্ত, প্রশাসন থেকে 'shelter-in-place' ঘোষণা করা হয়েছে।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি

জুম অ্যাপে মিটিং করে প্রিকশ্যান নিতে বলা হচ্ছিল। ইউনিভার্সিটি থেকে বার বার মেইল করে বলা হচ্ছিল সাবান দিয়ে হাত ধুতে বা লবণ জলে গার্গল করতে, স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে। আমরা এখন সবাই 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' করছি। লকডাউনের প্রথম সপ্তাহ তো খুবই দুশ্চিন্তায় কেটেছে। সুপারমার্কেটের তাকগুলো এমন খালি আগে কখনও দেখিনি। অনলাইন ডেলিভারি ও অনেক দেরিতে আসছিল। যদিও এখন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ৩ রা এপ্রিল শুনলাম এই লকডাউন আরো এক্সটেন্ড করা হয়েছে, ৩ মে অবধি চলবে এই অবস্থা। এ মুহুর্তে ইউএসএ তে আক্রান্তের সংখ্যা ৭ লক্ষ। বিদেশে আসার পরেই এরকম একটা পরিস্থিতিতে পড়ব কখনও কল্পনাই করতে পারিনি। এমনকি, সোস্যাল সিকিওরিটি অফিস ও বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে বিপাকে পড়েছেন অভিবাসীদের একাংশ। দেশটা চেনার আগেই গৃহবন্দি হয়ে গেলাম, মনে হচ্ছে নির্বাসনে রয়েছি।

জনশূন্য চার্চ জনশূন্য চার্চ

আমরা হয়ত কেউই কল্পনা করতে পারিনি এরকম একটা মহামারীর কবলে আমরা পড়ব। আমেরিকায় এখন সব বন্ধ। সবাই গ্রসারি অনলাইনে অর্ডার করছি। খুব প্রয়োজন নাহলে কেউ বাইরে বেরোচ্ছি না। ডেলিভারি দিতে এসে অ্যাপার্টমেন্টের দরজার সামনে নামিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। এমনিই এখানে প্লাস্টিক মানির চল বেশী, এখন আরও বেশি বেড়ে গিয়েছে। যদি কোনও কারণে দোকানে যেতে হয়, দিতে হচ্ছে লম্বা লাইন দু হাত দূরে দূরে সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং মেন্টেইন করে। হ্যান্ড স্যানিটাইজার দেওয়া হচ্ছে সুপার মার্কেট গুলিতে ঢোকার পথে। বাড়ী থেকে আনা ব্যাগ বাইরে রেখে ঢুকতে হচ্ছে, সঙ্গে রয়েছে মূল্যবৃদ্ধি। তবে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট চলছে। এমনিতেই আমেরিকার জনঘনত্ব ভারতের তুলনায় অনেকটাই কম, তাও করোনার প্রকোপে স্ট্যানফোর্ড অঞ্চল 'ঘোস্ট টাউনে' পরিণত হয়েছে।

আর ক্যালিফোর্নিয়ার যা অবস্থা এখন বাড়ির বাইরে পা রাখতেই ভয় করে। মাঝে করোনার ভরকেন্দ্র ছিল ইতালি, এখন নিউইয়র্কের মৃত্যু মিছিল আমেরিকাকে করোনার ভরকেন্দ্রে পরিণত করেছে। মৃত্যুর সংখ্যা নিরিখে সংখ্যাটা নেহাত কম নয়, সাড়ে আঠাশ হাজারের কাছাকাছি। জানি না এই পরস্থিতি কবে কাটবে। এরকম একটা পরিস্থিতি সবার জন্যই ফ্রাস্ট্রেটেড। বিশেষত যারা পরিবার ছেড়ে অনেক দূরে আছে, ইচ্ছে করলেও পৌঁছনোর কোনও উপায় নেই পরিবারের কাছে। পরিবার পরিজনের সঙ্গে থাকলে হয়ত এই পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করা অনেক সহজ হত।তবে এখানে যা দেখেছি, যে ভাবে করোনা প্রভাব বিস্তার করেছে শুনেছি, সেখান থেকে দেশের মানুষকে একটাই অনুরোধ 'সবাই দয়া করে ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন। কারণ ভারতের মত ঘনবসতিপূর্ণ দেশে একবার কমিউনিটি সংক্রমণ শুরু হলে বিভীষিকাময় হয়ে উঠবে পরিস্থিতি।' সত্যি কথা বলতে, করোনা একবার এই ১৩০  কোটির দেশের ছড়িয়ে পড়লে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো অপ্রতুল হয়ে পড়বে। ভারতের মত উন্নয়নশীল দেশে হাসপাতাল, ডাক্তার, নার্স ও ভেন্টিলেটরের অভাব বড্ড বেশি  চোখে পড়বে।

তবে ভাইরাস নিয়ে গবেষণা প্রতিনিয়ত চলছে, আশা করি খুব শীঘ্রই প্রতিষেধক বা টীকা বেরিয়ে যাবে। ততদিন সবাই ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন। সব উন্নত দেশগুলোর স্বাস্থ্য পরিষেবা যখন একে একে এই ভাইরাসের সামনে হার মানতে বাধ্য হল, তখন ভারত হয়ত তাতে সফল হবে যদি আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করি। এই লড়াইটা আমাদের লড়তে হবে ঘরে থেকেই। শুধু একটাই ভয়, আমাদের দরিদ্র দেশ ভারতে অনেক মানুষ আছেন, যারা দিন আনে দিন খায়, বা অসংগঠিত শ্রমিক তাঁদের জীবন হয়ত খুবই কষ্টে চলছে এই পরিস্থিতিতে। করোনায় গৃহবন্দি থেকে তাঁরা দারিদ্রতায় না মারা যান! সকলের মতো আমারও প্রশ্ন আগে জীবন না আগে জীবিকা?

আমার আশা সরকার নিশ্চই সে দিকে খেয়াল রাখছে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের রিলিফ ফান্ড ও তৈরি করেছেন ওঁদের জন্য। মানুষ সামর্থ অনুযায়ী দানও করছেন। তবে যেকোনো উপায়ে ভারতের মত জনবহুল দেশে যদি কমিউনিটি স্প্রেড এড়ানো যায় তবে তা সত্যি প্রশংসনীয়। সারা বিশ্ব এখন কোরোনা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসাবে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন'র জন্য ভারতের দিকে তাকিয়ে। এই কম্পাউন্ড আবিষ্কৃত হয় 'ভারতের রসায়নের জনক' আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের হাত ধরে।রসায়নের ছাত্রী হিসাবে, বাঙালি হিসাবে, ভারতীয় হিসাবে যা আমার কাছে অত্যন্ত গর্বের।

জনশূন্য ক্যালিফোর্নিয়ার ছবি পাঠিয়েছেন অস্মিতা সিনহা। 

Published by: Shubhagata Dey
First published: April 27, 2020, 11:20 PM IST
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर