corona virus btn
corona virus btn
Loading

'কেউ কারও গালে গাল ঠেকায় না, করোনা বদলে দিয়েছে পাশ্চাত্য অভিবাদন রীতি', জার্মানি থেকে অমৃতা

'কেউ কারও গালে গাল ঠেকায় না, করোনা বদলে দিয়েছে পাশ্চাত্য অভিবাদন রীতি', জার্মানি থেকে অমৃতা

জার্মানির বন ইউনিভার্সিটির ফ্লুইড ডায়নামিক্সের পোস্ট ডক্টরাল ফেলো। নর্থ রাইন ওয়েস্টফালিয়া থেকে করোনা যুদ্ধের ইতিবৃত্ত লিখলেন অমৃতা ঘোষ।

  • Share this:

#জার্মানিঃ আমি বিগত কয়েক বছর ধরে পড়াশোনা এবং গবেষণার সুযোগ পেয়ে পশ্চিম ইউরোপে আছি। ফ্রান্সের দক্ষিণের একটি শহর থেকে শুরু হয়েছিল পড়াশুনা। বর্তমানে পশ্চিম জার্মানিতে রয়েছি। এর মধ্যেও কর্মস্থল বদল হয় এবং  তখন আমি স্পেন ও চেক প্রজাতন্ত্রে থাকতাম। কিন্তু, এরকম অবস্থার সম্মুখীন হব ভাবিনি। বিগত বেশ কয়েকদিন আমরা ঘরবন্দি। ইউরোপের এই অংশে মূলত আমাদের চোখ যেটা দেখে বা সত্যি বলতে যেটা চোখ খুঁজে নেয়, তা নান্দনিক অর্থে সেলিব্রেশন অফ লাইফ বা জীবন উদযাপন। সহজেই অনুমেয় যে তার পিছনে যেমন অনেকগুলো আর্থ-সামাজিক বিষয় জড়িত, কিন্তু তার অগ্রভাগে রয়েছে এখানকার মানুষের জীবন দর্শন বোধ। যে জীবন দর্শন বোধ সম্পর্কে উপলব্ধি করতে একটা নিবিড় চর্চার প্রয়োজন রয়েছে। যাকে শুধুমাত্র ব্যক্তি স্বাধীনতা বা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ শিথিলতা  দিয়ে উপস্থাপনা করা একপ্রকার ভ্রমই শুধু নয়, যা গণমাধ্যমে বারেবারে বিজ্ঞাপিত ধারণার অংশ মাত্র।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের মূল ঘটনাটি চিন থেকে পরবর্তীতে ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানিতে ব্যাপকতা ধারণ করলে আমিও ততোধিক সতর্ক হতে শুরু করি।  যার ফলস্বরূপ, গত তিন সপ্তাহ প্রায় ঘরবন্দি। এখানেও বাকি দুনিয়ার মত অফিসে, টিভিতে, নিউজে, পেপারে সবার মুখেই 'প্যানিক করার কিছু নেই, ডোন্ট প্যানিক', কিন্তু তারপর তারা যা যা বিচিত্র কথা বলছে সেটা প্যানিক করার জন্য পর্যাপ্ত। এই পিরিয়ডে অবশ্য আমরা (আমি এবং আমার স্বামী তুহিন ) মাঝে মধ্যে প্রয়োজনীয় বাজার-দোকানে গিয়েছি, ফেরার পথে পাশেই রাইন নদীর পাড় বরাবর হেঁটেও এসেছি। আর যে দু-একদিন ঝকঝকে রোদ মিলেছে, সেই দিনগুলোয় দু-দণ্ড নদীর চরে ঘাসে পিঠ মেলেছি, অনতিদূরে অন্য প্রতিবেশীদেরও দেখা পেয়েছি। এখানে বলে নেওয়া ভাল, আমরা এখানে যে নর্থ রাইন ওয়েস্টফালিয়া রাজ্যে থাকি, সেখানে ভারত বা ইউরোপের অন্য দেশগুলোর মত ব্যাপক লক ডাউন হয়নি, রাস্তাঘাটে কোনও প্রয়োজন ছাড়াই অনধিক ২ জন একসঙ্গে বেরোতে পারেন। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দোকান ছাড়া বাকি সবই বন্ধ। আশঙ্কা একটাই পারস্পরিক দূরত্ব মানলেও সামান্য কিছু মানুষের নিকট উপস্থিতি থেকেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। জীবন উদযাপনের প্রাণকেন্দ্র স্বরূপ কফিশপ, রেস্টুরেন্ট-পানশালা, শপিং সেন্টার এবং সকল সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্রগুলোও বন্ধ করা হয়েছে।  অবশিষ্ট বলতে, দূরের কোন চার্চ থেকে নিয়ম করে ঘন্টার শব্দ ভেসে আসা।

ফরাসিদের মধ্যে দেখা হলে একে অন্যকে গালে গাল ঠেকিয়ে গ্রিটিংস জানানোর প্রথা খুব নান্দনিক, আবার জার্মানদের মধ্যে সরাসরি এমনটা না হলেও বলা যায় প্রায় সব ইউরোপিয়ান জনগোষ্ঠীরই অন্তরঙ্গ অভিবাদনের প্রতি যে একটা অনুরাগ আছে বা সেই দৃষ্টিভঙ্গিটা একটা কার্টেসি বোধ থেকে হলেও তা সর্বজনবিদিত। মজার কথা, এই বর্তমান জরাজীর্ণ সময়ের ব্যাকইয়ার্ডে এরা একে অন্যের সাথে যথাযথ দূরত্ব বজায় রেখে একে অন্যের চোখের গভীরতাকে ভরসা করছে যা হয়তো অন্তরঙ্গ স্পর্শের চেয়েও অনেক বেশি প্রকাশ করতে পারে। আমি যে বাড়িতে থাকি, গোটা বাড়িতে আমি ছাড়া আর মাত্র একজন বৃদ্ধা থাকেন, তিনি ঘটনাচক্রে পেশায় একজন ডাক্তার। তাঁর পরিবারের অন্যরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকেন। এই সময়ে তারা সকলেই নিজের নিজের মতো করে ঘরবন্দি, এদের সার্বজনীন উৎসব ইস্টারেও যার অন্যথা হয়নি, এবং সত্যি বলতে এই দুর্যোগ মুক্তির মূল স্তম্ভই হয়তো এই নিরাপদ ঘরযাপন। তবুও অপেক্ষাকৃত বার্ধক্য ইউরোপীয় জীবন যে মৃত্যুর আশঙ্কায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে, এবং দুনিয়ার উন্নত, অনুন্নত বিশ্বের অন্য মৃত্যুপুরীগুলো সেই বিপদজনক ভাবনার ফেরি করে চলেছে, সেই আপেক্ষিকতায় এই দ্যয়েশল্যান্ড আপাতত বিস্ময় ভূমি বলা চলে। এখানে সংক্রমণের সংখ্যা প্রচুর হলেও মৃত্যু সংখ্যা তুলনায় কম সেটা বড় কথা শুধু নয়, সুস্থ হয়ে ওঠা মানুষের সংখ্যাও অনেক বেশী। তার জন্য অবশ্যই জার্মান স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে, সরকারকে এবং সাধারণ মানুষের ধন্যবাদ প্রাপ্য।

ছবিঃ লেখিকার সৌজন্যে। 

First published: April 19, 2020, 7:37 PM IST
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर