corona virus btn
corona virus btn
Loading

Exclusive: কতটা ভয়ঙ্কর এই মহামারী, ইতালি থেকে অঙ্ক কষে দেখালেন বাঙালি বিজ্ঞানী

Exclusive: কতটা ভয়ঙ্কর এই মহামারী, ইতালি থেকে অঙ্ক কষে দেখালেন বাঙালি বিজ্ঞানী
করোনার ভয়াবহতা অঙ্কের সাহায্যে ব্যখ্যা করলেন বাঙালি বিজ্ঞানী।

কোনো পূর্ভাবাস করার চেষ্টা না করে, শুধু এই সংক্রমণ বৃদ্ধির হার বিষয়ক যা পরিসংখ্যান আছে সেগুলোকে একটু ভালো ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি গণিতের সাহায্যে। ইতালি থেকে সেই ব্যখ্যা আমাদের জন্য তুলে ধরলেন বিজ্ঞানী সব্যসাচী সিদ্ধান্ত। শুধুমাত্র নিউজ ১৮ বাংলার জন্য।

  • Share this:

নোভেল করোনাভাইরাসের ত্রাসে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রায় সারা পৃথিবী কার্যত গৃহবন্দি। স্তব্ধ জনজীবন। আমরা এই কয়েক সপ্তাহে এই ভাইরাসটির চরিত্র, বৈশিষ্ট্য কিছুটা পড়েছি, জেনেছি। বিভিন্ন দেশে প্রাদুর্ভাব কেমন, কি ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তাও কাগজে, বৈদ্যুতিন মাধ্যমে, আন্তর্জালে, সামাজিক মাধ্যমে উঠে এসেছেন। আমরা শুনছি এপিডেমিওলোজির বিভিন্ন তত্ত্ব, বিভিন্ন সংজ্ঞা।

এপিডেমিওলোজিস্ট বা মহামারী বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন রকম সিমুলেশন মডেল নিয়ে কাজ করেন, মহামারীর ব্যাপ্তির পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য। সেই পূর্বাভাস থেকে কী কী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন সে বিষয়ে আন্দাজ পাওয়া যায়। আবার এই সব ব্যবস্থার তারতম্য সেই মডেল এ ব্যবহার করে এই তত্ত্বের  পরিমার্জন করা যায়। আমরা শুনছি হ্যামার এন্ড ডান্স মডেল, SEAR মডেল ইত্যাদির কথা। বিভিন্ন মাধ্যমে এসবের খুব সুন্দর বিশ্লেষণ দেখা যাচ্ছে।আমরা সবাই যারা মহামারী বিশেষজ্ঞ নই, তারা এই সিমুলেশন মডেলগুলির গুঢ় তত্ত্বের গভীরে প্রবেশ না করে বা কোনো পূর্ভাবাস করার চেষ্টা না করে, শুধু এই সংক্রমণ বৃদ্ধির হার বিষয়ক যা পরিসংখ্যান আছে সেগুলোকে একটু ভালো ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি গণিতের সাহায্যে। ইতালি থেকে সেই ব্যখ্যা আমাদের জন্য তুলে ধরলেন বিজ্ঞানী সব্যসাচী সিদ্ধান্ত।  শুধুমাত্র নিউজ ১৮ বাংলার জন্য।

বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে ইতালিতে যখন এই সংক্রমণ দ্রুতগতিতে ছড়াচ্ছিল, অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন ইতালিতে এবং পরবর্তীকালে অন্যান্য দেশে এই সংক্রমণ কেন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এই লাফিয়ে লাফিয়ে বা হুহু করে বৃদ্ধির ব্যাপারটার ভিত্তি যদি আমরা একটু বিশ্লেষণ করি, তাহলে আমরা চিন্তিত হব কিন্তু বিস্মিত হব না।

সংক্রমণের এই বৃদ্ধি গণিতের কিছু নিয়ম মেনে চলে। সংখ্যাতত্বের পরিভাষায় যাকে বলা হয় এক্সপোনেনশিয়াল গ্রোথ বা বৃদ্ধি। এই এক্সপোনেনশিয়াল বৃদ্ধি আমরা প্রকৃতিতে বিভিন্ন ঘটনায় দেখতে পাই। জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, অর্থনীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির উদাহরণ দেখা যায়।

আমরা অনেকেই কথায় কথায় 'এক্সপোনেনশিয়াল' শব্দটি ব্যবহার করে থাকি। তার মানে আমাদের জানা থাকলেও, কখনো কখনো বাস্তবে তার প্রভাব সমন্ধে ওয়াকিবহাল থাকি না। যখন কোনো ছোট সংখ্যা এই বৃদ্ধির নিয়ম মেনে বাড়তে বাড়তে খুব কম সময়ের মধ্যে একটা বড় সংখ্যায় পৌঁছে যায়, তখন তা দেখে বিস্মিত হই। অথচ সেটা গণিতের ওই নিয়ম মেনেই বেড়েছে। এই Covid-১৯ সংক্রমেণর ক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছে। এই অতিমারীর বৃদ্ধি একটি গাণিতিক বাস্তব। এই বৃদ্ধি সম্বন্ধেও বিভিন্ন মাধ্যমে সুন্দর বিশ্লেষণ নজরে এসেছে।

কোনো কিছু যখন এই বৃদ্ধির নিয়ম মেনে চলে, তখন তার বৃদ্ধির হার তার বর্তমান পরিমাণের সাথে সমানুপাতিক হয়। ভাইরাস এর অনিয়ন্ত্রিত সংক্রমণ তাই এই বৃদ্ধির উৎকৃষ্ট উদাহরণ, কারণ বিদ্যমান সংক্রমণ থেকেই নতুন সংক্রমণগুলি ছড়ায়।

এক্সপোনেনশিয়াল বৃদ্ধির সংজ্ঞা থেকে আমরা সময়ের (দিনের) সাপেক্ষে সংক্রামিতের সংখ্যার বৃদ্ধির একটা সমীকরণ লিখতে পারি:

Nt = N0 (১ r)t যদি বৃদ্ধির হার হয় ৭ শতাংশ তাহলে দু দিন পর আমরা লিখতে পারি: N2 = N0 (১ ০.০৭)(১ ০.০৭) খুব সোজা ভাবে বললে, কোনো একদিনের নতুন সংক্রামিতের সংখ্যা হলো আগের দিনের সংক্রামিতের সংখ্যার সঙ্গে এক এর বেশি কোনো সংখ্যার (1 r) গুনফল। একদিন পর, t=১ N1 = N0 (1 r) = N0 N0 * r একদিন পর নতুন N0  * r মানুষ সংক্রামিত হয়েছেন। নতুন সংক্রামিতের সংখ্যা পুরোনো সংক্রামিতের সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল। তাই সংক্রামিতের সংখ্যা বেশি হলে নতুন সংক্রামিতের সংখ্যা খুব দ্রুত বেড়ে যাবে।

দেখা যাক এই হার r কি। যদি N সংখ্যক সংক্রামিত ব্যক্তিরা M মানুষজনের সংস্পর্শে আসেন আর তাঁদের সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা যদি p হয়, তাহলে আমরা বলতে পারি কোনো এক দিনে নতুন সংক্রমিতের সংখ্যা M * p  * N । তাহলে আমাদের সমীকরণ দাঁড়ালো: N1 = N0 M * p * N0 = N0 (1 M * p) Nt = N0 (1 M*p)t এবার দেখা যাক পরিসংখ্যান কী বলছে। নীচের বামদিকের রেখচিত্র দেখাচ্ছে চীনের বাইরে এই ভাইরাস সংক্রমণের সংখ্যা (vertical y axis), দিনের (horizontal  x  axis) সাপেক্ষে (তথ্যসূত্র : worldometer)। এক্সপোনেনশিয়াল বৃদ্ধির রেখচিত্র এরকমই দেখতে হয়। কত তাড়াতাড়ি এই রেখচিত্র উর্ধমুখী হবে সেটা নির্ভর করে বৃদ্ধির হারের উপর। এই ধরণের বৃদ্ধির ব্যাখ্যা সুবিধে হয় যদি আমরা একই রেখাচিত্র লগারিদমিক স্কেলে দেখি (নীচের ডান দিকে), যেখানে এই বৃদ্ধি একটি সরলরেখা হিসেবে দেখা যাবে। লগ স্কেলে সংক্রামিতের সংখ্যা চিত্রের y axis এর প্রত্যেকটি প্রদর্শিত ধাপে দশগুন করে বাড়বে। গত ২৯ শে জানুয়ারী চীনের বাইরে সংক্রামিত ব্যক্তিদের সংখ্যা ছিল ১০২। কুড়ি দিন পর (১৮ ফেব্রুয়ারি) সেই সংখ্যা হাজার পেরোয়। আর তার পরের চোদ্দদিনে (২ মার্চ) সংক্রামিতের সংখ্যা দশ হাজারে পৌঁছে যায়। কিছু হিসেব কষে আমরা বলতে পারি যে সংক্রামিতের সংখ্যা দশগুন বাড়তে সময় লাগছে গড়ে দুই সপ্তাহের কিছু বেশি। এই হিসেবে যদি আমরা একটা এক্সট্রাপোলেশন করি তাহলে বলা যেতে পারে যে এপ্রিলের প্রথম ভাগে সংখ্যাটা দশলাখে পৌঁছে যাবে আর এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহ নাগাদ সংখ্যাটা এক কোটিতে পৌঁছে যাবে। বাস্তবে এরকম হওয়ার আগেই বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বৃদ্ধির হার কমানোর জন্য।

এই বিশ্লেষণ প্রতিটি দেশের ক্ষেত্রেও আলাদা আলাদা ভাবে করা যেতে পারে। ইতালিতে প্রথম দিকে বৃদ্ধির হার ছিল ৩০ শতাংশের বেশি। পরবর্তী কালে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করার পর সেটা আস্তে আস্তে নেমে আসে ২০ শতাংশের নীচে। কোনো দেশে যদি সংক্রামিতের সংখ্যা কম থাকে তাহলেও কিন্তু নিশ্চিন্ত হওয়ার জো নেই। বৃদ্ধির হার ধরলে সেই দেশ হয়তো অন্য দেশে যেখানে সংক্রামিতের সংখ্যা বেশি, তাদের থেকে শুধু কয়েক দিন পিছিয়ে আছে। ভারতবর্ষের পরিসংখ্যান (নীচের বামদিকের ছবি) দেখলে প্রাথমিক ভাবে মনে হচ্ছে যে এক্সপোনেনশিয়াল বৃদ্ধি আরম্ভ হয়েছে, দেখা যাক গাণিতিক ভাবে এই বৃদ্ধির হার কমবে কি করে।

আমরা যদি আমাদের সমীকরণ দেখি: Nt = N0 (1 M*p)t বৃদ্ধি কমবে যদি M*p শূন্যের কাছাকাছি যেতে থাকে, মানে (১ M*p) এক এর কাছাকাছি যেতে থাকে। এরকম হলে এই বৃদ্ধি একটি এক্সপোনেনশিয়াল থেকে লজিস্টিক রেখচিত্রে রূপান্তরিত হবে (সঙ্গে ছবি)। একটা সময় আসবে যখন নতুন সংক্রমণের সংখ্যা কিছু সময় ধরে স্থির থাকবে তারপর প্রত্যেক দিন কমতে থাকবে। যখন একদিনের নতুন সংক্রামিতের সংখ্যা আর আগের দিনের নতুন সংক্রমণের সংখ্যার অনুপাত (গ্রোথ ফ্যাক্টর) ১ হবে, তখন আমরা বলি ইনফ্লেকশন পয়েন্টে পৌঁছেছে। সাধারণত সর্বোচ্চ সংক্রামিতের সংখ্যা ইনফ্লেকশন পয়েন্টের সংক্রামিতের সংখ্যার দ্বিগুনের কাছাকাছি হয়। এই গ্রোথ ফ্যাক্টরের সুক্ষ তারতম্য কিন্তু সময়ের সাপেক্ষে সংক্রামিতের সংখ্যার অনেক পার্থক্য গড়ে দিতে পারে, যা এই অতিমারীর ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই ক্ষেত্রে খুব কম সময়ে এত বিপুল সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন যে অনেক উন্নত দেশের পক্ষেও সবাইকে সুষ্ঠ চিকিৎসা প্রদান করা মুশকিল হচ্ছে, বিশেষ করে যাঁদের ইনটেনসিভ কেয়ার দরকার পড়ছে। তাই সময় থাকতে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তাহলে বৃদ্ধির হার কমবে আর অতিমারীর শেষে সংক্রামিতের সংখ্যা অনেক হলেও তা অনেকখানি সময় ধরে হবে। মানে সময়ের সাপেক্ষে সংক্রামিতের সংখ্যা অনেক কম হবে, যার দরুন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি হবে না। এটাকেই বিশেষজ্ঞরা বলেন flattening the curve।

এবার দেখা যাক এই M*p শূন্য কখন হবে।অনিয়ন্ত্রিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি দ্রুত বাড়তে থাকবে পূর্ণ জনসংখ্যার দিকে। তারপর হ্রাসও খুব দ্রুত হবে কারণ নতুন সংক্রমণের জন্য খুব কম সংখ্যক মানুষ বাকী থাকবেন। তাই বাস্তবে এই এক্সপোনেনশিয়াল বৃদ্ধি চিরকাল চলতে পারে না।দেখা যাক বৃদ্ধির হার আর কিভাবে হ্রাস পাবে।

যদি M মানুষের কাছে ভ্যাকসিন থাকে তাহলে তাদের সংক্রমণের সম্ভাবনা p হবে শূন্য। যেহেতু আমাদের ভ্যাকসিন নেই, তাহলে M*p শূন্য করতে গেলে M শূন্য করতে হবে। মানে সংক্রামিত ব্যক্তি কারোর সংস্পর্শে এলেন না, তাই সংক্রমণ ছড়ালেন না। যখন আক্রান্তের সংখ্যা কম, তখন সংক্রামিত ব্যক্তিদের সঠিক ভাবে চিহ্নিত করে আলাদা রাখলে সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু যখন সংক্রমণ দ্রুত ছড়াতে আরম্ভ হয়েছে তখন M কে শূন্য করার মানে লকডাউন। কেউ কারোর সাথে মিশছেন না, যেহেতু সংক্রামণের উপসর্গ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না। যেটা ইউরোপে চালু হয়েছে, ভারতেও চালু হয়েছে। বাস্তব জীবনে যখন সামাজিক মেলামেশা বিদ্যমান তখন সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা p অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। কি ধরণের ভাইরাস, কিভাবে সংক্রমণ ছড়ায় ইত্যাদি। আবার কোনো সংক্রামিত ব্যক্তি যখন অন্য একজন সংক্রামিত ব্যক্তির সঙ্গে মিশলেন তখন নতুন করে সংক্রমণ ছড়াতে পারলেন না। আবার যাঁরা সেরে উঠেছেন বা সংক্রমণে যাঁদের মৃত্যু হয়েছে তাঁদেরকে হিসেবের বাইরে রাখতে হবে। এই সমস্ত সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে সিমুলেশন মডেল পরিমার্জন করেন মহামারী বিশেষজ্ঞরা। এই ধরণের সিমুলেশন থেকেই বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্য ব্যবস্থা গ্রহণের ধারণা দিতে পারেন। তবে এটা মাথায় রাখতে হবে যে এই ধরণের বিশ্লেষণ শুধুমাত্র যাঁরা পরীক্ষা করিয়েছেন তাঁদের ওপর ভিত্তি করে। এরকম আরো অনেকে আছেন যারা হয়তো আক্রান্ত কিন্তু উপসর্গ দেখা দেয়নি বা এখনো পরীক্ষা করাননি। অথবা ই ধরনের মহামারীর বিরুদ্ধে সব দেশের পদক্ষেপও এক রকম না। তাই এ ধরণের আগাম বিশ্লেষণের থেকে বাস্তব পরিস্থিতির তারতম্য থাকবে।

পরিশেষে একটাই কথা বলি। গণিতের নিয়মে এই পরিসংখ্যান নিছক সংখ্যা হলেও, বাস্তবে তা আমাদের সবার জীবন। জীবনের মূল্য সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা অসম্ভব। পৃথিবীর এই কঠিন সময়, এই বন্ধুর পথে যেন আমরা সকলে নিজেদের সঠিক দায়িত্ব পালন করে জীবনের মর্যাদা রক্ষা করতে পারি।

Published by: Arka Deb
First published: April 8, 2020, 1:13 PM IST
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर