প্যাকেটের হলুদে বিষ, কলকাতার ল্যাবরেটরিতে উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য!

Akash Misra | News18 Bangla
Updated:Jun 23, 2017 04:42 PM IST
প্যাকেটের হলুদে বিষ, কলকাতার ল্যাবরেটরিতে উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য!
Photo : AFP
Akash Misra | News18 Bangla
Updated:Jun 23, 2017 04:42 PM IST

#কলকাতা: রান্নায় এক চামচ। প্রতিদিনের সব রান্নায়। ওইটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু অপরিহার্য। দৈনন্দিন রান্নায়। কোন ক্যুইজের প্রশ্ন নয়। কিন্তু উত্তরটা হলুদ গুঁড়ো। মাসপয়লায়। বাজারে গিয়ে নামি ব্র্যান্ডের দামি মশলাটাই কেনেন। কিন্তু সেই হলুদের প্যাকেটেও যদি মেটানিল ইয়োলো মেলে তাহলে আপনি বলতেই পারেন বিষের রঙ হলদে।

চোট পেলে, ছোটবেলায় ঠাকুমা দিদিমারা বলতেন চুন-হলুদ লাগাতে। চুন-হলুদ গরম করে চোটের জায়গায় লাগালেই ম্যাজিকের মত উপশম। কিম্বা দুধে সামান্য হলুদ দিয়ে খেতে। ক্ষত সারাতে। হলুদ নাকি ধন্বন্তরি। কাপড়ে গুঁড়ো হলুদ জড়িয়ে গরম পুলটিস। সেঁক দেওয়ার জন্য নাকি অব্যর্থ। অ্যান্টিবায়োটিক থেকে অ্যান্টি-অক্সিডেশন। জীবানু নাশক থেকে পোকামাকড় তাড়ানো। সিদ্ধহস্ত এই হলুদ। এমনকি আধুনিক সময়ে, মহিলাদের সাজগোজ থেকে অ্যারোমা থেরাপি কিম্বা বিভিন্ন রোগের ভেষজ চিকিৎসা। বড় উপাদান এই হলুদ। এমন কতশত হলুদ উপকারিতার কথা শুনেছেন ছোটবেলা থেকে। মনে করার চেষ্টা করুন। আগামী দশ মিনিট। আর সেই অবসরে আপনাদের ঘুরিয়ে আনি, হলদে বিষের দুনিয়ায়। যেখানে আপনার প্রতিদিনের হলুদে মেশানো হচ্ছে মেটালিন ইয়েলো। শুধু মাত্র রঙের জন্য।

একসময় ঘরেই গুঁড়ো করে নেওয়া হত। কিম্বা বাটনা বাটার শিলে বেটে নেওয়া হত হলুদ। রান্না থেকে স্নান সবই ওই বাটা হলুদেই চলত। বসন্ত কালে যখন কাঁচা হলুদ উঠত বাজারে। তখন সকালে ঘুম থেকে উঠেই কাঁচা হলুদ আর আঁখি গুড় বা আখের গুড় দিয়ে খাওয়া ছিল মাস্ট। ওই বাটা হলুদ মেশানো তেল মেখে শীতের সকালে স্নান।

স্মৃতিকে ঝাঁকালেই মনে পড়বে সবকিছু। ৯১ সালের পর থেকে বাজার ধরতে শুরু করেছিল গুঁড়ো হলুদ। প্লাস্টিকের র‍্যাপারে মোড়া। তারপর একসময় বড় বড় কোম্পানি ঢুকতে শুরু করলে হলুদ বাজারে। নাম না ব্যবহার করলেও সেই সব ব্র্যান্ড আপনারা চেনেন। নামি কোম্পানি। দামি ব্র্যান্ড। ততোধিক চোখ ঝলসানো বিজ্ঞাপন। টিভি থেকে দৈনন্দিন কাগজে আর ম্যাগাজিনে। মশলার জগতে সবচেয়ে আগে বোধহয় কর্পোরেটাইজেশন হয় হলুদের।

তার মানে গোটা হলুদ, পেষাই করে বিক্রি হচ্ছে কলকাতাতেই। শুধু কলকাতা কেন রাজ্যের অনেক জেলাতে মফস্বলেও বিক্রি হয়। কিন্তু বাজার ছেয়ে গেছে, দামি মশলার কোম্পানির নামি ব্র্যান্ডের প্রোডাক্টে। চটজলদি কিনে আন সহজ। তাঁর ওপর বিজ্ঞাপনের এমন রকমারি কায়দা কানুন। কেউ চোখে জল আনে কেউ গন্ধে মাতোয়ারা, কার বা এক চিমটিতেই রঙ। লাগে অল্প চলে বেশিদিন। স্বাভাবিক মধ্যবিত্ত প্রবণতার নিয়ম মেনেই আপনি আমি বাজারে যাই। প্যাকেজড হলুদ নিয়ে আসি। কিন্তু আদৌ জানিনা কি কি থাকতে পারে সেই প্যাকেটে।

ইনি একধরণের ক্রেতা। সাবধানী। হাতে সময় আছে। সেই কারণে অফিস ফেরতা কিম্বা অন্য কোন কাজের ফাঁকে গোটা হলুদ কিনে ভাঙ্গিয়ে নিয়ে যান। তাঁর দাবি এর ফলে তিনি খাঁটি জিনিস পান। কিছুটা কম দামেও পান। কিন্তু সকলে আর এমন হন না।

তাঁরা ভরসা করেন প্যাকেজড মশলায়।আমার আপনার মত। এই সংখ্যাটাই বেশি। কিন্তু জানেন কি? ওজন বাড়াতে কিম্বা রঙের পরিমাণ বাড়াতে কি কি মেশানো হচ্ছে। জানা গেছে, পরিমাণ বাড়াতে, ওজন বাড়াতে অনেক ব্র্যান্ডেড আর প্যাকেজড হলুদে মেশানো হয় ময়দা। কখনো মেশানো হচ্ছে চকের গুঁড়ো। এবং রঙ বাড়াতে মেশানো হচ্ছে মেটালিন ইয়েলো। ৪৮৬

কর্পোরেট হলুদের জগতে বিষ ঢুকতেও সময় লাগেনি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও কারিগরি বিভাগে পরীক্ষাগারে আপনাদের চোখের সামনে এক্সপেরিমেন্ট। দেখুন কি খাচ্ছেন প্রতিদিন। দৈনন্দিন রান্নার সঙ্গে মেটালিন ইয়েলো। যার ফলশ্রুতি ক্যানসার।

কখনও কি ভেবে দেখেছেন, গোটা হলুদ কেনা আর পেষাই-এর দামের সঙ্গে কি করে বিখ্যাত কোম্পানির নামি দামি হলুদ গুঁড়োর দাম প্রায় কাছাকাছি হয়? ভেবে দেখুন, যেখানে গোটা হলুদের পিছনে কোন বিজ্ঞাপনের খরচ নেই। অথচ হলুদ গুঁড়ো করার মেশিনারির খরচ ছাড়াও, প্যাকেজড গুঁড়ো হলুদ বিক্রি করতে এজেন্ট ডিস্ট্রিবিউটর প্যাকেজিং-এর খরচ আছে। আছে বিজ্ঞাপনের বিপুল খরচ। তাহলে কি করে খোলা বাজারে মেলা গোটা হলুদের দামে প্যাকেজড গুঁড়ো হলুদের দাম প্রায় কাছাকাছি হয়? সেই কারণে স্পেশিমেন সংগ্রহ। বাজার থেকেই। যে সব ব্র্যান্ড আমরা নিয়মিত কিনি।

আরো একটা ঘটনা। ভাঙ্গানো বা পেষাই-এর ফলে প্রতি কেজি হলুদ থেকে মেলে ৭৫০ গ্রাম থেকে ৮৫০ গ্রাম গুঁড়ো হলুদ। এটা নির্ভর করে হলুদের খোসা কতটা পাতলা বা মোটা তার ওপর। সেই কারণে দামের আর ওজনের একটা পার্থক্য থাকেই। আর সেই ঘাটতি মেটাতেই ভেজাল মেশাতে হয়।

তাহলে এটাই হল মূল কথা। ভেজাল বিহীন হলুদ সাধারণ জলে দেওয়া হলে, নীচে গিয়ে জমা হবে। আর জলটাকে স্বচ্ছ হলুদ করে দেবে। ভেজাল থাকলে গোটা জলটাই ঘোলা হয়ে যাবে। এবার কনসেন্ট্রেটেড হাইড্রো-ক্লোরিক অ্যাসিডের দ্রবণে হলুদ স্পেশিমেন দেওয়ার পর গোলাপি রঙ হয়ে যাবে। সেই সল্যুইশনে জল মেশালে অর্থাৎ অ্যাসিড পাতলা করলে গোলাপি রঙ উধাও হয়ে যাবে

এইবার প্রশ্ন, তাহলে বুঝব কি করে, সাধারণ মানুষ জানবেন কি করে? এই খানেই সঙ্কট। গরোয়া পরীক্ষা করে আপনি দেখে নিতেন পারেন। কিন্তু আসল হলুদ না থাকায় তুলনা করার সম্ভাবনা কম। তাহলে উপায়? দেখভাল করতে হবে দেশের আর রাজ্যের সরকারকে।

কী করতে পারে সরকার।

১) মেটালিন ইয়েলো বিক্রি বন্ধ করা

২) কোন কোন ব্র্যান্ডে মেশানো হচ্ছে তাঁদের চিহ্নিত করা

৩) সরকারি আধিকারিকদের রাস্তা থেকে স্পেশিমেন সংগ্রহ করে সেই কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।

কী করতে পারেন আপনি? গোটা হলুদ বাজার থেকে কিনে নিন। নিজের মিক্সিতে গুঁড়ো করে নিন। নইলে মানস রঞ্জন বাবুর মত একটু কষ্ট করুন। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পেষাই করে নিন হলুদ। সুস্থ থাকুন।

অতএব ফিরে চলুন পুরানো পথে। কাঁচা হলুদের দুনিয়ায়। বাজার থেকে শক্ত হয়ে যাওয়া হলুদ কিনে আনুন। লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে গুঁড়ো করান। আর তারপর ব্যবহার করুন। সমস্ত পুষ্টিগুণ পাবেন। ভুলেও পা দেবেন না নামি কোম্পানির দামি প্যাকেজের গুঁড়ো মশলার প্রলোভনে। আর সরকারকে বাধ্য করুন। হলুদের পেটেন্ট নিতে।

First published: 04:42:58 PM Jun 23, 2017
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर