বাবা ভিক্ষুক, উচ্চমাধ্যমিকে স্টার পেয়ে অনিশ্চিত ছেলের পড়াশুনা

Jun 01, 2017 01:07 PM IST | Updated on: Jun 01, 2017 01:10 PM IST

বাবা ভিক্ষুক, উচ্চমাধ্যমিকে স্টার পেয়ে অনিশ্চিত ছেলের পড়াশুনা

#জলপাইগুড়ি: গলায় তুলসির মালা। কপালে তিলক। ধর্মভীরু। নিরামিষভোজী । ইন্দিরা আবাসের এক কামরার ঘরে আর্থিক অনটনের সঙ্গে নিত্য সহবাস। তবু মরচে ধরেনি মেধায়। নুন আনতে পান্তা ফুরোলেও ইতি পড়েনি পড়াশোনায়। উচ্চমাধ্যমিকে প্রাপ্তি চারশো একত্রিশ নম্বর। ভবিষ্যতে অঙ্ক নিয়ে অনার্স করার ইচ্ছে ময়নাগুড়ির শ্রীকৃষ্ণ সরকারের। কিন্তু কিভাবে? ভিক্ষাজীবী বাবা, পরিচারিকা মায়ের বড় ছেলের এখন কলেজে ভরতি হওয়াই অনিশ্চিত। 

ধূপগুড়ির দু নম্বর ওয়ার্ডের কামাতপাড়ায় এখন অকাল বসন্ত । ঘরের ছেলে উচ্চমাধ্যমিকে ৪৩১ নম্বর পেয়ে পাস করেছে। আনন্দ আছে। তবে সব ছাপিয়ে আছে আশঙ্কা আর অসহায়তা।

বাবা হরিদাস সরকার ভিক্ষাজীবী । দু-চোখে ভাল দেখতেও পান না। ৯০ শতাংশ দৃষ্টিহীন ৷ আবছা যেটুকু দেখতে পান তা সম্বল করেই সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ভিক্ষা করে বেড়ান। যেটুকু চাল পান তাই নিয়েই কোনওরকমে দিন চলে চারজনের। মা রঙমালা সরকার। দিন মজুরিতে অন্যের জমিতে কাজ করেন। দিন প্রতি রোজগার একশো কুড়ি টাকা। তাই দিয়েই কষ্টের দিন গুজরান।

পরিবারের বড় ছেলে শ্রীকৃষ্ণ সরকার। ছোট থেকেই মেধাবী। ভালো কীর্তনিয়া হিসেবে এলাকায় নাম আছে । হাজার অনটনেও জং ধরেনি স্বপ্নে। মাধ্যমিকে ৬০৮ পাওয়ার পর এক প্রতিবেশী কিনে দেন পড়ার বই, খাতা, পড়ার টেবিল। আরেকজন দিতেন সামান্য কিছু টাকা। উচ্চমাধ্যমিকে নম্বর ৪৩১। এবার ? কলেজে ভরতি হওয়ার মত কানাকড়িও নেই।

শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছা, ৯১ নম্বর পাওয়া অংক নিয়ে সে কলেজে অনার্স নিয়ে পড়বে। বাবা,মা ও সে নিজেও চিন্তা করছে কলেজে ভর্তি হতে পারবে তো! সাহায্যের জন্য কেউ এগিয়ে না এলে এখানেই পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে ফেলতে হবে। বাবা হরিদাস সরকার বলেন, “ কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে না এলে কি করে যে ছেলের কলেজে ভর্তি হওয়া হবে, তা ভেবেই চোখে জল আসে। ভিক্ষা করে কি কলেজে পড়ার টাকা পয়সা চালানো সম্ভব? ” কিন্তু মা রংমালা সরকার দৃড় প্রতিজ্ঞ। তিনি বলেন, “দিন মজুরের পাশাপাশি ছেলেকে কলেজে পড়ানোর জন্য মানুষের পায়ে পড়ে সাহায্যের জন্য কাঁদব। নিজেরা না খেয়ে হলেও ছেলেকে কলেজে পড়াব।”

টাকার অভাবে মেধাবী শ্রীকৃষ্ণের ছেলের পড়া থেমে যাক, চান না প্রতিবেশিরাও। প্রতিবেশী গোপিন চন্দ্র সরকার বলেন , “বরাবরই শ্রীকৃষ্ণ পড়াশোনায় ভালো মাধ্যমিকেও ভালো করেছিলো এবার উচ্চ মাধ্যমিকেও ভালো ফল করেছে । তবে কলেজে কি করে ভর্তি হবে তা নিয়ে আমরাও চিন্তায় । সরকারি সাহায্য না পেলে বা কোন সহৃদয়বান ব্যক্তি সাহায্য না করলে তাঁর পড়া হয়তো মাঝ পথেই বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন করব তাঁর উচ্চশিক্ষায় সাহায্য করার জন্য ”।

সংসারের অবস্থা দেখে ভবিষ্যতে কি হতে চায় তা এখনো ভাবতেই পারছে না শ্রীকৃষ্ণ। পড়াশুনার পাশাপাশি কির্তন গাইতেও ভালবাসে শ্রীকৃষ্ণ। এলাকায় ভাল কীর্তনিয়া হিসাবেও নাম আছে তার। শ্রীকৃষ্ণ সরকার বলে, “অঙ্ক নিয়ে অনার্স পড়ার ইচ্ছা। কলেজে ভর্তি হওয়াটায় এখনও নিশ্চিত হয়নি। পড়াশুনার বাইরে কীর্তন আমার প্রিয় সময় কাটানোর বিষয়।”

অসহায় বাবা-মা । সাধ থাকলেও, সাধ্য জবাব দিয়েছে। সংসারের হাল দেখে আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতেও ভয় পাচ্ছে শ্রীকৃষ্ণ। তবে কী উচ্চ-মাধ্যমিকেই থেমে যাবে মেধাবী শ্রীকৃষ্ণের পথ চলা।

RELATED STORIES

RECOMMENDED STORIES