২০ টাকার জাল মার্কশিটেই চাকরি, জাল ডাক্তারের পর এবার নকল শিক্ষক

Jul 16, 2017 12:38 PM IST | Updated on: Jul 16, 2017 12:46 PM IST

#কলকাতা: জাল ডাক্তারের পর এবার জাল শিক্ষক। ১৯৯৭ থেকে ২০১৭। টানা কুড়ি বছর। কেউ টিকিটিও ছুটে পারেননি। বহাল তবিয়তে চাকরি করছিলেন নিউ আলিপুরের এক স্কুলে। পড়ানোর স্টাইল দেখে ধন্ধ হয়েছিল সহকর্মীদের। কিন্তু যা হয়। কে আর বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধে? বিশ বছর বাদে ফাঁস সমস্ত জারিজুরি ৷

শিক্ষকের নাম মাজহারুল ইসলাম। কমার্সের শিক্ষক। গত বিশ বছর ধরে পড়াচ্ছেন নিউ আলিপুরের সাহাপুর হরেন্দ্রনাথ বিদ্যালয়ে। ১৯৯৭ সালে জয়েন করেছিলেন এই স্কুলে। সেটা এসএসসি-র আগের যুগ। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি আর প্রধান শিক্ষকই ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন। সেই প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল স্থানীয় ডি-আই অফিসে। চাকরি পেয়েছিলেন শিক্ষক মাজহারুল ইসলাম। শুধু মাজহারুল নয়। এই স্কুলের অনেক শিক্ষকই তখন এই ভাবে চাকরি পেয়েছিলেন। আনন্দ বসু থেকে তৃপ্তিকুমার মৃধা। মানস পাল থেকে মুচিরাম প্রধান। অথবা আপনার পাশের বাড়ি শিক্ষকটির চাকরিও এইভাবে। যারা পিএসসি দিয়ে শিক্ষতার চাকরি পেয়েছিলেন তাঁদের কথা আলাদা।

২০ টাকার জাল মার্কশিটেই চাকরি, জাল ডাক্তারের পর এবার নকল শিক্ষক

সে সময় তিন ধরণের শিক্ষক নিয়োগ হত। আজো হয়। পাশ গ্র্যাজুয়েট, অনার্স গ্র্যাজুয়েট এবং, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট। মেধাগত ভাবে তিন ধরণের শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকার জন্য পে-স্কেলও আলাদা আলদা হত। ফলে তিন ধরণের শিক্ষকের তিন ধরণের বেতন। নিয়ম ছিল শিক্ষাগত যোগ্যতা বৃদ্ধি পেলে ফের নতুন স্কেলে চাকরি করতে পারতেন আগের শিক্ষক। বেতন বৃদ্ধি হত। ফলে শিক্ষকদের মধ্যে শিক্ষাগত যোগ্যতা বাড়িয়ে নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যেত।

বছর কয়েক আগে রাজ্য সরকারের শিক্ষা দফতরের নির্দেশ আসে স্কুলে। সকল শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত যাবতীয় শংসাপত্র পরীক্ষা করে দেখবার জন্য। সেই মত সমস্ত শিক্ষক নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতার যাবতীয় নথি জমা দেন স্কুলে। সমস্ত পরীক্ষার মার্কশিট আর রেজিস্ট্রেশন নাম্বার এবং সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট।

সবাই তাঁদের নথি সময় মত জমা দিলেও কমার্সের শিক্ষক দেন না। তার নাম মাজহারুল ইসলাম। তিনি তাঁর এমকমের মার্কশিট জমা দেন শুধু। বাকি সমস্ত কিছু, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট, রেজিস্ট্রেশন নম্বরের প্রত্যয়িত নকল বা ফোটোকপি কিন্তু জমা পড়ে না। কিন্তু মার্কশিটের যে ফোটোকপি জমা পড়েছে তা দেখেই চক্ষু কপালে বেশিরভাগ শিক্ষকের। তাঁরা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলেন না মার্কশিটের চেহারা এমন হয় কি করে? এমন কোন ইউনিভার্সিটি এদেশে আছে যারা এমন কদর্য এমন দায়সারা চেহারার হতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ জমা পড়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে।

স্কুল ম্যানেজিং কমিটির বৈঠকও ডাকা হয়। সেখানে রেজিলিউশন হয়। সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সন্দেহজনক মার্কশিট পাঠানো হবে ডি–আই অফিসে। সেই মত ডি-আই অফিসেও জানানো হয়। কিন্তু বারো মাসের বদলে আঠারো মাস কেটে গেলেও, শিক্ষক মাজহারুল ইসলামের শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত ফাইলের কোন নড়চড় হয়নি। যেমন কার ফাইল তেমনই রয়ে গেছে।

হেড মাস্টার মশাইয়ের প্রতিনিধি হয়ে শিক্ষক মুচিরাম প্রধান গিয়েছিলেন ডি-আই অফিসে। এই কথা জানতে। সহকর্মী শিক্ষাগত যোগ্যতার ফাইলের অগ্রগতি কদ্দুর। জানতে তো পারেনইনি উলটে ভুয়ো ফোন নম্বর থেকে শুনেছেন হুমকি। ওই ফাইলের নড়াচড়া নিয়ে বেশি কৌতূহল দেখানোর জন্য।

এ কথা স্বীকার করেন স্কুলের আরেক শিক্ষকও। নাম মানস পাল। তিনিও জানিয়েছেন কিভাবে ২০১৬ সালের ফাইল ১৮ মাস ঘুরে গেলেও নড়াচড়া করেনি। বরং ডি-আই অফিসের ডিলিং স্টাফ, সুদীপ্তবাবু নাকি বেজায় রেগে জানিয়েছেন, শিক্ষক মাজহারুল ইসলামের শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত ফাইলের নড়াচড়া নিয়ে কিছু জানাতে নাকি তিনি বাধ্য নন।

এটাও জানাতে বাধ্য নন, কেন আঠারো মাসেও তা ডি-আইএর টেবিলে পৌঁছায়নি। বুঝুন অবস্থা। মানস পালও জানিয়েছেন, তার সহকর্মীর মোবাইলে হুমকির ফোন। অথচ ঐ শিক্ষক ডি-আই অফিস যাওয়ার আগে। স্কুল ম্যানেজিং কমিটির বৈঠক হয়। সেই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রধান শিক্ষকের প্রতিনিধি হিসেবে গিয়েছিলেন ডি আই অফিসে।

এর আগেও নিউ আলিপুরের সাহাপুর হরেন্দ্রনাথ বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষকের জাল মার্কশিট আর সার্টিফিকেট জমা দেওয়ার ঘটনা ঘটে। ২০০৮ সালে। অভিযোগ ছিল বাংলার শিক্ষক মানিক অধিকারির বিরুদ্ধে। জাল সার্টিফিকেট জমা দিয়েছিলেন তিনি। দুমাসের মধ্যে কড়া ব্যবস্থা নিয়েছিল তৎকালীন ডি-আই। আর এবারের ডি আই ইতোমধ্যেই কাটিয়ে দিয়েছেন ১৮ মাস।

তাহলে কি গোড়াতেই গলদ? একই স্কুলে দু-দুবার জাল সার্টিফিকেটের ঘটনা। একবার ২০০৮ সালে আর একবার ২০১৭। ন’বছরের ব্যবধান মাঝখানে। দু’বারই জাল মার্কশিটের ঘটনা ঘটল কি করে? তাহলে কি ইন্টারভিউ চলাকালীন কোন বেনিয়ম হয়েছিল? প্রশ্ন এক।

প্রশ্ন দুই, ন বছর আগে যে তদন্ত দুমাসের মধ্যে সেরে ফেলা গেল এবার কেন আঠারো মাসেও বছর ঘুরছে না। কি আছে পিছনে দেখুন।

একটা মার্কশিট। নিজেরটাই খুলে দেখুন। সেখানে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম লোগো সবকিছু ছাপানো থাকে বিশেষ সুরক্ষার সঙ্গে। নম্বরের জায়গা গুলো দেখুন। কত নম্বরে পরীক্ষা দিচ্ছেন অর্থাৎ পূর্ণমান কত। পাশ মার্ক কত। এবং পরীক্ষার্থী কত নম্বর পেয়েছেন। কোন ডিভিশন সব লেখা থাকে যথাযথ। তলায় সই থাকে, নিয়ামক থেকে রেজিস্টার এবং উপাচার্যের। কিন্তু এই মার্কশিটে একটা দুটো নয়। গোটা মার্কশিটটাই ভুলে ভরা। নেই বিশ্ব বিদ্যালয়ের লোগো। নেই পূর্ণমান। নেই পাশ মার্কস। আছে শুধু প্রাপ্ত নম্বর। মোট নম্বর ৪৩৭ Only।

teacher fake certificate

only! হ্যাঁ ওনলি। সুপার মার্কেটের বিলের নীচে যেমন। যেমন চেকের শেষে লেখেন আপনি। রেস্তোরাঁ বিলের নিচে যেমন লিখে দেওয়া হয়। ঠিক তেমন এই মার্কশিটে “টোট্যাল নাম্বার”-এর পর লেখা ওনলি।

এই মার্কশিটের দাম কুড়ি টাকা মাত্র। এবং আরেক বিচিত্র তথ্য। যে বছর পরীক্ষা দিয়েছেন তার পরের বছর ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রেশন পেয়েছেন শিক্ষক মাজহারুল ইসলাম। রেজিস্ট্রেশন নম্বর 91853 of the year 1996, অথচ পরীক্ষা দিচ্ছেন ১৯৯৫ সালের পরীক্ষার্থী হিসেবে। পরীক্ষা হয়েছে ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে।

তার সহকর্মীরাই বলছেন এমন অদ্ভুত রেজাল্ট তাঁরা আগে কখনো দেখেননি। মাধেপুরার লালু নগরের বি এন মণ্ডল বিশ্ববিদ্যালয়ের এম কম পরীক্ষায় ভাইভা হয় বুঝি। বেশির ভাগের দাবি তাঁরা এমন কখনও শোনেননি।

RELATED STORIES

RECOMMENDED STORIES