ব্লগ: পার্থ দে- ‘দ্য টপিক’

Feb 23, 2017 04:46 PM IST | Updated on: Feb 23, 2017 06:45 PM IST

পার্থ দে চলে গেলেন। নাহ্। নিঃশব্দে নয়। সে অধিকার তিনি অনেকদিন আগেই হারিয়েছেন। বছর দুয়েক আগে যখন তাঁর বাড়ি থেকে তাঁর দিদির কঙ্কাল উদ্ধার হল, ঠিক সেদিন থেকেই। সে দিন যেন একটা ছোটখাটো ভূমিকম্পই হয়ে গেল কলকাতায়। টপিকের সে এক চরম দুর্দিন তখন। লোকসভা-বিধানসভা-নিদেন পক্ষে পুরসভা ভোটও নেই। কোথাও কোনও চমকপ্রদ গ্যাং রেপ হয়নি। উচ্চমানের কোনও জঙ্গিহানা হয়নি। রসালো পরকিয়ার মিস্টিক পরিণতির কোনও খবর নেই। শাহরুখ-সলমনের কোনও রিলিজ নেই। মোদ্দা কথা বাংলা বাজারে কোনও টপিক নেই।

ব্লগ: পার্থ দে- ‘দ্য টপিক’

অফিসের আলসে দুপুর, বিকেলের চায়ের ঠেক আর সন্ধের প্রাইমটাইম প্যানেল ডিসকাসশন একটা টপিক পেল। টপিকের মরা গাঙে বান ডাকলেন পার্থ দে।

- বলেন কি, দিদির মৃতদেহের সঙ্গে বসবাস?

- বসবাস, না কি সহবাস?

- নেক্রোফিলিয়া?

- শবসাধনাও হতে পারে।

- হ্যাঁ। ঘরের কোণে স্পিকারে সব সময় মন্ত্রপাঠ হত।

- জানতে পেরেই তো বাবাটা..

- ইস্ কী কপাল ভদ্রলোকের!

- কাল দুপুরের দিকে কী করছেন? চলুন না, বাড়িটা দেখে আসি।

- রবিনসন স্ট্রিট? কিন্তু পুলিশ তো শুনছি ঢুকতে দিচ্ছে না?

- বাইরে থেকেই একটা করে সেলফি তুলে নেব চলুন..

কী ফ্যামিলি রে বাবা। কুকুরের শোকে দিদি নাওয়া খাওয়া ভুললেন। কুকুরের কঙ্কাল বিছানায় রেখে একদিন নিজেই মরে গেলেন। আর তার ভাই আবার সেই দিদির কঙ্কাল সেইভাবেই বিছানায় রেখে দিব্বি মাস ছয়েক কাটিয়ে দিলেন। এ সব জানার পরে বেচারা বাবা বাথটবে বসে গায়ে আগুন লাগিয়ে দিলেন। তা সেই ফ্যামিলির একমাত্র জীবিত স্পিসিসটিকে তো কাল্টিভেট করতে হচ্ছে মশাই। ব্যাস্। নাওয়া খাওয়া ভুলে চলল ব্রেকিং নিউজের ঝড়।

লকআপে নাকি মাঝেমাঝেই বিড়বিড় করেন পার্থ দে। তাঁকে কী খেতে দেওয়া হচ্ছে.. রাতে ঘুমোচ্ছেন কি না। হপ্তা দুয়েকের জমাটি টপিক। চ্যানেলে চ্যানেলে কাগজে কাগজে রোজ রোজ নতুন নতুন বিশেষণ প্রয়োগ। আর সমাজের ধারক ও বাহক মনে করা(যদিও তাঁদের সে রকম ভাবতে সাহায্য করার দায়ও সমাজেরই)মান্যিগন্যি ব্যক্তিরা পার্থ দে-র মানসিক-শারীরিক-চারিত্রিক দিক নিয়ে আলোচনায় মেতে উঠলেন। কোনও আইন তদন্ত বিচার দরকার পড়ে না। জাস্ট দাগিয়ে দিলেই হল। ড্রয়িংরুমে বসা সুধী জনগণ সাধুবাদ জানাল। টপিক বলে টপিক। তা সেই টপিক পার্থ দে ও একসময় বোরিং হয়ে পড়লেন। চমকপ্রদ কিছুই করতে পারছিলেন না, যা নিয়ে একটু কটা দিন মেতে থাকা যায়। বিক্রম ভাটের সিনেমার মতো জোলো হতে লাগলেন যখন থেকে, তখন থেকে আমরাও পার্থ দে-র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। আর একটা টপিকের খোঁজ পড়ল।

কিন্তু গত দু'বছর পার্থ দে কী করছিলেন? খবর রাখিনি। তিনি যদি নিয়মিত দুটো বা তার বেশি এসকর্ট সার্ভিস নিতেন, তাহলে হয়তো খবর হতো। যদি পুরুষ বন্ধুর গলা জড়িয়ে ইনস্টাগ্রামে ছবি পোস্টাতেন, তাহলে তাঁর সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন নিয়ে কটা লাইন ঝটপট লিখে, সকালের চায়ের সঙ্গে টপিকসম্ভোগীদের খাইয়ে দেওয়া যেত। সন্ধের টক ঝাল চাট হতে গেলে পার্থ দে-কে মেডিকাল কলেজে গিয়ে বলতে হতো, "দিন না দাদা, এক পিস কঙ্কাল। রাতে কিছুতেই ঘুম আসছে না।" নিদেনপক্ষে বিয়ের পিঁড়িতে বসলেও টপিক হতে পারতেন।

horror-house

ও সব কিছুই করেননি পার্থ দে। কী করেছেন, আসুন আন্দাজ করার চেষ্টা করি। একটা মানুষ এক্কেবারে একা। হয়তো আর দশজনের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য কোনও চাকরির দরখাস্ত করেছিলেন।

- পার্থ দে.. পার্থ দে। নামটা এত চেনা চেনা লাগছে কেন বলুন তো? আপনি কি..

- আমি কী?

- আপনি.. আপনি.. আপনি কি রবিনসন স্ট্রিটের সেই..

- হ্যাঁ। আগে ওখানেই থাকতাম। বছরখানেক হল অন্য একটা ফ্ল্যাটে..

- দেখুন মিস্টার দে। আপনি তো এখনও আন্ডার ট্রিটমেন্ট।

- না। মানে সে রকমভাবে.. আমি

- দেখুন যে পোস্টের জন্য আপনি অ্যাপ্লাই করেছেন। কোয়ালিফিকেশন বা এক্সপেরিয়েন্স ক্রায়েটেরিয়া ম্যাচ করে যাচ্ছে। বাট.. বুঝতেই তো পারছেন, যা ওয়ার্ক প্রেশার সুস্থ মানুষই পাগল হয়ে যাচ্ছে আর আপনি তো.. ওহ্ সরি। আপনাকে হার্ট করতে চাইনি বাট..

- আই ক্যান আন্ডারস্ট্যান্ড।

ধরা যাক, নর্থ বেঙ্গলে অর্কিড করবেন বলে ব্যাঙ্কে লোন নিতে গিয়েছেন। ম্যানেজার লোনের বিষয়ে ডিসকাস করতে করতে হালকা মেজাজে হেসে জানতে চাইলেন, সত্যিই দেবযানী দে-র সঙ্গে তাঁর কোনও ইয়ে ছিল কি না। বা, তাঁর ডেডবডির সঙ্গে পার্থ দে ঠিক কী কী করতেন। কী উত্তর দিয়েছিলেন পার্থ দে, জানা নেই। তবে সপাটে একটা চড় মারেননি। বা টেবিলে রাখা পেপারওয়েট ছুঁড়ে মারেননি নিশ্চয়ই। তাহলে ফের টপিকের মরা গাঙে বান আসতো।

দেশপ্রিয় পার্কে হাজার হাতি দুর্গা দেখতে নিশ্চয়ই যাননি। তা হলে সেলফিশিকারিদের চোখ এড়াত না। লাইভ কভারেজের এ চান্স কোনও চ্যানেলই মিস করতো না। পার্কস্ট্রিটে যিশুপুজোর প্রাক্কালে থাকলেও থাকতে পারেন। তবে তা ও হয়তো একটু আড়ষ্ট হয়ে। সোসাইটির ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে। কে জানে যদি কেউ জানতে চায়, - "সব ধরণের কঙ্কালেই কি তাঁর আসক্তি, নাকি কোনও বিশেষ ধরণের কঙ্কাল?"

কোনওদিন কোনও পার্কে গিয়ে বিকেলে বসেছেন কি পার্থ দে? তাঁকে চিনতে পারার পর কেউ কি তাঁদের বাচ্চাকে একটা আইসক্রিম আর বেলুন কিনে দেওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন? পার্কের ম্যানেজমেন্টকে গিয়ে কেউ কমপ্লেন করেননি তো, কেন পার্থ দে-কে চিলড্রেন্স পার্কে ঢুকতে দেওয়া হল?

ওয়াটগঞ্জ এলাকার ওই ফ্ল্যাটবাড়ির সবাই জানতেন তো, যে ইনিই সেই পার্থ দে-দ্য টপিক। জানলে কি ওই ফ্ল্যাটবাড়ির সবাই খুব সহজভাবে মেনে নিতেন? ওই এলাকায় ফ্ল্যাটের দাম কমে যেত না তো? এ সব প্রশ্নের আজ আর দরকার নেই। একটা মানুষের বাঁচার অধিকার আমরা দক্ষ হাতে সুনিপুণভাবে ছিনিয়ে নিয়েছি। নিঃশব্দে চলে যাওয়ার অধিকারও।

সত্যিই তো। বেঁচে থেকে কী করতেন পার্থ দে? ভোটে দাঁড়াতেন, না অলিম্পিকে নামতেন? বরং একটা মানুষ একটা গোটা জীবনে অনেক কষ্ট করেও যা হয়ে উঠতে পারেন না। ইনি তো তা হয়েছিলেন। বাংলা বাজারে মস্ত একখান টপিক হয়েছিলেন পার্থ দে। আক্ষেপ একটাই। তাঁর এই নতুন ফ্ল্যাটটা থেকে কঙ্কাল-টঙ্কাল জাতীয় কিছু পাওয়া যায়নি আর ফ্ল্যাটের অন্দরে আদিভৌতিক পরিবেশও ছিল না। তাতে কি? সচিনও শেষ ইনিংসে তেমন রান পাননি।

RELATED STORIES

RECOMMENDED STORIES