একটা ছবি, এক অজ্ঞাত জার্মান সৈনিক ও বেহালার সুরে স্তালিনগ্রাদের আর্তনাদ

Akash Misra | News18 Bangla
Updated:Jan 31, 2018 04:33 PM IST
একটা ছবি, এক অজ্ঞাত জার্মান সৈনিক ও বেহালার সুরে স্তালিনগ্রাদের আর্তনাদ
একটা ছবি, এক অজ্ঞাত জার্মান সৈনিক ও বেহালার সুরে স্তালিনগ্রাদের আর্তনাদ
Akash Misra | News18 Bangla
Updated:Jan 31, 2018 04:33 PM IST

#বার্লিন: জানুয়ারি ২৩, ১৯৪৩। স্তালিনগ্রাদ পকেটে আটকে পড়েছে জেনারেল ফ্রিডরিখ পলাসের অপরাজেয় সিক্সথ আর্মি। প্রতিদিনই ক্রমশঃ ছোট হয়ে আসছে পকেটের আয়তন। প্রতিদিনই আসছে খারাপ খবর। বাইরে তিক্ত শীত আর তিক্ততর শত্রু। পর্যাপ্ত শীতের পোশাক না পরা, বহুদিন পেট ভরে না খেতে পাওয়া ছায়ামূর্তিরা চলাচল করছে বাঙ্কারের ভিতর। দেখে কখনও কখনও মানুষ মনে হয় তাদের, আসলে নয়। সিক্সথ আর্মির সব্বাইকে স্তালিনগ্রাদ পরিণত করেছে প্রেতাত্মায়।

গত বছরের ২৩ শে অগস্ট এই শহরের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিলেন ভন পলাস। স্তালিনের নামাঙ্কিত এই শহর যেন তেন প্রকারেণ অধিকার করতে চেয়েছিলেন অ্যাডলফ হিটলার, স্তালিনগ্রাদ যেন তাঁর রাশিয়া জয়ের ট্রফি। পলাস ভেবেছিলেন বিজয়ীর গর্বে পদতলে দলিত করবেন এ শহর, উপহার দেবেন ফ্যুহরারকে। বিগত পাঁচ মাস ধরে চলে আসা ভয়াবহ যুদ্ধের পর, আজ আর ভাবেন না তা। এই ক' মাসে শহরের প্রতিটি ইঞ্চির দখল পেতে লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। সিক্সথ আর্মি লড়েওছে, পলাস চোখের সামনে দেখেছেন মৃত্যুর মিছিল। স্তালিনগ্রাদ শহরটা এখন শুধুই কঙ্কাল। একটিও বাসযোগ্য বাড়ি নেই সেখানে, পুরোনো অধিবাসীরা সব মৃত। আর এই ভাঙা কংক্রিটের জঙ্গলে কোথায় যে ওঁত পেতে আছে মৃত্যু, তা কেউ জানে না। যুদ্ধের আগে শিল্পাঞ্চল বলে এ শহরের খ্যাতি ছিল। ট্রাক্টর ফ্যাক্টরি, রেড স্টার ফ্যাক্টরি, রেলওয়ে স্টেশন, গ্রেইন এলিভেটর আজ সর্বত্র শুধু ধ্বংস, সর্বত্র শুধু মৃতের স্তূপ। জার্মান ও রাশিয়ান মিলে মিশে আছে সেখানে, মৃত মানুষের কোনো জাতিভেদ থাকে না।

নভেম্বর মাসে শুরু হয়েছিল অপারেশন ইউরেনাস। ডন নদী বরাবর সাঁড়াশি আক্রমণ চালিয়েছিল রেড আর্মি। ঘিরে ফেলেছিল রোমানিয়ান ও জার্মান অবস্থানগুলিকে। তার পর থেকে পিছুই হঠেছেন কেবল পলাস। ডনের অপর প্রান্ত থেকে ফিল্ড মার্শাল ভন ম্যানস্টাইন উদ্ধার করার চেষ্টা করেছিলেন তাঁকে একবার, কিন্তু সে সম্ভাবনাও বিনষ্ট হয়েছে। ফলে, প্রায় এক লক্ষ কুড়ি হাজার সৈন্য নিয়ে স্তালিনগ্রাদের নরকে পলাস আজ অসহায়।

IMG-20180123-WA0000

এইমাত্র তাঁর কাছে খবর এলো, জার্মান অধীনে থাকা একমাত্র এয়ার স্ট্রিপটির পতন হয়েছে। যার অর্থ, আকাশপথেও আর কোন সাহায্যই আসবে না স্তালিনগ্রাদে। আসবে না খাদ্য, অস্ত্র, শীতবস্ত্র, চিকিৎসা। এর অর্থ ঈশ্বরও তাঁদের পরিত্যাগ করলেন।

ইতিমধ্যে দু বার আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছে রেড আর্মি। দুবারই তা নাকচ করেছে হাইকমান্ড, ঠিক যেভাবে নভেম্বরে তাঁর পশ্চাদপসরণের আকুল আবেদন ফিরিয়ে দিয়েছিল তাঁরা। সর্বশক্তি দিয়ে ধরে রাখতেই হবে স্তালিনগ্রাদ! এই গতেবাঁধা বুলিই আওড়ে যাচ্ছেন ফ্যুহরার, এখনও! পলাসের মোহভঙ্গ হচ্ছে, তিনি বুঝতে পারছেন তাঁর, সিক্সথ আর্মির, সমগ্র জার্মান সৈন্যবাহিনীর এমন কি গোটা জার্মানজাতিরই ভাগ্যাকাশে ঘনিয়েছে প্রগাঢ় মেঘ। এক উন্মাদের হাতে অর্পিত হয়েছে সর্বোচ্চ ক্ষমতা। অসহায় বোধ করছেন পলাস, তাঁর ও তাঁর অধীনস্থ সৈন্যদের ভবিষ্যৎ ভাবলেও তাই শিহরিত হয়ে উঠছেন তিনি।

এরকমই এক সময়ে নেওয়া হয়েছিল এই ফোটোগ্রাফ। এক অজ্ঞাতকুলশীল ফোটোগ্রাফার কর্তৃক, এক অজ্ঞাত জার্মান সৈন্যের। এই রকম অন্ধকার সময়েও, নিশ্চিত মৃত্যু যখন ক্রমে তার পক্ষবিস্তার করছে তখন, কী সেই ক্ষণিকের মুক্তি যার জন্য মানুষ বেছে নিতে পারে সঙ্গীত? এই ছবি তাই মৃত্যুর প্রতি একটি স্টেটমেন্ট বলে মনে হয় আমার। যা একাধারে মৃত্যুর বার্তাবহ অথচ জীবনের চিৎকৃত উদঘোষ।

৩১ শে জানুয়ারি আত্মসমর্পণ করে গোটা সিক্সথ আর্মি। আত্মসমর্পণ করে প্রায় এক লক্ষ ত্রিশ হাজার লোক। আত্মসমর্পণের আগে হিটলার পলাসকে পাঠান আত্মহত্যার ইশারা। রোমান ক্যাথলিক পলাস তা করতে অস্বীকার করেন, এই উন্মাদের আর কোনও কথা শুনবেন না তিনি। সোভিয়েত বাহিনী তাড়িয়ে নিয়ে যায় তাঁদের সাইবেরিয়া। প্রায় অভুক্ত অবস্থায় দীর্ঘ, শীতার্ত পথ পাড়ি দিতে গিয়ে মারা যান প্রায় ষাট হাজার জার্মান। আরো প্রায় ষাট হাজার মারা যান সাইবেরিয়ান গুলাগে পচে। টাইফাস মহামারীর রূপ নিয়েছিল, ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল যুদ্ধবন্দীদের ক্যাম্প। যুদ্ধশেষে জার্মানি ফিরে আসেন সিক্সথ আর্মির মাত্র ছ হাজার লোক। ফ্রিডরিখ পলাস ছিলেন তার মধ্যে অন্যতম। ।মাত্রই ছ হাজার.. স্তালিনগ্রাদের পাপ।

Writer: Ritwik Ghosh 

First published: 04:33:43 PM Jan 31, 2018
পুরো খবর পড়ুন
अगली ख़बर