ভোরাই চণ্ডী, ক্যাপ-বন্দুক, মায়ের মুখ

Sep 29, 2016 07:11 PM IST | Updated on: Sep 30, 2016 04:04 PM IST

‘৮৪ ৷ হাজার নয়, উনিশ’শো ৷ মায়েদের জন্য বছরটা ভালো নয় ৷ আমার অন্তত তেমনই মনে হয় ৷ জীবনের ‘জরুরি’ সময়টা পেরিয়ে গিয়েছিল বোধহয় ৷ একচ্ছত্র ক্ষমতা, জনতার ছুঁড়ে ফেলা, আবার মাথায় তোলা-এসব দেখে ফেলেছেন ৷ এসবই, যাকে বলে সাবজেক্ট (নাকি অবজেক্ট) অব ‘গ্রে ম্যাটার’ ৷ অনেকটা ওরকমই ‘গ্রে’ ক্যারেক্টার ‘আদরে’র ছোটো ছেলে ৷ দুধ সাদা কুর্তা-পাজামায় সেই যে উড়ে গেল, গগলসে ঢাকা পড়ল ‘স্নেহান্ধ’ মায়ের চোখ ৷ তারপর স্বর্ণমন্দিরের ‘অপারেশন’ ৷ আর ৩১ শে অক্টোম্বর গুলিতে ঝাঁঝরা ভারতীয় রাজনীতির সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘মা’ ৷ হঠাৎ, ছুটি হয়ে গেল স্কুল ৷ কল্যাণী সেন্ট্রাল পার্কের সামনেটা অসম্ভব চুপচাপ ৷ বন্ধুরা অধিকাংশই বাড়ি চলে গেছে ৷ গুটি কয় ‘ফ্রেন্ডস ইন নিড’ সমেত আমি ভ্যান কাকুর অপেক্ষায় ৷ যে খাঁচা গাড়িতে করে বাড়ি নিয়ে যাবে ৷ ‘ভ্যান কাকু’ এল না ৷ বদলে প্রায় ছুটতে ছুটতে এল মা ৷ জনশূন্য রাস্তায় আমি আর মা প্রায় দৌড়চ্ছি ৷ একে একে পেরিয়ে যাচ্ছি সেন্ট্রাল পার্ক, ৭ নং, কংগ্রেস রোড ৷ সেদিন মায়ের মুখ দেখেই মনে হল, হাওয়া খারাপ ভূষণের কালাকাঁদ দেখেও দেখলাম না ৷ অল্প অল্প শীত পড়ে যায় এ সময় ৷ তাতেও মা ঘামছে ৷ আমিও৷ শেষমেশ, ওই ৯ নং ৷  বাড়ি ঢুকেই ধপ করে বসে পড়ল মা ৷ আমি এতক্ষণে প্রথম প্রশ্নটা করলাম ৷ কী হয়েছে মা? তখনও টিভি আসেনি আমাদের বাড়িতে ৷ মা রেডিও চালাতেই শুনলাম হিন্দি খবর হচ্ছে ৷

‘এক জরুরিু সূচনা’ ৷ প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী কা স্থিতি আভি তক আফতসীমাকে বাহার নেহি হ্যায় ৷ আমার দিকে ফিরে মায়ের উত্তর, ‘আমাদের প্রাইম মিনিস্টারকে তার বর্ডিগার্ডরা গুলি করেছে ৷’ আমি তখন জানি, আমাদের প্রাইম মিনিস্টার ইন্দিরা গান্ধী, চিফ মিনিস্টার জ্যোতি বসু, প্রেসিডেন্ট জৈল সিং আর গর্ভনর উমাশঙ্কর দীক্ষিত ৷ কিন্তু যেটা বুঝতে পারছি না, এই গুলিটা ঠিক কেমন? বন্দুক গুলোই বা কেমন দেখতে? আমার ক্যাপ বন্দুকের মতো? মাস খানেক আগেই আমি প্রথম ‘সশস্ত্র’ হয়েছি ৷ আহা, সে কী অনুভূতি ! একটা লোক রেডিয়ও চেঁচাচ্ছে, গর্জ গর্জ ক্ষণং মূঢ় ! আবার বলছে, রূপং দেহি, জয়ং দেহি...৷ আমিও চোখ বুঁজে মনে মনে বললাম ৷ ‘ক্যাপ বন্দুকের এই যুদ্ধে আমি যেন জিতি মা ৷’ ওদিকে দেবীর সামনে মহিষাসুর ৷ আমার সামনে সরাসরি কেউ নেই ৷ কিন্তু আশপাশের বাড়িতে আমার বন্ধুরা ৷ সেখান থেকেও দেদার গুলির আওয়াজ ৷ ভোর পাঁচটায় ‘মহিষাসুর বধে’র কাছাকাছি সময়েই থামল আমাদের ফায়ারিং ৷ আগের দিন সন্ধ্যেয়, পাড়ার কার্তিক কাকুর দোকান থেকে মার কিনে দেওয়া, এক বান্ডিল ক্যাপ শেষ ৷

ভোরাই চণ্ডী, ক্যাপ-বন্দুক, মায়ের মুখ

বেলা বাড়তেই মায়ের কাছে আবদার ৷ আরও এক বান্ডিল ক্যাপ চাই ৷ বাবা তখনও ফেরেনি ৷ ফেরেনি মানে, পুরুলিয়া থেকে ৷ সেই বছরই পেটের টানে, বদলির নির্দেশ মেনে বাবা গিয়েছে পুরুলিয়া ৷ মা তখন ২৮, আমি পাঁচ ৷ বাজার ফেরত পয়সা গুনছে মা ৷ ঘামে ঘেঁটে গিয়েছে কপালের লাল সিঁদুরের টিপটা ৷ আমিও গুনছি, মনে মনে ৷ কুড়ি, তিরিশ, পঞ্চাশ, পঞ্চান্ন, পঁয়ষট্টি ৷ এক বাক্স কুড়ি পয়সা ৷ দশ প্যাকেটে বান্ডিল ৷ এক বান্ডিল দু’টাকা৷ আমার আর মা-র গোনা প্রায় একই সময়ে শেষ হল ৷ পাঁচ, দশ আর কুড়ি পয়সায় মোট এক টাকা হাতে নিয়ে মা বলল, এক বান্ডিল হবে না রে ৷ পাঁচ প্যাকেট হবে ৷ আমি ততক্ষণে ছকে নিয়েছি ৷ পেপে গাছের পাশে বাপ্পার সঙ্গে মুখোমুখি না হয়ে, নিম গাছের পিছনে লুকিয়ে আজ লড়াই হবে ৷ বাবুনকে কাঁঠাল গাছের পিছন থেকে ৷ শিবুটা খুব চালাক ৷ বাপ্পা, বাবুনকে এক এক প্যাকেট কাবু করে শিবুর জন্য দু’ প্যাকেট রাখলেই হবে ৷ তাহলেই আজ সবকটা ‘ডাকাত’ মেরে, ‘পুলিশ’ আমি জিতে যাব ৷ মার কাছ থেকে খুচরো গুলো নিয়ে এক ছুটে কার্তিক কাকুর দোকান৷ সেবার পুজোয় স্টিলের ‘রিভলবার’ আর পকেট ভর্তি ক্যাপ নিয়ে আমি বেশিরভাগ লড়াইতেই জিতেছিলাম ৷ দশমীর দিন মা যখন দুগ্গা ঠাকুরের মুখে সন্দেশ গুঁজে দিচ্ছে, তখন হঠাৎ মনে হল মায়ের সঙ্গে মা দুগ্গার কত মিল ! ওই তো মা দুগ্গারও টিপটা ঘেঁটে গিয়েছে ৷ নিশ্চয়ই মার মতো বাজার করতে গিয়েছিল ৷ শুধু এটাই বুঝতে পারিনি, দোকানের কার্তিককাকু তো দুগ্গা ঠাকুরের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ৷ তাহলে দোকানের লোকটা কে?

RELATED STORIES

RECOMMENDED STORIES