ক্যালাইডোস্কোপ

Feb 12, 2016 05:47 PM IST | Updated on: Feb 12, 2016 05:52 PM IST

সেই কবেকার কথা। সময় মেপে বলতে গেলে কঠিন হয়ে যাবে। বরং সহজ করে বলা ভালো। সেই সময়ের কথা, যখন একটা সাইকেল পেলেই ‘জো জিতা ওহি সিকন্দর’-এর আমির খান। আর কেউ চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গেলে ‘রাজু বন গ্যয়া জেন্টলম্যান’-এর শাহরুখ। কভি হাঁ কভি না-র অ্যানা-রা তখন স্কুল পেরিয়ে, পাড়া পেরিয়ে, মনের ঘরে সিঁদ কাটতে পারতো অনায়াসে। পাওয়ার না থাকলেও কার্বন ফ্রেমের চশমা পরতে শিখিয়েছিল বাজিগর। নাহ্। তখনকার বাংলা সিনেমা কখনও মনে দাগ কাটেনি। তবে বাংলা বই চলত কোনও কোনও হলে। আর মিনার-বিজলি-ছবিঘর এক নিঃশ্বাসে উচ্চারণ হতো।

ভালোবাসা মানে তখন ধোঁয়া ছাড়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। তাই প্রেমে পড়লেই সিগারেট মাস্ট। একবার ভালোবেসে বললেই ছেড়ে দেওয়া যাবে। ভালোবেসে বলবে... এই ভরসায় ধরে ফেলা সিগারেট ছাড়েনি অনেকেই পরে। তাদের অনেককেই কেউ কোনওদিন ভালোবেসে বলেনি বলে হয়তো.. যদি একবারও বলতো! তাহলেই কিন্ত ভালোবাসা মানে অর্চিস গ্যালারি হয়ে যেতে পারতো। আর্চিস গ্যালারি। ঢুকলেই কেমন একটা রোমাঞ্চ হত। যাকে চাই তাকে দিতে চাই সবটুকু মোর পকেট খরচ। এ সত্যির চিরসাক্ষী মোড়ের মাথার আর্চিস গ্যালারি। তখন বড় রাস্তা চওড়া করার দরকার হয়নি। তাই কৃষ্ণচূড়ার আবির নিয়ে আকাশের হোলি খেলার স্বাধীনতা ছিল। তখন ভোরের কুয়াশায় ভেজা বকুল ফুল ছিল আর রাজপথ দিয়ে গান শেখার ইস্কুলও যেত। ছিল বছরের একটা দিন একই সঙ্গে দু’জায়গার পুজোয় দাদাগিরি করার সুযোগ। সরস্বতী পুজো। একটা স্কুলে আর একটা পাড়ায়। এক জায়গায় ক্লাসরুম সাজানোর প্ল্যান আর এক জায়গায় আগের রাতে বাঁশ চুরি করে এনে মন্ডপ করার তাগিদ। এখন মনে হয়, সে সময় দুর্গাপুজোর থেকেও সরস্বতী পুজোর একটা আলাদা বা হয়তো কিছুটা বাড়তি উন্মাদনা ছিল। বিদ্যার্থীদের পুজো। এই কথাটার মধ্যে একটা মনোপলি গন্ধ ছিল, যা বুঝিয়ে দিত বড়রা এখানে ব্রাত্য। পুজো না হলে কুল খেতে নেই বা মন দিয়ে অঞ্জলি না দিলে অ্যানুয়াল পরীক্ষায় চাপ আছে .. এ ধরণের কিছু অমূলক ভয় তখন খুব একটা ছুঁতে পারতো না। তাই একমাস আগে থেকেই রাতে শুতে যাওয়ার আগে একটা আনচান আনচান ভাব ঘুমটাকে আরও গাঢ় করতো। ক্লাসরুম সাজানোর ভার যখন ভাগ করে দেওয়া হতো, তাতে খুব একটা মন থাকতো না কারও। কারণ, আসল মজা লুকিয়ে আছে কার্ড বিলিতে। মেয়েদের স্কুলে কার্ড বিলি করতে যাওয়ার লিস্টে কার কার নাম থাকতে পারে, তা নিয়ে যে কত টেনশন। সে এক অদ্ভূত সময়। একদিকে স্কুল অন্যদিকে পাড়া। বাড়ি বাড়ি চাঁদা তুলতে যাওয়ার হুজুগ আর পাড়ায় যারা নতুন এসেছে, তাদের বাড়ি কে বা কারা চাঁদা তুলতে যাবে তাই নিয়ে তুলকালাম। একবার গার্লস স্কুলে কার্ড দিতে গিয়েছিলাম। হেডমিস্ট্রেসের ঘরের সামনে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। ভিতর থেকে বাঁজখাই গলায় কিছুক্ষণ গোলাগুলি চলল। তারপর কাঁচুমাচু মুখে বেরিয়ে এল এক নবম শ্রেণি। চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু মুখটা দেখে কী ভাবে যেন হেসে ফেললাম। তখন কি জানতাম, এর ফল কী হতে পারে? গার্লস স্কুল থেকে সেদিন সাইকেলটা হাঁটিয়ে ফিরতে হয়েছিল। কারণ, হেডমিস্ট্রেসের ঘর থেকে বেরিয়ে দেখেছিলাম, কে যেন সাইকেলের দুটো চাকারই হাওয়া খুলে দিয়েছে। যে খুলে দিয়েছিল, সেইই অবশ্য বছরখানেক পরে স্বীকার করেছিল সে দিনের কুকীর্তি। তখন অবশ্য সে আমারই সাইকেলে বসে আমার আয়েষা জুলকা। আর আমি ফ্যালফ্যালে চোখে চাওয়া আমির খান। বলেছিল, "বেশ করেছি। আবার করব। সেদিন অমন মামদো ভূতের মতো হাসছিলি কেন?"

ক্যালাইডোস্কোপ

885838

 পাড়ার পুজোর আরেকটা দারুণ ব্যাপার পুরুত চুরি। পুজোর দিন সকাল থেকে কয়েকজনের উপর দায়িত্ব থাকতো রাস্তায় পুরুত ঠাকুর দেখলেই তুলে নিয়ে আসা। হম্বি তম্বি করে আগে নিজেদের পাড়ার পুজোটা করিয়ে নেওয়া। তারপরেই এক ছুটে স্কুলে। ছুটেই বটে। সে দিন আবার সাইকেল ক্যানসেল। পাঞ্জাবি পরে সাইকেল চালানোর মধ্যে কোনও কেত নেই। স্কুলের বেঞ্চে বসে খিচুরি আর পাড়ায় ব্যাজ লাগিয়ে বসে আঁকো-র তদারকি। ব্যাকগ্রাউন্ডে ইন্দ্রনীলের দুরের বলাকা নিয়ে আসতো বিকেল। সন্ধে মানেই স্কুলে সায়েন্স এগজিবিশন। পাশের বাড়ির গোবিন্দ কাকু প্রতিবার রেজাল্ট আউট হলে সেইদিনই আমাদের বাড়িতে চা খেতে আসে। আর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমার রেজাল্ট জানতে চায়। এগজিবিশনে যখন লাল লিটমাস-নীল লিটমাস দেখালাম.. সেই গোবিন্দকাকুর তখন আইজ অন ফোরহেড। রাতে আবার পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাইরের আর্টিস্ট আসবে। পাঞ্জাবির বুক পকেটে ভলান্টিয়ারের ব্যাজ। যারা ঠিকমতো বসার জায়গা পাচ্ছে না, তাদের কাছে দেবদূত। আর কোনওমতে মাইক টেস্টিং-এর নাম করে একবার স্টেজে উঠতে পারলে তো... ভরা মাঘেও পিঠ বেয়ে জৈষ্ঠ্যের ঘাম। এ সবেরই মাঝে হয়তো টুসকি বললো,

- "অ্যাই বুবাই দা, ফুচকা খাওয়াবি?"

- "না। না। এখন ও সব হবে না। দেখছিস না ব্যাজ পরেছি। জানিস, ভলান্টিয়ারদের কতো কাজ ! "

-"বেশ তবে ডিম্পিকে গিয়ে বলি, তুই কতো বিজি।"

- "ডিম্পি.. মানে.. ইয়ে.. মানে.. আমি কি যাব না বলেছি? তোরা যা.. আমি এক্ষুনি আসছি।"

এক্ষুনি বললে কি আর এক্ষুনি যাওয়া যায়! বন্ধুরা কী বলবে.. কিন্তু না গেলেও যে.. সকালের সেই শাড়ি.. লুটোনো আঁচল বিকেল থেকেই গাছকোমর.. ডিম্পি কি আমায় পছন্দ করে? ফস করে বলে ফেলব না কি? যদি রেগে যায়? বিল্টু কাকুকে বললে, কাকু বাবাকে.. আর বাবা আমাকে.. বাবা আমাকে.. বাবা আমাকে..

খুব বেশী হলে আড়ং ধোলাই দেবে এই তো.. কুছ পরোয়া নেহি। আমিরি চালে ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তক দেখে নেব। ম্যায়নে পেয়ার কিয়া-র সলমনকে মনে মনে ডাকলাম.. গুরু তুমি ছাড়া আছে আর কে?

-"বাবান! আমার ব্যাজটা একটু রেখে দিবি? পেটটা চিনচিন করছে.. একটু বাড়ি যাই।"

-"ভাই! যাচ্ছিস যা.. আমাদের জন্য চুরমুর আনিস.."

সেই কবেকার কথা।

ডিম্পি এখন পাড়ার পুজোর ভিডিও আপলোড করার রিকোয়েস্ট পাঠায় জাপান থেকে। টুসকিরা স্কাইপি-তে অঞ্জলী দেয় আর বাবানের মেয়ে আমাকে প্রতিবছর হোয়াটস্অ্যাপ করে "হ্যাপি সরস্বতী পুজো আঙ্কল, এনজয়.."

RELATED STORIES

RECOMMENDED STORIES