"কুথাও কুনও সিলাই তো লাই..."

Aug 14, 2016 04:28 PM IST | Updated on: Aug 14, 2016 04:28 PM IST

-"কুথাও কুনও সিলাই তো লাই.." -সেলাই?

কোথায় আবার সেলাই থাকবে?

-"কেনো.. বুড়াবাবুর শরীলে"

-সেলাই কেন থাকবে?....

জিতেন এমন ভাবে তাকালো যেন ...

জিতেন। জিতেন মারান্ডি সেই সময় থেকে আমার সঙ্গে ছায়ার মতো থাকে। যখন আমি সাহেবগঞ্জ-দুমকা-পাকুর-এ পেটের টানে চড়কি পাক। কোম্পানির দেওয়া রাঁচির আস্তানা দেখভালের ভার ছিল জিতেনের। রাঁচি থেকে আরও দশ ঘাটের জল খেয়ে যখন কলকাতায়। জিতেনও রইল সঙ্গে সঙ্গে। তিনকুলে কেউ নেই। আঁকড়ে থাকে আমায়। আগলে রাখার চেষ্টা করে। ছোটদাদুর ছোটখাটো চেহারাটা চুল্লীতে ঢুকিয়ে দিয়ে যখন ঘাটের ধারে এসে বসেছি.. তখন আকাশে আর আলো নেই.. ঠিক তখনই জিতেনের ওই অদ্ভূত প্রশ্ন -"কুথাও কুনও সিলাই তো লাই.."

প্রাণহীন এক দেহ.. তা দেখে সেলাইয়ের কথা এল কোত্থেকে? বুনো গোঁয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে জিতেন বোঝাল, আমি নাকি কিছুই জানি না। 'মরা শরীল' মানে নাকি 'সিলাই' থাকবেই.. "বড়া বেটাকে দাওয়া থেকে হিঁচড়ে লে গেসিল থানায়.. পানিটুকুও লারেনি"। তিন রাত পর থানা থেকে খবর দেয়, জিতেন যেন হাসপাতালে যায়। গিয়েছিল জিতেন। লালকে দেখবে বলে। লালের দেখা পায়নি। একটা বাড়ন্ত ছেলের 'শরীল' পড়েছিল হাসপাতালের মেঝেয়। সারা মুখে কালসিটে ভরা গড়নটা লালের মতো। লালই তো। তবে 'বেঁচে লাই'। লালের শরীরে ওই দাগগুলো.. "উ ডাগতার, লালের শরীলে সিলাই কেনো?" উত্তর মেলেনি। বুধুয়ার বাপ বলেছিল পরে। "পলাইছিল তো.. তাই ইনকুন্টার কেস"। ওর ছেলেটারও তো। মনে পড়েছিল জিতেনের। বুধুয়ার শরীরেও লালের মতো। 'সিলাই'-এর দাগ ছিল। তাহলে বোধহয় বুধুয়ার বাপই ঠিক। তার লালও ওই 'ইনকুন্টার কেস'। তাই 'শরীলে সিলাই'। কিন্তু দুরি? দুরির তো 'ইনকুন্টার কেস' লয়।

দিব্যি হেসেখেলে বেড়াচ্ছিল কচি মেয়েটা। একদিন এল ধুম জ্বর। শহর থেকে যে বাবুরা সপ্তাহে একবার বিনা পয়সায় ওষুধ দিতে আসে। তারা বলল, শহরের বড় হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। টাকা পয়সা লাগবে না। শহরের কোন বড়বাবু নাকি এ গ্রামের সবার দেখভালের ভার নিয়েছে। তাই দুরিকে তারাই শহরের বড় হাসপাতালে নিয়ে যাবে। জিতেনও গেল সঙ্গে সঙ্গে। তা বলতে নেই, হাসপাতালটা ভাল ছিল। আর সব যেন ঝকঝকে। ছবির মতো। দুরির কপাল ভাল। জিতেন কোনওদিন এ সব হাসপাতালের ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারত না।

মা মরা মেয়েটা শুধু এবার সুস্থ হয়ে উঠলে হয়। মুদির দোকানের ক্যালেন্ডারে যেমন দেখেছিল জিতেন, ঠিক তেমন.. ভগবানের মতো দেখতে এক ডাক্তার এসে বলল, বাড়ি ফিরে যাও। দুরি এখন ভাল আছে। কাল আবার এসো। পরের দিন গিয়েছিল জিতেন। রাতে নাকি জ্বর বেড়েছিল। সব হাতের বাইরে চলে গিয়েছিল। দুরিকে আর বাঁচানো যায়নি। কিন্তু ওরা কাল যে বলেছিল, দুরি ভালো আছে। তাহলে? সবাই বোঝাল, এমন না কি হয়। হবে হয়তো জিতেনেরই কোনও পাপের ফল। তবু তো মেয়েটা মরার আগে ফুলের মতো বিছানায় এক রাত শুতে পেরেছিল। সে ভাগ্যই বা ক'জনের হয়! বুড়ো জিতেন মেয়েকে নিয়ে চলল মজা নদীর পারে। যে হাতে মেয়ের চুলে বিলি কাটতো, সেই হাতেই দুরির নীলচে কালো শরীর। মাটি খোঁড়াই ছিল। ডাকুয়া আর তার ছেলেপুলেরা বলল, সব কাপড় খুলে মেয়েটাকে ওই গর্তে শুইয়ে দিতে। কাপড় খুলতে গিয়ে আঁতকে উঠল জিতেন। "এ হাইরে ডাকুয়া, দুরির শরীলে ইত সিলাই কেন? গোটা শরীলে ইত ইত সিলাই.."। ও সব বড় বড় হাসপাতালে বড় ডাক্তাররা কী ভাবে কী করে, তা কি ডাকুয়ারা জানে? ও রকম তো ওরা আগেও দেখেছে। বোঝাল জিতেনকে.. ও নিয়ে না ভাবতে। দুরি তো আর ফিরবে না। বরং দুরি যাতে শান্তি পায়.. তাড়াতাড়ি গর্তে শুইয়ে মাটি চাপা দেওয়াই ভালো। মাটি চাপা পড়ে রইল দুরির সেলাই করা দেহ আর জিতেন মারান্ডি সেলাই করা মন নিয়ে কাটাতে লাগল দিন মাস বছর। জিতেন আজও জানে না, জ্বরের ঘোরে বেঁহুশ দুরির শরীরের অঙ্গগুলো কী ভাবে হাত বদল হচ্ছিল। কত টাকায় রফা হল কিডনির। জিতেন আজও জানে না, লালকে কী ভাবে পিটিয়ে মেরে তারপর গুলি করা হয়েছিল আর বাঁধানো খাতার হিসেব পোক্ত করতে হয়েছিল পোস্টমর্টেম। জিতেন শুধু জানে, মরে গেলে 'শরীলে সিলাই' হয়।

barbed-wire-114500_960_720

সে দিন রাতে লাল এসেছিল আমার কাছে। তার শরীরের সেলাইয়ের দাগগুলো দেখালো। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না। ভালো করে দেখতে গিয়ে দেখলাম, সেলাইগুলো ঠিক যেন কাঁটা তারের বেড়ার মতো লাগছে। পায়ে পায়ে পাশে এসে বসেছিল দুরি। হাতে সূঁচ সুতো। কোঁচড়ে ভারত পাকিস্তান বাংলাদেশের ম্যাপ। আমি যেন কেউ না, এমন একটা ভাব করে আপন মনেই সেলাই করতে থাকলো ম্যাপগুলো। পাকিস্তানের ম্যাপের সঙ্গে ভারতের ম্যাপ জুড়লো। ভারতের সঙ্গে সেলাই করল বাংলাদেশ। জিতেনকে পেলাম না আশপাশে কোথাও। জিতেন মারান্ডিরা বোধহয় কোথাও থাকে না।।

RELATED STORIES

RECOMMENDED STORIES