ফেসবুকের বুদ্ধিজীবি হতে চান ?

Jul 28, 2017 07:34 PM IST | Updated on: Jul 28, 2017 07:43 PM IST

সূধী সোশাল সমাজ,

আশা করি, ভালো আছেন। ভালো তো থাকবেনই। এই তো সিজন ভালো থাকার। গুজরাত থেকে নাক বরাবর নিম্নচাপ অক্ষরেখা বাংলার হৃদয় ছুঁয়েছে। কাচ জানলায় জলের ছিটে, মেঘ মজানো আকাশ, মাঠ ছাপানো সবুজ.. পারফেক্ট সেলফি সিজন। দিনে দুটো পোস্ট বাঁধা। একটা সেলফি আর একটা 'একলা ছাতায় দুটো মন' টাইপ। তবে ডিএসএলআরজীবীদের জন্য ছাড় আছে। আর ছাড় তাঁদের, যাঁরা খুব লাইভলি(মানে ফেসবুকে নিয়মিত লাইভ থাকাটা যাঁদের দিনের বিশেষ একটা কাজের মধ্যে পড়ে)। আর কবিদের জন্য তো সাত খুন মাফ। যদিও এই সব 'গোঁসাইরা কোন চুলোয় যাবে, কেউ জানে না'। তা এই যদি উৎসবের মরসুম না হয়, তবে কোনটা? দেখছেন না, হাওয়া বুঝে শারদীয়া আনন্দমেলাও বেরিয়ে গিয়েছে। তবে এই উৎসবের মরসুমেও কোনও কোনও সোশাল নাগরিকের ইঞ্চি ছয়েক মন খারাপ। আজকাল নাকি কেউ সে রকম পাত্তা দিচ্ছে না। আরে, অত সহজে কি পাত্তা পাওয়া যায়! পাত্তা পেতে গেলে তো আপনাকে সোশাল সুশীল হয়ে উঠতে হবে। তা সোশাল সুশীল হওয়ার সুনির্দিষ্ট পথ আছে বৈকি। যাঁরা আদর্শ সোশাল সুশীল হয়ে উঠতে চান, তাঁদের জন্য জকাদা-র কোচিংয়ের কোনওদিন না ফাঁস হওয়া সেই লাস্ট মিনিট সাজেশনের কয়েকটা পয়েন্ট এখানে চুপচাপ জানিয়ে দিই।

ফেসবুকের বুদ্ধিজীবি হতে চান ?

Social-media-Five-predictions-for-2013

1. ঠিক ভুল যাচাই না করে যে কোনও চাঞ্চল্যকর নিউজ ফিড পটাপট শেয়ার করে ফেলুন। চাইলে শেয়ার করার সময় লিখুন, "ছিঃ! কোনদিকে এগোচ্ছি আমরা"। (তবে দেখবেন, ভারত কেনিয়ার বিরূদ্ধে দশ উইকেটে টি টোয়েন্টি জিতেছে এ রকম পোস্টে যেন ওই সব লিখে ফেলবেন না)

2. একটা গ্রুপ খুলে বসুন। সেই গ্রুপে আপনিই সব। ধরে বেঁধে যাকে পারবেন গ্রুপে ঢোকান। ল্যাজায় কাটুন। মুড়োয় কাটুন। জানবেন, রাজ্য ছাড়া যেমন রাজা হয় না। তেমন গ্রুপবাজি ছাড়া সোশাল সুশীল .. নেভার।

2.ক) যেখান থেকে যা যা ভালো লেখা পাবেন। চোখ কান বুজে গ্রুপে কপি পেস্ট করুন। গ্রুপের কেউ ট্যাঁ ফোঁ করলে টুক করে 'সংগৃহীত' লিখে দায় ঝেড়ে ফেলুন। বলতেও পারেন, আগে আপনি লিখেছেন। তারপর সেটা অন্য কেউ ঝেড়েছে। বেগতিক বুঝলে প্রশ্নকর্তাকে গ্রুপ থেকে বের করার অপশন তো রইলই। তারপর ব্লক। হুঁ হুঁ বাওয়া.. গ্রুপ অ্যাডমিন বলে কথা।

3. আগের পয়েন্টে কপি পেস্টের কথা লেখা হয়েছে। জেনে রাখবেন, আদর্শ কপি পেস্টের জন্য একটু বুদ্ধি খরচ করতে হবে। চেষ্টা করবেন নিয়মিত এমন কারও লেখা ঝাড়তে, যাঁর সঙ্গে আপনার কমন ফ্রেন্ডের সংখ্যা যথেষ্ট কম। আর একটা সেফ উপায় আছে। কোনও অখ্যাত ব্লগ খুঁজে তার কোনও কবিতার মাঝখানের দিক থেকে আন্দাজমতো দুই বা চার লাইন ঝেড়ে নিজের টাইমলাইনে পেস্ট করে দিন। (ছবি ঝাড়া বা কপি পেস্ট করা ভিন্নধর্মী এবং উচ্চমার্গের শিল্প। তা নিয়ে অন্য কোথাও বিশদে আলোচনা হবে)

4. এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। হাওয়া মোরগ হয়ে যান। মানে সকাল থেকে হাওয়া বুঝে সেই অনুযায়ী একটা বিগলিত বসুন্ধরা পোস্ট বাংলা বাজারে ভাসিয়ে দিন। যেমন আজ বাজারে ধনঞ্জয় খাচ্ছে, তো ধনঞ্জয়। স্যানিটরি ন্যাপকিন চলছে, তো স্যানিটরি ন্যাপকিন। মেট্রোর সুড়ঙ্গে ভ্যাম্পায়ার, তো মেট্রোর সুড়ঙ্গে ভ্যাম্পায়ার। (মনে রাখবেন, বিষয় সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান দরকার নেই। এঁড়ে তর্ক করার মানসিকতা থাকলেই আপনি চ্যাম্পিয়ন।)

5. এই পয়েন্টটির সঠিক প্রয়োগ আপনাকে সহজেই লাইমলাইটে আনতে পারে। সকালে উঠেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলুন, যাই হোক আপনি নেতিবাচক থাকবেন। কেউ হয়তো লিখল, কী মিষ্টি এ সকাল। আপনি লিখুন, মালোপাড়ার বস্তির মানুষদের কাছে কি আজকের সকালটা সত্যিই মিষ্টি? কেউ লিখল, জয় কেকেআর। আপনি লিখুন, এই সব বেটিংবাজি ভারতীয় ক্রিকেটের সব্বোনাশের কারণ। ক্রিসমাসের আলোয় শহর সেজে উঠার কথা কেউ বললে, আপনি বলুন, শিল্প নেই। তাই উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ এর লোক দেখানো ব্যবহার। কেউ কোনও ফিল্মের প্রশংসা করলে কোনও জাতীয় সমালোচকের কোট ঝেড়ে কেন ছবিটি ভালো নয়, তা নিয়ে গলা ফাটান (এর জন্য ফিল্মটি দেখার কোনও দরকার নেই)। কেউ মোদিকে দায়ী করলে মমতা প্রসঙ্গ তুলে আনুন। কেউ মমতার দোষ ধরলে চৌতিরিশ বছরের বাম অপশাসন ইত্যাদি ইত্যাদি.. এ সব আপনি ভালোই জানেন। তবে শুরুতেই সঠিক প্রয়োগের বিষয়ে বলা হয়েছে। খেয়াল রাখবেন। অর্ধাঙ্গিনীর 'ফিলিং অ্যাওসম' স্টেটাসে নেতিবাচক কিছু লেখার আগে নিজের সহ্যশক্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা আবশ্যিক।

6. এই পয়েন্টটা 4নং-এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনও একটা বিষয় বেছে নিয়ে আওয়াজ তুলুন "মিডিয়া চুপ কেন?" জেনে রাখবেন, মিডিয়াকে গালাগাল দেওয়ার মতো সেফ জোন আর পাবেন না। দেখবেন, না চাইতেও কত স্বঘোষিত বিপ্লবী বীর আপনাকে ঘিরে হইচই শুরু করবে। চাইলে রাতারাতি সোশাল সেলেবও হয়ে যেতে পারেন। তখন আপনার কোষ্ঠকাঠিন্যের স্টেটাসেও দেখবেন খান পাঁচেক শেয়ার।

6.ক) নাইজেরিয়ার কোনও স্কুলের ছাত্রদের শাস্তি দেওয়ার ভিডিও শেয়ার করে জানতে চান "মিডিয়া চুপ কেন?"

6.খ) বাংলাদেশের কোনও গণপিটুনির ভিডিও পোস্ট করতে পারেন।

6.গ) জাপানের কোনও ট্রেনের ছবি একটু কারিকুরি করে এ দেশের বলে চালিয়ে জানতে চান, আমাদের দেশ এগোচ্ছে, অথচ "মিডিয়া কেন এ সব দেখাচ্ছে না?"

6.ঘ) সিরিয়ার কোনও সেনার ক্ষতবিক্ষত বীভৎস ছবি পোস্ট করে জানতে চান, "মিডিয়া কেন শত্রুর হাত থেকে দেশকে বাঁচানো এই ভারতীয় সেনার বীরগাথা দেখালো না?"

6.ঙ) বাদুড়িয়ার মতো কোনও ঘটনা ঘটলে, পারলে প্রতি ঘণ্টায় একটা করে ছবি (বাছবিচার করবেন না, যা পাবেন, তাই দেবেন। নইলে পিছিয়ে পড়বেন) পোস্টান। আর জানতে চান, "মিডিয়া চুপ কেন?" আরও জানতে চান, আপনার কাছে ছবি বা ভিডিও আছে। "মিডিয়ার কাছে কেন নেই?"

6.চ) "মিডিয়া দালাল" শব্দবন্ধ যত বেশীবার ব্যবহার করবেন। বোনাস পয়েন্ট পাবেন। মাঝে মধ্যে "প্রশাসনের পা চাটা কুত্তা", "তাঁবেদার", "বেওসাদার", "সব টিআরপি-র খেল" ঘুরিয়ে ফিুরিয়ে ব্যবহার করুন। হাতেনাতে ফল পাবেন। আজকাল "মিডিয়া বেশ্যার জাত" বললে নাকি একটু বেশীই পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে। তবে অতিপ্রয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।

7. রক্তের জন্য কেউ আবেদন করলে হামলে পড়ে সে পোস্ট শেয়ার করুন। পারলে যতজনকে পারেন, ইনবক্সে জানান। না। ঘাবড়াবেন না। এতে আপনার একটা চাপ কমবে। নিজেকে রক্ত দিতে হবে না(সে আপনি কোনওকালেই দেননি বুঝি) আর অন্যরাও বুঝবে, আপনি কত বড় মাপের মানুষ। কেউ চেপে ধরলে বলবেন, "আরে আমিইই দিতাম। কিন্তু এই গতমাসে বুল্টির বাড়ির কাজের মাসির জন্য এক ইউনিট দিয়ে ফেললাম তো.." ব্যাস্ আপনি হিরো।

8. সোদপুর সেন্ট জেভিয়ার্স নোটিশ দিয়েছে, মাত্র দুটো বই আর একটা খাতা নিয়ে স্কুলে যেতে। যাতে বইয়ের বোঝার চাপ কমে। খবরদার, এ সব নিয়ে কোনও পোস্ট টোস্ট দেবেন না। ওতে কোনও টিআরপি নেই। বরং যাঁরা আপনার নিয়মিত ফলোয়ার, তাঁরা আপনার নির্বুদ্ধিতা দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারে।

9. বন্যা ফন্যা নিয়ে পোস্ট না দেওয়াই ভালো। ওতে কাকে দোষ দিতে হয়, তা সবাই দ্রুত ভেবে উঠতে পারে না। তাই লাইক বা কমেন্টের সংখ্যা খুবই কম হবে। শেয়ার তো হবেই না। আর এতে আপনি সোশাল সুশীল হওয়ার দৌড়ে পিছিয়ে পড়বেন। (এই যে এত বড় লেখাটা কষ্ট করে পড়ছেন, সেটি কপি পেস্ট করলেও সোশাল সুশীল হওয়ার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে)

10 . এই পয়েন্টটি সব পয়েন্টের থেকে গুরুত্বপূর্ণ। একটি ফেক প্রোফাইল মেনটেইন করুন। পারলে একাধিক। সেই সব প্রোফাইল থেকে নিজের প্রোফাইলে নিয়মিত পক্ষে বিপক্ষে কমেন্ট করে হাওয়া গরম করুন। মনে রাখবেন, একটা প্রোফাইলে যদি দেড়-দু'হাজার বন্ধু সংখ্যা থাকে। তিনটি প্রোফাইল মিলে তো প্রায় হাজার পাঁচেক। অর্থাৎ আপনার একটা ফুসকুড়ির স্ট্যাটাস হাজার পাঁচেক লোকের কাছে পৌঁছচ্ছে।

------------

সোশাল সুশীল হউন। এগিয়ে চলুন। সোশাল সমাজ আপনার হাত ধরেই নতুন আলো দেখবে..

  • ( বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ - এই লেখার মাধ্যমে কোনও সোশাল সুশীল আঘাত পেয়ে থাকলে তিনি জকাদা কে অভিযোগ জানাতে পারেন। আগেই বলা হয়েছে, ইহা জকাদা রই কোচিং-এর কোনও দিন না ফাঁস হওয়া লাস্ট মিনিট সাজেশন)

RELATED STORIES

RECOMMENDED STORIES