‘পার্টি’র বুকস্টল, বিশ সাল বাদ

Oct 17, 2016 07:30 PM IST | Updated on: Oct 17, 2016 07:30 PM IST

সালটা ১৯৯৬।জ্যোতি বসুর ‘ভার্চুয়াল প্রধানমন্ত্রীত্বে’-র বছর।আমাদের সরকারি আবাসনে ঢোকার গেটে তখন রোজ জটলা। সরকারে গেলে বিপ্লবটা কিছুটা এগিয়ে আসত,না কি কমিউনিস্টরা ‘ধর্মচ্যুত’ হত, তাই নিয়ে।তখন আমি ক্লাস ইলেভেন। তার আগে দুর্গাপুজোর সময় হাউজিং-এর গেটে ‘পার্টির স্টল’ দেখেছি।তবে কখনও কিছু কিনিনি।আমার কেবলই মনে হত এগুলো ‘বড়দের বই’। যদিও তার আগে বাবার ব্যাক্তিগত সংগ্রহে থাকা বাৎসায়নের কামসূত্র পড়তে গিয়ে আমার তেমনটা কখনও মনে হয়নি।

বাবার বইয়ের আলমারিতে আমি তার আগে দেখেছি History of CPSU, Ten Days That Shook The World,Problems of Leninism। হাতে নিয়ে নাড়তে-চাড়তে গিয়ে, বইগুলো বেশ দূর্বোধ্য ঠেকেছে। তার চেয়ে ওই রাদুগা বা প্রগতি পাবলিশার্সেরই ছাপা পৃথিবী কি গোল, মহাবিশ্বে মহাকাশে, শারীরতত্ত্ব সবাই পড়--এগুলো আমার বেশ লেগেছে।সব মিলিয়ে আমার মনে হত, ভেঙে যাওয়ার আগে সোভিয়েত রাশিয়ার সব কঠিন বইগুলো ‘পার্টি’র স্টলে পাঠিয়ে দিয়েছে। আর সহজ বইগুলো, বইমেলায় ধূলো ঝেড়ে কিনতে হয়।

‘পার্টি’র বুকস্টল, বিশ সাল বাদ

যাই হোক, সে বছর এ হেন আমি, গুটি গুটি পায়ে গিয়ে সেই ‘পার্টির স্টল’ থেকেই কিনে ফেললাম ভগৎ সিং এর ‘আমি কেন নাস্তিক’। আমিও তখন নাস্তিক। অতএব, নাস্তিকতা, ভায়া ভগৎ সিং হয়ে কমিউনিজমে যাওয়ার চেষ্টা।সে বছরই দেখি অরুণদার দোকানের বাইরে বিজেপির স্টল।সে সময় ‘পার্টি’ মানে একটাই দল। তাদের ‘পার্টি’ বলে।বাকিগুলো সব ‘এলে বেলে’। আর বিজেপি মানে?বোঝার সবচেয়ে ভাল উপায়, অরুণদা।

প্রান্তিকা হাউজিং-এর গেটের ঠিক বাইরে একমাত্র মিষ্টির দোকান টোকনদার। তার পাশেই একমাত্র ‘নোনতা’ অরুণদা।সব অর্থেই নোনতা। অরুণদার দোকানের মোগলাই পরোটা আমাদের মত ‘প্রান্তিক’দের জিভের স্বাদকোরকে একমাত্র মরীচিকা।আবার হাউজিং এর ‘পার্টি’ করা কাকুদের জন্য নুনের ছিটে।অরুণদার দোকানে, অন্য ‘সিপিএম’ দোকানের মতই লক্ষ্মী-গণেশ আছে। কিন্তু, তার সঙ্গে আছে আরও তিনটে ছবি।হেডগেওয়ার, গোলওয়ালকর আর অটলবিহারী বাজপেয়ী।ব্যাস্।এমন একটা নিরঙ্কুশ সিপিএম এলাকায় অরুণদার মোগলাই তাই কাঁটা হয়ে বিঁধে থাকে কাকুদের বুকে। লজ্জায়, ঘেন্নায় তারা নিজেরা ও দোকানে পা রাখেন না।

বাড়ির মেয়ে-বউরা আবদার করলে আমাদের মত নন-পার্টিজানদের দায়িত্ব পড়ে অরুণদাকে ছোঁয়ার।অরুণদা অবশ্য এসবে থোড়াই কেয়ার।মোগলাই ভাজতে ভাজতে, মোগলদের বাপ-বাপান্ত চলে।আমি দেখতাম, কুন্ডলী পাকানো ধোঁয়ার মধ্যে অরুণদার হাতের খুন্তিটা ক্রমশ শিবাজির তরবারি হয়ে উঠছে।আর তার সামনে কেমন যেন কুঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে পার্টির কাকুরা।

অটল বিহারি বাজপেয়ীর ১৩ দিনের সরকার পড়ে যেতে তখন দেশ জুড়ে বাজপেয়ীজির জন্য বেশ সহানুভূতির হাওয়া।সেই হাওয়াতে ভর করে অরুণদা নিজের দোকানের সামনেটা বিজেপিকে ছেড়ে দিল বুকস্টল করতে।ওই প্রথম ‘পার্টি’র বাইরে কাউকে হাউজিং-এর পুজোয় বুকস্টল করতে দেখলাম।এদিকে পার্টির ‘ঐতিহাসিক ভুলে’ প্রধানমন্ত্রীত্ব হারানো ‘জ্যোতিবাবু’।ওদিকে ‘রাজনৈতিক অস্পৃশ্যতা’র শিকার ‘অটলবাবু’।হাউজিং-এর বড়রাও সেবার পুজোয়, মোগলাই এর নাম করে অরুণদার দোকান থেকে পদ্মছাপ বই কিনল।আমিও অরুণদার প্রতি ভালবাসা, না কি অটলবিহারির প্রতি ভক্তিতে জানিনা, নাথুরাম গডসের ‘শুনুন ধর্মাবতার’ একখানা কিনে ফেললাম।

পড়তে গিয়ে বুঝেছিলাম, এ বইয়ের পাতায় পাতায় ঘৃণার আবাহন।যুক্তি কম, আবেগ বেশি।ভগৎ সিং-কে বরং বেশ লেগেছিল।এরপরের বছরগুলোতে পুজোয় অরুণদার দোকানে মোগলাই আর বিজেপির বইয়ের বিক্রি বেড়েছে।গুজরাত দাঙ্গার বছরে সেই বিক্রি তুঙ্গে উঠল। কি আশ্চর্য ! ‘পার্টি’র কাকুদের ছেলেমেয়েরা, মানে আমার ‘হাফ কমিউনিস্ট’ (হাফ, কারণ কমিউনিস্ট বর্ণাশ্রম প্রথা অনুসারে এরা সবাই জন্মসূত্রে,পিতৃ পরিচয়ে কমিউনিস্ট হলেও কোনওদিন কোনও মিটিং-মিছিলে গিয়ে এদের ‘ব্যাপটাইজড্’ হতে দেখিনি।)বন্ধুরাও এদিক-ওদিক তাকিয়ে অন্তত একটা করে পদ্ম ছাপ বই কিনে বাড়ি ফিরল। সেইসব বন্ধুদের অনেকেই এখন রাজ্যের বাইরে ‘প্রতিষ্ঠিত’।আর ক্ষমতা থেকে যাওয়ার আগে আমার সেইসব বান্ধবীদের , ‘ভাল’ বিয়ে দিয়ে গেছে ‘পার্টি’র কাকুরা।

ফেসবুক, হোয়্যাটসঅ্যাপে তারা এখন ব্যাঙ্গালোর, হায়দরাবাদ, মুম্বই, দিল্লি থেকে ‘মোদীজি’র ৫৬ ইঞ্চি ছাতির প্রতি ভক্তি জানায়।খবর পেলাম এবছর হাউজিং-এর সামনে ‘পার্টি’র স্টল হয়নি।তবে অরুণদার দোকানের ‘আশ্রয়’ ছেড়ে স্বাবলম্বী হয়েছে বিজেপির স্টল। অরুণদারও ‘আচ্ছে দিন’ এসেছে। মোগলাইয়ের দোকান ছেড়ে এখন স্থানীয় মেগাসিটি প্রোজেক্টে সাপ্লাই বিজনেস।সিন্ডিকেটের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতেই। এবছর বাংলা জুড়েই পুজোয় স্টল বেড়েছে পদ্ম শিবিরের। শতাংশের বিচারে সবচেয়ে বেশি। কমেছে ‘পার্টি’র স্টলের সংখ্যা।একাদশীর দিন পুরনো বই গোছাতে গিয়ে হঠাৎ বেরিযে পরল সেই ভগৎ সিং আর নাথুরাম।কি ভেবে পাশাপাশি রেখে দিলাম আলমারিতে।কুড়ি বছর পর, কী কথা হল দুজনের কে জানে!

RELATED STORIES

RECOMMENDED STORIES